Tuesday, 8 February 2022

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"

বহ্নি শিখা 


খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝেই শরীরটা খুব ডিস্টার্ব করছে।

শয্যাশায়ী রোগীর পেসাবভেজা কাপড় ধুয়ে নিংড়ে রোদে মেলা চাট্টিখানি কথা নয়। তারপর এটোবাসন পত্তর,বাসি ঘর দরজা সাফসুতরো করা কি খুবই সহজ? মোটেই না।

পায়ে পায়ে পেরিয়ে যায় সময় নির্দিষ্টতা ছাড়িয়ে। ভুখা পেটগুলো তেড়ে আসে আমার দিকে। ক্ষিপ্রতা বেড়ে গেলেও আগুন জল তার নির্দিষ্ট সময় নিয়েই সেদ্ধ করে খাবার। নয়তো পুড়িয়ে দেয় সব।

 সেটুকু অপেক্ষা তো করতেই হয়।তারপর দ্রুত সকলের মুখের খাবার জুগিয়ে,রোগী কে খাইয়ে দেওয়া,ঔষধ দেয়া আরো কত কি,,,। 

ক্রমশ হেরে যাই নিজের কাছে। এমন তো কথা ছিলো না। বার বার নিজেকেই কেনো বঞ্চিত হতে হয়?মন বার বার সতর্ক করতে থাকে এসব তোমার জন্য নয়,তুমি ছাড়ো,এসব ছাড়ো,সংসার ছাড়ো,তুমি ভিখিরি হও,পথ হারাও,একা হও।তোমার জন্য অপেক্ষা করছে কলম,শব্দ,খোঁজো, তাকে খোঁজো। অভিমানী সে,তোমার ডাকার অপেক্ষায় তোমার হৃদয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে। আর ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়,আর তোমার শারীরিক যোগ্যতা। 

সহসা বুকের ভেতর আগুন। জ্বলে নেভে। আজকাল বিকর্ণ ও বেশ ফোন দিচ্ছে। মোটিভেট করে পূনর্জীবিত করতে চায়,যেন হারিয়ে না যাই। নিজের মাঝে জ্বলে উঠি। কিন্তু আমি যেন তেলহীন পোড়া সলতের মতো কয়লা হয়ে উঠছি।

এক সময় বিকর্ণ 'র ফোন না পেলে খুব কাঁদতাম। এখন ও বার বার ফোন দিচ্ছে আমি এড়িয়ে যাচ্ছি। ভালো না লাগা বিষন্নতা গ্রাস করে নিচ্ছে ক্রমশ। তলিয়ে যাচ্ছি যেনো কোথায়।

যখন বুঝতে পারি সমাজের প্রতিটা জায়গায় আমি ইউজ হচ্ছি  তখন মনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘৃণা ঢুকে ছাড় খার করে দেয় সমস্ত আন্তরিকতা। 

হারিয়ে যাওয়া সময়টা হাতড়াতে  হাতড়াতে ক্লান্তিতে ছেয়ে যায়। হারিয়ে যায় আরোগ্যহীন আরো কিছু আরোপিত সময়।

সাত সকালে খুব করে মনে পড়ছে বাবলা'দাকে। ভাগ্নির বিয়ে উপলক্ষে খুলনা যাওয়া তাঁর সাথে দেখা সবই এখনো যেন স্বপ্নের ঘোরে চলা আমার। বারো ঘন্টা জার্নি করা কিভাবে সম্ভব হয়েছে জানিনা। কখনো পারবো সে কথাও বিশ্বাসযোগ্য ছিলো না। হাতে করে নিয়ে যাইনি কিছু। প্রিয় মানুষটির জন্য।অথচ,,,

তিনি তাঁর লেখা কিছু বই দিয়ে বার বার বলেছেন,"কিছু করে যাও,যাবার আগে কিছু দিয়ে যাও। জন্মটাকে বৃথা করো না। এ জীবন আর একটা পাবা না। "
মনের ভিতর তাড়না,অসম্ভব তাড়না।
আমাকে পিষে দিচ্ছে। দু'হাতে জড়ো হতে চাচ্ছে মনের কথাগুলো, অথচ লেখার এনার্জি পাচ্ছি না। যে করেই হোক বসতে হবে,অন্তত নিজেকে ভালো রাখার জন্য। ফিরে যেতে হবে পুরোনো পথে। 

সংসার সকলের জন্য নয়। বড় ভুল পথে চলে এসেছি।

Sunday, 6 February 2022

সম্পাদকের কলমে--

সম্পাদকের কলমে--

জীবন জীবনের মত বয়ে চলে। আমাদের পত্রিকাও চার বছরের সীমানা পার করতে চলছে। নিয়ম মত চলতে গেলেও উল্লংঘন, অনিবার্যতা এসে পড়ে। সাময়িক বাধা বিঘ্নতা পেরিয়ে আজ পর্যন্ত আমরা এগিয়ে চলেছি। সম্পূর্ণ বলা যাবে না তবে ক্রমশ মার্জিত ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা পত্রিকা তৈরি করতে আমরা সর্বদা সচেষ্ট। এ ব্যাপারে আমরা কতটা সফল হতে পেরেছি তা পাঠকবর্গ বলতে পারবেন--সর্বদাই পাঠকের সমালোচনা বা আলোচনা উন্নতির সঠিক দিশা নির্দেশক হয়ে ওঠে। 

আমরা ভাবছি বাংলা নববর্ষে একটি সংকলন প্রকাশ করব। সেটি হবে আমাদের নববর্ষ সংকলন। তাতে আমরা নতুন লেখা বা লেখক যুক্ত করতে চাইছি না। আমাদের পূর্ব প্রকাশিত স্বরধ্বনি, বর্ণালোক ও স্ব-বর্ণ সংখ্যাগুলি থেকেই আমরা লেখা বেছে নেব। সংকলন অবশ্যই গল্পকবিতার হবে। সংকলনটির কপি প্রত্যেক লেখক তথা কবিদের ঠিকানায় বুক পোস্ট করে পাঠানো হবে। রেজিস্টার পোস্ট বা কুরিয়ারে পেতে গেলে তার খরচ কিন্তু লেখক-পাঠকে বহন করতে হবে, তবে আমন্ত্রিত লেখকের ক্ষেত্রে সংকলনটি  পাঠাবার জন্য কোন রকম খরচ আমরা গ্রহণ করব না। নিবেদন ইতি-- তাপসকিরণ রায়।

সহ-সম্পাদকের কলমে : 

প্রকাশিত হচ্ছে পত্রিকা প্রতি মাসে। আমরা একটি সংখ্যা করি কবিতাকে নিয়ে, অন্যটি গল্প নিয়ে। আমাদের সকলের প্রিয় দেবী সরস্বতীর আর্শীবাদ ধন্য এই সংখ্যা। শীত যাচ্ছে ধীরে ধীরে, বসন্তের আগমন বার্তা সকলের কাছে। আমাদের পত্রিকার কাজও চলছে বিভিন্ন কাল ও উৎসবকে নিয়েই। আপনাদের সকলকে সাথে নিয়ে চলছি আমরাও বিভিন্ন সংখ্যায় ভিন্ন স্বাদের লেখা নিয়ে।--শমিত কর্মকার

সহ-সম্পাদকের কলমে--

এই তো সবেমাত্র পেরিয়ে এলাম সরস্বতী পূজো, অতি বর্ষণের আশঙ্কা  বুকে নিয়ে। পেরিয়ে এলাম শীতল ষষ্ঠীর  ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাত (খাবার ) আর গোটাসেদ্ধ খাবার দিন। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী বাঁশপাতা হাতে নিয়ে শীতল ষষ্ঠীর ব্রতকথা শুনে  সন্তানের কপালে দই হলুদের ফোঁটা দিয়ে মা ষষ্ঠীর কাছে সন্তানের মঙ্গল কামনায় উদ্বেল  মাতৃহৃদয়ের চিরন্তন প্রার্থনার পালা।   যদিও ঐতিহ্য পূর্ণ  সেসব প্রাচীন  প্রথাগুলির অনেকটাই আজ লুপ্তপ্রায় । সৃজনশীল মনের মাধুরী মেশানো ছন্দে ছড়ায় গাঁথা সেসব গল্পগাথা আজকের প্রজন্মের কাছে ইতিহাস মাত্র, তবুও অনেক না বলা কথাই নানা রূপে গল্প হয়ে রয়ে যায় বুকের ভেতর । তেমনই কিছু গল্পের সম্ভার নিয়ে আজকের স্বরধ্বনি ব্লগের পশরা  সেজে উঠেছে রঙে রসে বর্ণে গন্ধে--সাবিত্রী দাস।

Saturday, 5 February 2022

ডঃ তাপস কুমার সরকার --লেখা আহবান!

ডঃ তাপস কুমার সরকার

লেখা আহবান!

তমসিতা সাহিত্য পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার জন্য স্বরচিত অপ্রকাশিত লেখা পাঠান ২৬শে জানুয়ারি, ২০২২ এর মধ্যে।
যেকোন বিষয়ে অনুগল্প - অনধিক ২৫০ শব্দ
লেখা পাঠাবেন হোয়াটসঅ্যাপে টাইপ করে। নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর জানাবেন।
আমরা সৌজন্য সংখ্যা দিতে অপারগ। সাহিত্যের উন্নতিকল্পে ও পত্রিকার স্বার্থে এক কপি কিনলে বাধিত হব। কেনা বাধ্যতামূলক নয়।
নির্বাচিত লেখক তালিকা প্রকাশিত হবে ২৭শে জানুয়ারি, ২০২২। পত্রিকা প্রকাশ নববর্ষে।
ফেসবুকে পড়ে বাবলু ব্যাঙ্গোক্তি করে " ঝেড়ে কাশ না বাবা। না কিনলে ব্যবসা চালাবি কি করে! "
" ঠিকানাটা? " রমেন কথা ঘোরায়।
-- " তুই লেখ। স্কুল থেকেই তো লিখছিস। লিস্টে নাম বেরোবে। প্রিবুকিং করবি। "
-- " কেন? বলছিলি ছাপার হরফে নিজের নাম দেখতে চাস !"
-- "হ্যাঁ, ভাবলাম এইসব পত্রিকা ন্যাকামি করে কিনতে বলবে। টাকা দিলেই ছাপবে। "
-- " বইটই পড়িস? লিখতে গেলে পড়তে হয়। "
-- " খবরের কাগজ তো পড়ি।  ....বাহাত্তর বছরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বিয়ে, রাজমিস্ত্রির সাথে বউ পালানো, সম্পত্তির জন্য বাবাকে খুন,..... কত্তো নিবি?"
-- " তুই কাগজে এসবই পড়িস? "
-- " শতকরা নব্বই ভাগ লোকই পড়ে। গল্পে একটা ঘটনা এদিক-ওদিক করে লিখেছি। প্রথম সংখ্যা! লুফে নেবে।
তুই কি নিয়ে লিখবি?"
-- " তোকে নিয়ে। "
-- "মানে? "
-- " বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা যাদের নেশা, তাদের সম্পর্কে তোর হীন স্বার্থান্বেষী মনোভাব নিয়ে লিখবো। "
বাবলুর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
সাতাশ তারিখে রমেনের ফোনে বাবলুর গলা... " তুই সেরা পাঁচজনের একজন রে। আমারটা  কেন যে বাদ দিল ! "

মিলন-- গৌতম তালুকদার

মিলন
গৌতম তালুকদার

মধুকে হারিয়ে দিশেহারা মল্লিকা। 
বছর যেতে না যেতে শ্বশুর বাড়ির লোকজনের 
কাছে মল্লিকা আর ওর এক বছরের ছেলে যেন বাড়তি বোঝা হয়ে উঠেছে।লাঞ্ছনা গঞ্জনা এতো টাই চরমে উঠেছে, বাধ্য হয়ে বাড়ি ভাড়া খুঁজে  বেরিয়ে আসতে হয়।দু'বেলা দু'মুঠো খেয়ে বেঁচে
থাকার জন্যে নামতে হয় রোজগারে'র রাস্তায়।
একজন বিশেষ পরিচিত মানুষের সাহায্যে নিয়ে একটি অফিসে কাজে'র ব্যবস্থা হয়।কিন্তু সব থেকে মুশকি'ল হল ছেলেকে নিয়ে। কার কাছে 
রেখে যাবে কে আছে দেখবে ঐ টুকু দুধে'র বাচ্ছা টাকে। কোনো কূল কিনারা না পেয়ে সাথে করে নিয়ে যায় অফিসে।অফিসে'র কলিগরা প্রথমে কয়েক দিন কিছু না বললেও এখন বলতে শুরু করেছে। অফিসে'র বড় বাবু রমেন সাধু ওকে ডেকে বললেন-
ছেলেকে নিয়ে অফিসে আসা যাবে না।ছেলেকে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করতে পারলে তবেই যেন কাজে আসে,তা না হলে আসতে হবে না।
মল্লিকা'র মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে ,কি
করবে ও ভেবে উঠতে পারছে না।যদিও একটা কাজ পেলো তাও হাত ছাড়া হয়ে যাবে ..........!

অনেক করে রমেন সাধুকে বলে-
কয়েকটা দিন সময় দিতে একটু মানিয়ে নিতে কিন্তু রমেন সাধু'র এক কথা-ওর কোনো অসুবিধা ছিলো না। অন্য স্টাফরা
আপত্তি করছে ,ওদের কাজে'র অসুবিধা হচ্ছে।
কলিগদে'র কয়েক জনের কাছে অনুরোধ করে কয়েকটা দিন একটু মানিয়ে নিতে।
সকলেই বলে- রমেন স্যা'র যদি পারমিশন দেন তাহলে ওদের আর কি বলার আছে।
মল্লিকা কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না।রমেন সাধু সাফ জানিয়ে দেয় ওকে কাজে আসতে হবে না। 

বাড়িতে ফিরে মল্লিকা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এক মাত্র বাপে'র বাড়ি সেও তো ওপার বাংলায়।আজ থেকে সাত বছর আগে মধু ওপার বাংলায় ওর দিদি'র বাড়ি বেড়াতে য়ায়।পাশের পাড়াতে মল্লিকাদের বাড়ি।মাস দুই থাকে মধু।পরিচয় হয় মল্লিকা'র সাথে। দুজন দুজনা'র প্রেমে পড়ে।
মধু মল্লিকাকে বিয়ে করে নিয়ে চলে আসে এ 
বাংলায় মধুদে'র বাড়িতে।

প্রথম থেকেই মল্লিকাকে তেমন ভাবে কেউ মেনে নিতে চায়নি।যন্ত্রনা বাজে ব্যবহার নির্যাতন সহ্য করে মধুর বুকে মাথা গুছে দিন কাটায় মল্লিকা।মধু ওকে ভীষন ভালোবাসে সব সময় বোঝাতো যাতে ও মাথা গরম না করে। বোলতো ওদের এমন দিন থাকবে না।একটা লোন পেতে অনেক চেষ্টা করছে,লোনটা পেয়ে গেলেই ওর সাপলাই এর ব্যবসা ভালো ভাবে করতে পারবে। কোনো মতে দু'টো বছর কষ্ট করতে পারলেই আলাদা ভাবে থাকার ব্যবস্থা ক'রে নেবে।ততো দিনে তো ছেলেও একটু বড় হয়ে উঠবে। 

হায়রে মানুষের স্বপ্ন,বিধাতা'র ইচ্ছেতে তা পূরণ হয় আবার ভেঙ্গে যায় হঠাৎ করেই ছুটে আসে কোনো না কোনো অজানা অচেনা বিপদ ,আর কারো কারো স্বপ্ন থেকে জীবন পর্যন্ত কেড়ে নেন বিধাতা।কথায় বলে কপালে লিখন কে খন্ডাবে।  অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে হঠাৎ করেই কঠিন অসুখে পড়ে মাত্র এক মাসের মধ্যেই চলে যেতে হয় মধুকে এপৃথিবী থেকে,স্ত্রী,পুত্র,সজন পরিজনের মায়া ত্যাগ করে।ছয় মাসের ছেলেকে
নিয়ে মল্লিকা দাসী হয়ে থেকেও শ্বশুর বাড়ির লোকের মন পায় না। শেষে বাধ্য হয় বেরিয়ে
আসতে। মধুর রেখে যাওয়া সামান্য কিছু টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে কোনো মতে দিন চলছিলো এ কাজটা পেয়ে একটু স্বস্তি'র নিঃশ্বাস পড়তে না পড়তেই .....!

সারা রাত ভেবেও কোনো কূল কিনারা করতে পারে না। ঘুম থেকে উঠে চুপচাপ বসে থাকে
কিছু সময় বাদে কলে জল আনতে গেলে পাশের ঘরের ভারাটে বউ'টা জিজ্ঞাসা করে-
-আজ কাজে গেলে না যে ? 
একটু চুপ থেকে বলে-
-কি করে যাবো অফিস থেকে সাফ বলে দিয়েছে ছেলেকে নিয়ে যাওয়া চলবে না। কি যে করি...!
-কিছু মনে করো না। তোমায় তো আগেই বলেছি
ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গেলে ওরা তোমায় কাজে
রাখবে না।অফিস তো আর তোমার অসুবিধে'র কথা শুনবে না। এখন কি করবে তাহলে ?
-ভাবছি একটু বেলা করে অফিসে যাবো। বড় 
বাবুকে আর একবার অনুরোধ করে দেখি যদি ..
-দেখো চেষ্টা করে। তানা হলে ছেলেকে কোনো
অনাথ আশ্রমে রাখার ব্যবস্থা করো।চাকরিটা
গেলে আর কি পাবে।শেষে লোকের বাড়ি বাড়ি বাসন মাজার কাজ করতে হবে।
কথাটাশুনতেই মল্লিকা'র বুকটা মোচড় দিয়ে 
ওঠে,এক মাত্র ছেলে ছাড়া ওর তো আর কেউ নেই। ছেলেকে ছেড়ে কি করে থাকবে।দুঃখে কষ্টে দিন কাটলেও তো ওর মুখ দেখে বেঁচে আছে।
তাছারা শুনেছে অনাথ আশ্রমে রাখতে গেলেও সুপারি'শ লাগে।কে করবে সুপারি'শ,তেমন কেউ বা কারো সাথেই তো জানাশোনা নেই। 
ওখানেও নাকি আজ'কাল পয়সা ছাড়া কাজ হয় না,বাচ্ছা রাখা য়ায় না।
                              
দুপুরে ছেলে নিয়ে মল্লিকা অফিসে আসে রমেন বাবুর সাথে দেখা করে অনুরোধ করে অত্যন্ত এ মাসের যে বারো দিন বাকি আছে মাস শেষ হতে একটা দিন যদি ওকে কাজ কর'বার সুযোগ দেন এর মধ্যে ছেলের একটা ব্যবস্থা করে নিতে চেষ্টা করবে। রমেন বাবু ওকে বাইরে বসতে বলে এক বান্ডিল কাগজে সই  করতে করতে কিছু একটা ভাবতে থাকেন মোবাইলে কাউকে ফোন করেন।
পিয়ন রতন,মল্লিকাকে চুপচাপ মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করে-
-কি হলো দিদি বড় বাবু কি বললেন ?
-কিছুই তো বললেন না ,বাইরে বসতে বললেন।
-ভেবো না বড় বাবু এমনিতে মানুষটা ভালো।
-কি জানি ভাই কিছুই তো বুঝতে পারছিনা জানি না কপালে কি আছে।
বড় বাবুর ঘর থেকে বেল বাজতেই রতন ছুটে যায়,বেড়িয়ে এসে মল্লিকাকে বড়বাবুর ঘরে
যেতে বলে নিজের কাজে চলে যায়।
মল্লিকা ভাবে ওকি বড় বাবুর পা জড়িয়ে ধরবে!
ভাবতে ভাবতে বড় বাবু্'র রুমে ঢোকে।
রমেন বাবু ওকে বসতে বলে।রতন এসে রমেন বাবুর হাতে একটা খাম দিয়ে চলে যায়।
রমেন বাবু মল্লিকা'র দিকে খামটা এগিয়ে  দিয়ে বলেন-
-তোমার এমাসে'র পুরো মাইনে।একদিন কাজ না করলেও চলবে।
মল্লিকা কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।তাহলে কাজটা গেলো, আর কোনো' আশাই থাকলো না!
ওকে ভাবতে দেখে রমেন বাবু হাসি মুখে বলে-
-এত কি ভাবছো ? তুমি বললে কদিনে'র মধ্যে
ছেলের একটা ব্যবস্থা করবে, বেশ তো ব্যবস্থা  করে ফের চলে এসো। তোমার চাকরি থাকছে। 
মল্লিকা কি বলবে কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
এতো মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়া। এমাসে'র মাইনে
দিয়ে বিদায় করা। 
ওর মনের অবস্থা রমেন বাবু বুঝতে পেরে বলে--কোনো চিন্তা করোনা।ছেলেকে কোথাও রাখার ব্যবস্থা করেই চলে এসো।আমি আছি তোমার চাকরি যাবে না।
একটা ফোন আসতে'ই রমেন বাবু বলে- 
-এবার এসো।দুজন ক্লায়েন্ট আসছে মিটিং আছে ওদের সাথে ।
মল্লিকা যেন সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মুখ থেকে কোনো কথাই বেড়তে চাইছে না। শুধু
নমস্কার জানিয়ে মাথা নীচু করে বেরিয়ে আসে।
                                  (২)
মাস খানেক আগেও অশোক বাবুকে দেখে ভীষন খারাপ লাগছিলো সন্তোষের।বহু বছর 
পাশাপাশি থাকার ফলে খুবই কাছের আপন জন হয়ে উঠেছিলেন। মাত্র মাস ছয়েক আগে সন্তোষ অন্যে যায়গায় পছন্দ সই একটি রিসেলের ফ্লাট কিনে চলে যায়। 
মাঝে মধ্যে দেখা হয়েছে ফোনে কথা হয়েছে।এর পরেই দেশ জুড়ে শুরু হয় অতিমারী করোনার তান্ডব। অশোক বাবু তিন বছরের অয়নকে নিয়ে বেশ মুশকিলে আছেন। কোনো কিছুর অভাব    নেই সারকারি বড় চাকুরি নিজস্ব বাড়ি গাড়ি ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ও ভালো। দুর সম্পর্কের আত্মীয় স্বজন ছাড়া এক মাত্র বোন সেও বিয়ের পরেই স্বামীর সাথে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে।নিঃসন্তান অশোক বাবু বিবাহের দশ বছর পার করেও যখন কোনো আশার আলো দেখতে পায় না, যখন ডাক্তাররা স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন আর কোনো ভাবেই অশোক বাবুর পক্ষে সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়।এ কথা জানতে পেরেই স্ত্রী পুষ্প মানুষিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে।পুষ্পকে সুস্থ করে তুলতেই ডাক্তার,শুভাকাঙ্খী,পরিচিত-পরিজনের পরামর্শ মেনে পুষ্পর মা ডাক শোনার ইচ্ছেকে এবং হাসি খুশী রাখতে সিন্ধান্ত নেয় দত্তক নেবার। 
মাস খানেকের মধ্যে এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন মল্লিকা'র আর ওর ছেলের কথা।
এদিকে মল্লিকা অনেক ছোটাছুটি করছে যদি 
ছেলের একটা ব্যবস্থা হয় কোথাও বা কোনো অনাথ আশ্রমে রাখার ব্যবস্থা করতে পারে।
অশোক বাবু বন্ধুকে নিয়ে দেখা করেন মল্লিকার সাথে। মল্লিকার ছেলে অয়নকে দত্তক নেবার কথা জানায়।মল্লিকাও ছেলের ভবিষ্যতের কথা  ভেবে আর আপত্তি করে না। তবে শর্ত একটাই  প্রতি সপ্তাহের রবিবার দিন ছেলেকে ওর কাছে দিয়ে যাবে আবার রাতে এসে নিয়ে যাবে। এব্যাপারে অশোক বাবুও কোনো আপত্তি করে না। ভালোই কাটছিল ওদের দিন।পুষ্প ও খুশি। দত্তক ছেলে পেয়ে নিজের ছেলে মনে করে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে।মাতৃত্বের সাধ পূরনে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে অয়নের মুখে আধো আধো স্বরে মা ডাক শুনে বুক জুড়িয়েছে। 
রবিবার করে অশোক বাবু অয়নকে মল্লিকার কাছে সকালে দিয়ে আসে আবার সন্ধ্যার আগে গিয়ে নিয়ে আসে এভাবে কয়েক সপ্তাহ কাটার পর দেখা যায় অয়নের অনেক পরিবর্তন ঘটছে দিনে দিনে মল্লিকাকে নিজের মা হিসেবে ভুলতে বসেছে দু'তিন ঘন্টা থাকতে না থাকতেই কান্না কাটি শুরু করে দেয় মল্লিকার কাছে ইদানিংও যেতেই চাইছে না। মল্লিকা গোপনে চোখের জল ফেলে। কি করবে জোড় করে আটকে রাখতে  পারে না। অয়ন তো এখন ওদের ছেলে। তাছাড়া
যে সন্তান নিজে মাকে ভুলতে বসেছে সেখানে  বুকে পাথর চাপা দিয়ে মেনে নিতেই হয়।
অয়ন মল্লিকাকে মন্নি বলে ডাকে,মল্লিকা এটা সেটা দিয়ে ভোলাতে চেষ্টা করেও লাভ হয় না।
অল্প দিনের মধ্যে মা ছেলের দূরত্বটা ভীষন ভাবে দেখা দেয়। মনের কষ্ট চেপে মল্লিকা ছেলেকে ধরে রাখার বৃথা চেষ্টা করবেনা ভাবে। 
এছাড়াও সেদিন যখন অশোক বাবুর বাড়িতে 
ঢুকছে আড়াল থেকে শুনতে পায়।পুষ্পর এই
কথা গুলো,পুষ্প অশোক বাবুকে বলছে-
আমরা তো কোনো আপত্তি করিনি বাবান কে
ওর কাছে নিয়ে রাখতে কিন্তু বাবান তো ওকে 
চায় না পছন্দ করছে না,সেটা কি মল্লিকা বুঝতে পারছে না! তাহলে ছেলেকে দিলো কেন না দিলে তো আমরা জোর করে নিয়ে আসতাম না।ওর তো বোঝা উচিত। সেদিন মল্লিকা দেখা না করেই চলে আসে ওবাড়ি থেকে।নিজের ঘরে এসে খুব করে কাঁদে, বিছানায় লুটিয়ে পড়ে নিজের ভুল  আর বোকামির জন্যে, ভাবে একটা মাত্র ছেলে
কে কাছে রাখার মতো কোনো যোগ্যতা ওর নেই,একি করলো ও। এর জন্যে তো ও কাউকে দোষ দিতে পারবে না তাছাড়া ওর ছেলেকে ওরা তো মাথায় করে রেখেছে। সে দিনের পর থেকে মল্লিকা ওবাড়িতে য়ায় না।অশোক বাবুও আর রবিবার হলে অয়ন কে দিয়ে আসে না। মল্লিকা চাতক পাখির মতো পথের দিকে তাকিয়ে থাকে এই বুঝি ছেলে এলো ! কই কেউ তো আসে না।

হঠাৎ যেন সব কিছু উল্টে পাল্টে  যায় দেশে বিদেশে দেখা দেয় ভয়ঙ্কর রোগ অতি মহামারী  করোনা। সবার সাথেই এক প্রকার যোগাযোগ দেখা সাক্ষাৎ প্রায়ই বন্ধ হয়ে য়ায়।একটা মোবাইল ফোন ছিলো মল্লিকার সেটাও বেশ কয়েক দিন আগে নষ্ট হয়ে গেছে,ভেবে ছিলো এমাসে বেতন  পেলেই একটা কম দামের সেট কিনে নেবে কিন্তু লক ডাউন শুরু হয়ে যাওয়ায় আর কেনা হয়না। সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ।নিজে থেকে কারো খোঁজ খবর নিতে পারছে না ছেলেটার খবর পাচ্ছে না।এর মধ্যেই করোনা থাবায় আক্রান্ত হয় পুষ্প। হাসপাতাল ভর্তি থেকে ভালো হয়ে বাড়ি আসে। মাত্র পনের দিনের মাথায় হার্ট ব্লকেজ হয়ে চলে যায় না ফেরার দেশে।অশোক বাবু ভীষন ভেঙ্গে  পড়ে মনের দিক থেকে। কি করবেন ভেবে পায় না অয়ন প্রায়ই খাওয়া ঘুম ছেড়েই দিয়েছে। 

মল্লিকা গোপনে চোখের জল ফেলে নিজেকে একজন হতভাগী মা ভেবে।ছেলের এমন সব আচরনে এতটাই কষ্ট পেতে থাকে ভাবে এমনকি পাপ ও করেছে যে নিজের পেটের ছেলেও ওকে ভুলে গেলো! বুকে পাথর চাপা দিয়ে দাঁতে দাঁত  চেপে ওকে বাঁচাতেই তো এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।ভেবেছিলো আর যাই হোক সপ্তাহে অন্ততঃ একটা দিন ছেলেকে কাছে পাবে মা ডাক শুনতে পাবে কিন্ত সব কিছুই যেন  উল্টো হয়ে গেলো।কেন এমন হলো ওর সাথে,এ কোন পাপের ফল! 
ওর বেচেঁ থেকে কি হবে কার জন্যে বাঁচবে দিনে দিনে পেটের ছেলে পর হয়ে নিজের মাকে ভুলে গেলো এত অপ্ল সময়ে! এমনটা হবে বুঝলে কি এমন সিদ্ধান্ত নিতো। অনেক বড় ভুল হলো এ জীবনে কিন্তু এখন তো আর কিছুই করার নেই নিজের ইচ্ছেতে আইনের সমস্ত দিক মেনেই তো ছেলেকে ওদের কাছে দিয়ে দিয়েছে বিনিময়ে শুধু একটাই শর্ত রেখে ছিলো সেটা তো ওরা মেনেছে পালন করেছে।ওদের ওতো কোন দোষ দেওয়া যাবে না।যেখানে নিজের ছেলে চায় না মাকে মা বলে ডাকে না,ভুলে গেলো তার জন্যে আর মায়া বাড়িয়ে কি হবে !ও যাতে ভালো থাকে
মানুষের মতো মানুষ হয় সুস্থ থাকে ভগবানের 
কাছে মা হিসেবে এটাই এক মাত্র প্রার্থনা।
                                 (৩)
অশোক বাবু বেশ কিছু দিন ছুটি নিয়ে বাড়িতেই ছিলেন তাতেই বুঝেতে পারে ওনার পক্ষে ছেলে  সামলানো অসম্ভব।সব সময়ের জন্যে এ বাড়িতে থেকে রান্না-বান্না,ছেলের দেখাশোনা করার মতো এমন এক জন বিশ্বস্ত মহিলার খোঁজ করেও পাচ্ছে না। চাকরি থেকে অবসর নিতে এখনো
পাঁচ বছর।অনেকে অশোক বাবুকে পরামর্শ দেয় ছেলেকে ওর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আবার বিয়ে করতে।অনেক ভাবে অশোক বাবু।এবয়সে এসে বিয়ে করা কি উচিৎ হবে !নতুন বউ এসে  অয়নকে মেনে নিতে পারবে ! অয়নও কি মেনে নিতে পারবে ! অয়ন যে ভাবে পুষ্পকে মা ভেবে জড়িয়ে ধরে ছিলো তেমনটা যদি না হয়এক্ষেত্রে!
ভেবেছিল মল্লিকাকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে ওকেই ফেরত দেবে।মল্লিকার যাতে চাকরি করে খেতে নাহয়।তেমন কিছুর ব্যবস্থা করে দেবে।অয়নের  বড় হয়ে ওঠা জন্যে যাতে কোন প্রকার সমস্যা অসুবিধায় পড়তে না হয়।তাছাড়া করবে না কেন দত্তক নিয়েছে নিজের ছেলের মর্যাদা দিতেই তো অয়নকে গ্ৰহন করেছে। নিজের যা কিছু স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি টাকা পয়সা আছে সবটাই তো আগামী দিনে অয়নের হবে।আর তো কেউ নেই যে তার কথা ভাববে। লক ডাউন কিছুটা হাল্কা হতেই এভাবনা কার্য্কর করার জন্যে অশোক বাবু মল্লিকার সাথে দেখা করতে গেলেন,গিয়ে দেখেন জানতে পারেন মল্লিকা ওবাড়িতে থাকে না। সপ্তাহ দুই আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।
কোথায় গেছে কাউকে কিছুই বলেনি।হঠাৎ করে বেপাত্তা।এমন কি সাথে করেও কিছু নিয়ে যায় নি।বিষয়টা সকলের কাছে অবাক করার মতো। 
একজন জলজ্যান্ত সুস্থ মহিলা একা একা চলে গেলো,এনিয়ে আসে পাশের দু চার জন যে বাঁকা মন্তব্য করে নি তাও নয়।সেকথায় অবশ্য কান দেবার মানষিকতার মানুষ নয় অশোক বাবু উনি নিজে দেখেছে অল্প দিনের হলেও কথা বলেছে  কখনো তেমন কিছু মনে হয় নি।খুবই ভদ্র ভালো স্বাভাবের মহিলা।লোভ লালসা বলতে কিছু নেই তা না হলে ছেলের বিনিময়ে যে টাকা দিতে চেয়ে ছিলেন অনায়াসে নিতেই পারতো বা আরো কিছু চাইতে পারতো।শুধু একটাই শর্ত করেছিল প্রতি রবিবার ছেলেকে ওর কাছে রাখবে। 
মল্লিকার অফিসে খোঁজ করে জানতে পারে লকডাউনের পর অফিস খুলেছে, মল্লিকা আসেনি কোনো যোগাযোগও করেনি।কোথায় গেছে ওরা জানেনা।মল্লিকার শ্বশুর বাড়ির লোকেরা আরো
উল্টো কথা বলে।অবশ্য অশোক বাবু ওদেরকে  ছেলের ব্যাপারে কিছুই জানায় নি।পরিচিত এক জন মানুষ হিসেবে খোঁজ করছে বলেই চলে আসে। সমস্যা হয়ে গেলো।কি করবে,কি করা উচিত কিছুই বুঝে উঠে পারছে না এভাবে আরো কয়েকটা দিন কেটে গেলেও আর সম্ভব হচ্ছে না হাতেও বেশী সময় নেই, ভাবে,কয়েক দিনের জন্যে অয়নকে নিয়ে বাইরে কোথা থেকে ঘুরে আসবে তাতে যদি অয়নের মন ভালো হয় কিছু পরির্বতন ঘটে তা না হলে 
ছেলে কে বাঁচাবে কি ভাবে।শেষে ঠিক করলেন উত্তর বঙ্গের দিক যাবেন।ট্রেনের টিকিট কেটেই হোটেল বুক করে রওনা দিলেন।
                                 (৪)
সেদিন বিকেলে অয়নকে নিয়ে হোটেল থেকে
বেড়িয়ে হাঁটতে থাকেন চা বাগানের সরু পথ ধরে চারদিকে সবুজে ঘেরা চা বাগান দূরে নীল আকাশ ছুঁই ছুঁই করছে পাহাড়, ছুটে আসা মুক্ত বাতাস অয়নের ভালো লাগছে বুঝতে পেরে আরো কিছুটা এগিয়ে যেতেই একটা সুন্দর শিশু পার্ক দেখতে পেয়ে পার্কের ভেতরে গেলেন।
নানান পশু পাখি দোলনা দিয়ে এমন সুন্দর করে সাজানো পার্ক দেখে অয়ন বেশ খুশি হয়ে ছোটা ছুটি করতে থাকে।কয়েক জন মধ্যবয়সি লোক পার্কে বসে গল্প করছেন।ওরাই অশোক বাবুকে দেখে ডেকে জিজ্ঞাসা করে--মহাশয় কে দেখে তো এখান কার লোক বলে মনে হচ্ছে না। তা কোথা থেকে আসছেন?
অশোকবাবু দুটো কথা বলার লোক পেয়ে মনে মনে খুশী হয়ে ওনার পরিচয় দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে ফিরে এলেন হোটেলে।জায়গাটা বেশ ভালো লেগেছে অয়নের অশোক বাবুও গল্প করার মতো কয়েক জন লোক পেয়ে পর পর পার্কে আসতে শুরু করেন।গুরু চরণ নামেরএক ভদ্রোলোকের সাথে বেশ আলাপ জমে ওঠে।গুরু চরণ বাবুও জানায় ওনার বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে অশোক বাবুর এলাকাতে মানে মধ্যম গ্ৰামে। ওখানে ওনার মেঝো ভাই থাকেন নাম বলতেই চিনতে পারেন।সেখান থেকে দুজনের ভাব হয়। বন্ধু হয়ে সংসার জীবনের সুখ দুঃখের কথা গল্প করেন। অশোক বাবু মুখে অয়ন আর  মল্লিকার কথা জানতে পেরে গুরু চরণ বাবু কি সব যেন ভাবতে থাকেন।
অশোক বাবু জানতে চাইলে সে কথার উত্তর না দিয়ে জানতে চায় 
-আর কদিন আছেন এখানে,কবে ফিরবে যাবেন কোলকাতায় ?
-ইচ্ছে আছে কুচবিহার রাজবাড়ি, মদনমোহনের মন্দির দর্শন করবো।এখান থেকে  দুদিন পরেই বেড়িয়ে যাবো।ওখানে থেকে সোজা কোলকাতা।

পরের দিন সকালে গুরুচরণ বাবু হোটেলে এসে দেখা করে অশোক বাবুর সাথে। দুপুরে ওনার বাড়িতে খাবার নেমন্তন্ন করে।অশোক বাবু লজ্জা পেয়ে আপত্তি করলে বলেন 
-আমার স্ত্রী আলাপ করতে চায় আপনার সাথে।মেয়ের শ্বশুর বাড়ির এলাকার লোক আপনি, বুঝতেই তো পারছেন ওকে তো হোটেলে নিয়ে আসতে পারি না। তাছাড়া দুজনে বন্ধু হলাম যখন তখন আর না কেন মশাই? আমি  লোক পাঠিয়ে দেবো সে আপনাদের আমার  বাড়িতে নিয়ে যাবে ।
অগত্যা যেতেই হবে। ভদ্রলোকের সন্মানার্থে।
দুপুরে খাবার পর্ব শেষ করে ওনারা গল্প করছেন অয়ন আর গুরুচরণ বাবুর ছেলের ঘরের নাতি এঘরওঘর ছোটা ছুটি করে খেলছে অশোক বাবু
যেন পরিচিত একজন ভদ্রমহিলাকে দেখতেপায় দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে। উঠে এগিয়ে গেলন কিন্তু ততোক্ষনে উনি বেরিয়ে গেছে।ফিরে এসে ভাবছে,দেখে মনে হয় মল্লিকা।নাকি দেখারভুল! 
আরো একটু ভেবে গুরু চরণ বাবুকে বলতে-
গুরু চরণ বাবু অবাক হয়ে বলেন -
-বলেন কি মশাই ওর নাম তো তাপসী।পাশেই আমার দাদার বাড়ি।ওতো দাদার বাড়িতে থাকে  মাস দুই এসেছে ,সে অনেক কথা ।
বসুন বলে উঠে গেলেন।অশোক বাবুও যেন  একটা অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলেন।
নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করতে থাকেন-
ঠিক দেখেছে তো নাকি ওর দেখার ভুল! হয়তো মল্লিকার মতো দেখতে হঠাৎ এক পলক দেখেছে মাত্র ভালো ভাবে দেখার সুয়োগ হলো কোথায়!
তাছাড়া মল্লিকাএতো দূরে আসবে কি করে যত দুর জানা আছে একমাত্র শ্বশুর বাড়ি ছাড়া তো 
ওর আর কোনো আত্মীয় পরিজন নেই এদেশে গুরু চরণ বাবুরা কি ওর .....!
নিজের কাছে কেমন যেন একটা বোকা বোকা
লাগছে এই ভেবে সত্যি যদি মল্লিকা না হয়ে তাপসী হয় গুরু চরণ বাবুরা কি ভাবেন !

কিছু সময় পরে গুরু চরণ বাবু তাপসী নামের মহিলাকে নিয়ে ফেরে ।ওরা মুখোমুখি হতেই
না কোনো ভুল দেখেনি এতো অয়নের মা সত্যি মল্লিকা।।যে মল্লিকাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে এক মাত্র অয়নের জন্যে,তানা হলে ছেলেটাকে সুস্থ সবল রাখা বড় করে তোলার কোনো পথ খোলা নেই। 
মল্লিকা অশোক বাবুকে দেখে অবাক হয়। কেউ কিছু বলে উঠতে পারছে না। এর মধ্যেই পাশের ঘর থেকে খেলা করতে করতে বাচ্ছা দুটি এ ঘরে চলে আসে। 
অয়ন মল্লিকাকে দেখা মাত্র থমকে যায়। কিছু  ভেবে ছুটে যতে'ই মল্লিকা অয়নকে জড়িয়ে ধরে, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।অয়ন শক্ত কাঠের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মুখ দেখে মনে হয় কিছুটা ভয় পেয়ে থাকবে।গুরু চরণ বাবু অশোক বাবুকে হাতের  ইশারায় ডেকে পাশের  ঘরে নিয়ে যায়।
                                (৫)
পরের দিন গুরু চরণ বাবুর দাদা রজনী বাবুর কাছে মল্লিকার সবকথা জানতে পারেন অশোক বাবু।সেদিন বিকেলের দিকে রজনী বাবুর বড় বাজার অঞ্চলের ডিউটি শেষ করে থানার দিকে রওনা দিয়েছেন জিপ নিয়ে হাওড়া ব্রীজের মুখে আসতেই নজরে আসে মল্লিকাকে হাওড়া ব্রীজের উপড় দেখেই বুঝতে পারেন মহিলা কিছু একটা
একটা অঘটন ঘটাতে চলেছে পুলিশের চোখ বলে কথা ঠিক তাই ব্রীজ থেকে ঝাপ দেবার মতলব করছে।মুহুর্তের মধ্যে ছুটে গিয়ে ধরে নিয়ে আসেন নিজের থানায়। জিজ্ঞাসাবাদ করে মল্লিকার কাছে ওর জীবনের সব কথা শোনে। বাড়িতে এসে গিন্নীকে সব কিছু জানাতেই রজনী বাবুর গিন্নী মল্লিকাকে থানা থেকে সে রাতেই বাড়িতে নিয়ে আসতে বলে।উনি নিজেও ভেবে দেখলেন আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কোলকাতা থেকে এখানে চলে আসবেন।স্বামী-স্ত্রী ছাড়াওদের সংসারে তো
আর কেউ নেই সব সময় ওদের সাথে থাকবার মতো একজন মানুষের ভীষন প্রয়োজন। ঠিক করলেন ওদের সাথে মল্লিকাকে নিয়ে আসবে।
মল্লিকার  মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। 
কথায় আছে না, যখন যেটা ঘটবার সেটাতো ঘটবেই।এভাবেই আবার মল্লিকাকে খুঁজে পাবে বলেই এখানে এই উত্তর বঙ্গের দিনহাটা তে বেড়াতে আসা গুরুচরণ বাবুর মাধ্যমে মল্লিকার সন্ধান পাওয়া। কিন্তু মুশকিল হলো অয়ন যে মল্লিকাকে ভুলে গেছে জন্মদাত্রী মাকে মা বলে চিনতেই পারছে না এঅবস্থাতে কি করে সম্ভব মল্লিকাকে বলবে অয়নকে ফিরিয়ে নিতে আর অয়নকে ফিরিয়ে দিয়েও তো নিজে একা একা থাকতে পারবে না।
অশোক বাবু  ঘুমের মধ্যেই যেন পুষ্পর গলায় শুনতে পেলেন, পুষ্প বলছে-মল্লিকার মধ্যে তুমি আমায় খুঁজে নাও তাহলেই দেখবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে মল্লিকা ওর ছেলে পাবে অয়ন পাবে ওর মা আর আমি  মল্লিকার ভেতরে তোমার পুষ্প হয়ে থাকবো।
তোমাদের এ মিলনে আমিও স্বস্তির সাথে শান্তি পাবো আমাদের অয়ন ও ভালো থাকবে।
সেদিন সকালে সন্তোষের ফ্লাটের সামনে একটা গাড়ি এসে থামে সন্তোষ বাজারের দিকে এগিয়ে যেতেও একবার থামে কে এলো কৌতূহল।দেখে গাড়ি থেকে একজন ভদ্রোলোক ভদ্র মহিলা নেমে দাঁড়ায় কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সন্তোষ ভদ্রলোক পেছন ফিরে থাকায় ঠিক বুঝতে পারছে না পরিচিত নাকি অপরিচিত কেউ !
ভদ্রোলোক ঘুরতেই দেখে অশোক বাবু,এগিয়ে
যায় সন্তোষ।অশোক বাবু ওকে দেখেই হাসতে হাসতে বলে--সেদিন বলেছিলাম না হঠাৎ তোমার চমকে দেবো। তাই চলে এলাম না জানিয়ে।
সন্তোষের আর বুঝতে বাকি থাকে না। জড়িয়ে ধরে অশোক বাবুকে বলে-
-খুব সুন্দর সারপ্রাইজ আমার জন্যে। সত্যি আমি ভীষন খুশী হলাম আপনাদের নতুন জীবন ভরে উঠুক আনন্দ খুশীতে।
                    
                           *****
 
*গৌতম তালুকদার 
৫১,প্রতাপ গড়, গরফা
যাদবপুর ,কোলকাতা-৭০০০৭৫
মোঃ-৯০০৭০৩৫৬৯১

অশরীরী--অনিমা মুখার্জি

অশরীরী--অনিমা মুখার্জি

আজ থেকে প্রায় বছর পাঁচেক আগের কথা । ঘটনাটি ঘটে পলাশপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যাlলয়ে । দিনটি ছিল সরস্বতী পূজার । স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সব পুজোর কাজে ব্যস্ত--কেউ আলপনা দিতে, কেউ বা মন্ডপ সাজাতে।
স্কুলটি একতলা । পাঁচটা ঘর, প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণি অব্দি মোট একশ তিরিশ জন পড়ুয়া । পুজো মিটলেই স্কুলটি দোতালা হবে তার জন্য কিছু ইঁট বালি সিমেন্ট এনে রাখা হয়েছিল স্কুলের পিছন দিকের ফাঁকা জায়গায় । 
পঞ্চম শ্রেণীর কিছু ছাত্র স্কুলের ছাদে উঠে ছিল ঘুড়ি উড়াবে বলে । হঠাৎই একটা হট্টগোল শোনা গেল । দৌড়ে নিচে সবাই গিয়ে দেখল, একটি ছাত্র ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেছে আর ওই ইঁটের ওপর পড়ে মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে । ছেলেটিকে অচৈতন্য অবস্থায় তুলে নিয়ে দৌড়ালো সদর হাসপাতালে কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে । পূজোর ওই সুন্দর পরিবেশ নিমেষেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল ।
কিছুদিন পর স্কুলে এক নতুন শিক্ষক নিযুক্ত হন--নির্মল বাবু । তিনি আবার ভূতে বিশ্বাস করেন না । অনেকেই বলে পাশের কার্নিশের যে প্রান্ত থেকে ছেলেটি পড়ে গিয়েছিল সেখানে নাকি একটি ছোট ছেলেকে প্রায়ই কার্নিশ ধরে ছুটে বেড়াতে দেখা যায়, তবে একথা নির্মল বাবু বিশ্বাস করেন না।
একদিন স্কুল ছুটির পর তিনি নিজের কিছু কাজ সেরে বাড়ি ফিরতে  সন্ধ্যে নেমে এল । মাটির পথ ধরে তিনি যখন যাচ্ছেন তাঁর সামনে যেন একটি ছোট ছেলে হেঁটে চলেছে । নির্মল বাবু যতই পা চালিয়ে ছেলেটিকে ধরবার জন্য এগোচ্ছেন ছেলেটি ততোই যেন আরো এগিয়ে যাচ্ছে । নির্মল বাবু তো হতবাক এত বাচ্চা ছেলে এত তাড়াতাড়ি কি করে হাঁটতে পারে ? তারপর তিনি যখন স্কুলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন তখন তিনি দেখলেন ওই ছেলেটির স্কুল বাড়িতে ঢুকে গেল । নির্মল বাবুও ছেলেটির পেছনে পেছনে গেলেন তারপর তিনি যা দেখলেন তা তো বলা বাহুল্য--ছেলেটি ছাদে উঠে কার্নিশ ধরে ছুটে বেড়াচ্ছে । তখন নির্মল বাবু আর নিজের মধ্যে নেই, এতদিন ভূত সম্পর্কে যা ভেবেছেন তার পুরোটাই মিথ্যে একথা মানতে তিনি বাধ্য হলেন। পড়িমড়ি করে ছাদ থেকে নেমে এসে তিনি দেখলেন, সেই ছেলেটি তারই সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে । অবিশ্বাসের আর কোনো অবকাশই রইল না।
সমাপ্ত

খুব বাঁচান বেঁচেছি--ঊশ্রী মন্ডল

খুব বাঁচান বেঁচেছি 
ঊশ্রী মন্ডল

সূর্য ডোবার সাথে সাথেই বজ্জাত সন্ধ্যা আদিখ্যেতা দেখিয়ে দাঁত কেলিয়ে হুড়মুড়িয়ে এসে গেলো , সন্ধ্যে হলেই আমাদের পাড়াটা একেবারেই নিঝুম হয়ে যায় , রাস্তায় এক্কা দোক্কা লোককেই চলাচল করতে দেখা যায়, এই সময় কপকপানি শীতও খুব রঙ্গ দেখাচ্ছে l সিগারেট না ফুকেও মুখ থেকে অনবরত ধুঁয়া বের করছি , সঙ্গে সংগীত ধরছি হুঁ হুঁ হুঁ..| 
   আমরা থাকি বিধানগরের ডেয়ারি কলোনিতে, আমাদের কলোনির চারিদিক ঘন জঙ্গলে ভরা ,একদিকে এ.বি.এল'র জঙ্গল, ঐ জঙ্গল পেরিয়েই রোজ আমাকে স্কুলে যেতে হয়,আমি ক্লাস নাইনে পরি l দিনের বেলায় যেতেই ভীষণ গা ছমছম করে, সন্ধ্যা হতে না হতেই দুস্টু লোকেদের উপদ্রব ভীষণ ভাবে বেড়ে যায় l
ওপরপারেও তেমনই গভীর জঙ্গল l সেই জঙ্গলে একটা না ভাঙাচোরা পোড়ো বাড়ি আছে  l আমি একটু ডানপিটে মেয়ে,ভয়ডোর একটু কম , তবে কৌতূহল খুব বেশী l মাঝে মাঝেই পাঁচিল টপকে বন্ধুদের সাথে জঙ্গলের ভিতরে ঐ বাড়িতে যাই এডভেঞ্চার করতে l শুনেছি ওটা নাকি নীলকর সাহেবদের কুঠি ছিলো l কখনো কখনো ঐ কুঠিতে রাতের অন্ধকারে মৃদু আলো জ্বলতে দেখি l মাকে জিজ্ঞাসা করাতে উনি বললেন, "ওরা চোর ডাকাত, খবরদার একদম ঐ দিকে যাবি না বলে দিলাম ll"

     কালিপূজো আসছে, তার সাথে চোরের উপদ্রব খুব বেড়েছে,আমাদের উপরের ফ্ল্যাটে,জানিনা কী ভাবে চোর উঠে কাঁচ ভেঙ্গে, অনেক কিছু নিয়ে চম্পট দিয়েছে l তাই সকলেই সজাগ ও চকিত হয়ে থাকতাম l 
      তাড়াতাড়ি খাবার পাঠ চুকিয়ে আমরা যে যার ঘরে দোর এঁটে শুয়ে পড়লাম , ও ঘর থেকে দাদার নাক ডাকার আওয়াজ বেশ শোনা যাচ্ছে , যথারীতি ঝিঁঝিপোকারা তাঁদের কনসার্ট চালু করে দিয়েছে l তারস্বরে হুক্কাহুয়ার দল ঝগড়া করছিলো জানিনা কোথায়..? দূর থেকে শুধু আওয়াজ ভেসে আসছিলো l এক সময় রাত বাড়ার সাথে সাথেই চারিদিক নিঃশব্দ হয়ে গেলো l
             ঘুম আসছিলো না, একবার এপাশ আরেকবার ওপাশ করছিলাম l হঠাৎ বাইরে শুনতে পেলাম কারোর পায়ে চলার খসখস শব্দ l কে .. চোর নাকি ? দেখার আগ্রহে বিছানা ছেড়ে পা টিপে টিপে ধীর পায়ে অন্ধকার বারান্দায় জানলার কাঁচে মুখটা সাঁটিয়ে বাইরেটা দেখতে এলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না,শব্দের উৎস খুঁজতে লাগলাম,না তো.. কেউ কোথাও নেই তো, আমি কি তবে ভুল শুনলাম, নাকি ঐ মাটির ঢিপিতে যে সাপ দুটো মাঝে মাঝেই নাচ দেখায় তাদের চলার আওয়াজ শুনলাম , আনমনে সেই কথাই ভাবছি আর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি l
একটু পরে,হঠাৎ শুনতে পেলাম এক ভয়ঙ্কর হুঙ্কার, "কে রে, এই কেরে তুই ?" চমকে পিছন ফিরে দেখলাম  ,লম্বা একজন লোক একটা ডান্ডা উঁচিয়ে তেড়ে আসছে আমার দিকে , ভয়ে চিৎকার করে বললাম ," ওমা,মাগো আমাকে বাঁচাও," মা আমার চিৎকার শুনে বলে, "কি হয়েছে, কি হয়েছে, দাঁড়া আমি এখুনি আসছি l" হুড়মুড়িয়ে আসতে গিয়ে মশারিতে জড়িয়ে পড়ে গেলেন, কোনোরকম  নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে লেংচে লেংচে এসে লাইট জ্বেলে দিলেন l
      ওমা,দেখি এটা তো আমার বড়ো দাদা, যে অন্ধকার ঘরে ঘুমোচ্ছিলো নাক ডেকে ,আমাকে দেখে দাদা গোল্লা গোল্লা লাল চোখে বলে, "কেন আর কিসের জন্য ভূতের মতো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছিস, এখনই যদি একটা ডান্ডার বাড়ি মেরে বসতাম,তাহলে কী হতো বলতো ? আমি মিনিমিন করে বললাম,"না.. মানে, একটা সরসর আওয়াজ শুনলাম, ভাবলাম চোর এসেছে নাকি, তাই দেখছিলাম l" দাদা বলল," ন্যাকামো হচ্ছে,প্যাঁদানী খেয়ে যে মরে যেতিস, খুব বাঁচা বেঁচেছিস ,খবরদার এভাবে অন্ধকারে কখনই দাঁড়াবি না বলে দিলাম l"
                        ওরে বাবা, খুব বাঁচান বেঁচেছি , আজ থেকে আর কোনোদিন শব্দের পিছনে অকারণে বোকার মতো ছুটবো না,বরঞ্চ লেপের তলায় আরও সেঁধিয়ে যাবো আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞl করলাম l


* আমি ঊশ্রী মন্ডল1965 -21 june  হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় জন্ম । পিতা -ঈশ্বর রমা প্রসন্ন দাশ গুপ্ত, মাতা - শ্রীমতি কমলা দাশ গুপ্ত l স্বামী ও সন্তান নিয়ে আমার সংসার, বাল্যকাল দুর্গাপুরে কেটেছে ; বর্তমানে সল্টলেকে থাকি । 
আমি পেশাদার কোনো লেখক নই l তবে আমি এখন,কাগজে মনের ভাবনাকে কলমের সাহায্যে এঁকে যাই ; আমার চিন্তনকে অক্ষরের সুতায় গেঁথে শব্দের মালা নির্মাণ করি ll

বিশ্বাস-- গোবিন্দ মোদক

বিশ্বাস 
গোবিন্দ মোদক 

সাত্যকি সামন্ত। রাশভারী দুঁদে উকিল। তাঁর দীর্ঘদিনের সহকারী হওয়া সত্ত্বেও শুভজিত তাঁর সঙ্গে কথা বলতে এখনও ভয় পায়। কাজের কথা ছাড়া অন্য কথা বলবার মানুষই নন যেন সাত্যকি সামন্ত। কিন্তু আজ যেন স্যারকে বেশ হাসিখুশি এবং সহজ লাগছে। তাঁর ব্যক্তিত্বের কঠিন আবরণের নিচে এতোখানি সারল্য যে থাকতে পারে তা ভাবতে পারছিল না শুভজিত। শুভজিতের অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে স্বভাববিরুদ্ধ মুচকি হাসি হাসেন সাত্যকি সামন্ত ; ভাবটা এমন যেন -- কিহে ! খুব অবাক হচ্ছো তো !

           তা শুভজিত খুব অবাকই হয়। তার মনের মধ্যে উশখুশ করতে থাকে ছ'বছর ধরে জমে থাকা সেই অমোঘ প্রশ্নটি। ইতস্তত করলেও একসময় জিজ্ঞাসাই করে ফেলে শুভজিত --- স্যার, একটা কথা ছিল। 

           --- অবিলম্বে বলে ফ্যালো বৃথা কালক্ষেপ না করে! 

            স্যারের সরস উত্তর শুনে হেসে ফেলতে যাচ্ছিলো শুভজিত। কিন্তু নিজেকে সংযত করে প্রশ্নটা রাখলো ধীর স্বরে --- স্যার, আপনার সব ভালো, কিন্তু আপনার এই সর্বক্ষণের সঙ্গী কাম ভৃত্যকে দেখলেই কেমন যেন বিসদৃশ মনে হয়। গালে বীভৎস একটা কাটা দাগ, চোখদু'টো কুতকুতে ! কেমন যেন অপরাধীর মতো মুখ।

           --- ইউ আর রাইট, মাই বয়। এই কালু একদা অপরাধীই ছিল। তারপর ওর যখন অনুশোচনা আসে আমি তখন ওকে বাঁচাই, আশ্রয় দিই। সে আজ বারো-তেরো বছর আগের কথা। সেদিন আমি ওর জীবন বাঁচিয়েছিলাম, আর আজ ও আমার জীবন বাঁচানোর জন্য সবকিছু করতে পারে।

          --- তা হয়তো হবে স্যার। কিন্তু যদি ওর পুরোনো অপরাধ প্রবৃত্তি আবার চাগাড় দিয়ে ওঠে?

          --- সেটা অসম্ভব নয়। কিন্তু আমি ওকে দয়ালু মহসীনের কথাটি বলেছিলাম।

           --- দয়ালু মহসীন?

           --- দয়ালু মহসীনের ঘরে একদিন একটা চোর চুরি করতে এসেছিল। মহসীনের ঘুম ভেঙে যাওয়ায় চোরটি ধরা পড়ে যায় এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে থাকে। দয়ালু মহসীন শান্ত স্বরে তাকে প্রবোধ দেন এবং একপোঁটলা জিনিসপত্র ও টাকা-পয়সা দিয়ে তাকে বিদায় করেন। তাঁর এই মহানুভবতা চোরটিকে স্পর্শ করে এবং সে তার চৌর্যবৃত্তি ত্যাগ করে একটি আদর্শ মানুষে পরিণত হয়।

          --- তাহলে স্যার, আপনি বলতে চাচ্ছেন এই কালু তার অতীত মুছে ফেলে দিয়ে .... 

           --- ইয়েস মাই বয়, য়ু আর কারেক্ট। আমরা ক্রমাগত যখন একটা মানুষকে অবিশ্বাস করতে থাকি, তখন সে প্রথমে অসহায় এবং পরে ক্রমশ বেপোরোয়া হয়ে ওঠে। তখন সে করতে পারে না এমন কোনও কাজ নেই। কিন্তু তাকে যদি ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়ে তাকে বিশ্বাস করতে পারা যায়, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই মানুষটি আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। সে ভাবে যে -- সে এখনও ফুরিয়ে যায় নি; সে ভাবে যে তাকে বিশ্বাস করার মতো পদার্থ এখনও তার মধ্যে বিদ্যমান।

           --- কিন্তু স্যার ....

           --- কোনও কিন্তু নয়। আমার কথা বিশ্বাস না হয় তুমি বিশপের বাতিদান ( Bishop's candlestick ) লেখাটি পড়ে নিতে পারো। 

          সাত্যকি সামন্ত আবার তাঁর স্বভাব গম্ভীর স্বরূপে ফিরে আসেন। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুভজিত।

আশুতোষ দেবনাথ

আশুতোষ দেবনাথ 

বাল্যবিবাহ থেকে মুক্তির পেতে অনেক মেয়েরাই নিজের চেষ্টায়  সামাজিক ও পারিবারিক লক্ষণ রেখা থেকে বেরিয়ে আসছে। সে পরিসংখ্যান নামমাত্র।  বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আজও অনেকে ই এই বিয়েতে খুবই উৎসাহী। এমনকি যাদের এই বাল্য বিবাহের বিরোধিতা করার কথা তারও উৎসাহ নিয়ে এই রকম বেআইনি বাল্য বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন বেশ সাজগোজ করে একটা কোনো দান সামগ্রী নিয়ে।
এতদসত্বেও দুটি নাবালিকা নিজেদের বিবাহ নিজেরাই রুখে দিয়ে প্রচারের আলোকে এসে সাহসিকতার পুরস্কার নেবার জন্য দিল্লির দরবারে স্বয়ং রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তারা এমন সাহসিকতা দেখিয়ে নিজেদের তো ধন্য করেছে। উপরন্তু আরো অনেক কিশোরী কে অনুপ্রাণিত করছে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে যাবার জন্য। তাদের মধ্যে আমি এইরকমই একটি মেয়ের কথা জানি যে একটি গরীব  রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে চেয়েছিল অন্তত উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর নার্সিং ট্রেনিং নিয়ে পাশ করে কোনো হাসপাতালের সেবিকা হতে। তখন তার মা বাবা ও আত্মীয় - স্ব - জন তাকে জোর করে বিয়ে দিতে চাইলে সে বাড়ির বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যায় বিয়ের সাজে। যাবার সময় সে তার বিয়ের সাজ ওই যা কিনা ওর মা বাবা সংগ্রহ করেছিল বিভিন্ন ক্লাব, হরিসভা, ধনী আত্মীয় স্ব - জ ন দের কাছ থেকে ভিক্ষা করে। এমনকি গ্রাম পঞ্চায়েতের থেকেই কিছু অর্থ সাহায্য পেয়েছিল এই বেআইনি কন্যাদান সম্প্রদান এর জন্য। মেয়েটি সেই বেনারসি শাড়ি সহ বিয়ের কন্যার যাবতীয় সাজ খুলে ফেলে শার্ট প্যান্ট পরে নিজের বইয়ের ব্যাগ নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না। কিছুদূর যাবার পর একটা নির্মীয়মাণ বহুতলের সামনে ইট বালি সিমেন্ট পাথর ও লোহার রড পাহারা দেবার জন্য দু ' জন নৈশ প্রহরী আর তার বন্ধুরা রঙিন পানীয় সহকারে বাবুদের পুকুরের পাকা রুই মাছ ভাজার স্বাদ পরখ করছিল। তারা প্রথম মেয়েটিকে ছেলে ভেবে মেয়েটিকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু একজনের চোখের শকুন দৃষ্টিই বিপদ ডেকে আনার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। মেয়েটি আর কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে সামনে কিছুদূর দৌড়ে গিয়ে একটি নদীতে ঝাঁপ দেয়। নদী সাঁতরে পার হবার জন্য । কিন্তু পারে না। যদিও মেয়েটি একবার তাদের পাড়ার ক্লাবের বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বড়ো ঝিলে সাঁতার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল। এখন এই রাতের অন্ধকারে সারাদিন উপোস থাকার পর শকুনের  তাড়া খেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে হাপিয়ে উঠেছিল। কিছুদূর যাবার পর মেয়েটি কে ডুবে যেতে দেখে জেলেরা দূর থেকে দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধার করে কাছের হাসপাতালে নিয়ে গেলে অভিজ্ঞ ডাক্তার বাবুরা মেয়েটিকে মৃত বলে ঘোষণা করে ও পুলিশকে ফোন করে জানায় ।পুলিশের তদন্তকারী পুলিশ অফিসার মেয়েটির মৃত দেহ সনাক্ত করতে গিয়ে তার পিঠের ব্যাগ খুলে তার থেকে কিছু  কাগজ বের করে এনে  হতবাক হয়ে যান। ব্যাগের কাগজ পত্রের মধ্যে রাখা ছিল বিদ্যাসাগরের ছবি সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণজীর ছবি আর যে মেয়েদুটি নিজেদের বিয়ে রুখে মিডিয়ার সৌজন্যে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে  রাষ্ট্রপতির নিকট হতে পুরস্কার নিয়েছিল সেই ছবি। যে দৃশ্য  অত্যাধুনিক মিডিয়ার দৌলতে আসমুদ্র ভারতবর্ষের মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল সেই দৃশ্যের  সংবাদপত্রের পেপার কাটিং  যা সে অনেকদিন থেকে যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল। সে সবই এখনো সুরক্ষিত আছে।
              .............................
   আশুতোষ দেবনাথ
     শহীদ বন্ধু নগর
কলকাতা - 700131
,মোবাইল 8902701389

শৈলী-- অদিতি ঘটক

শৈলী
অদিতি ঘটক

বসে থাকতে ভালো লাগছে। এক পাশে বট আরেক পাশে অশ্বথ।
  অশ্বথরকচি কচি সবুজ পাতা বিরাট গাছটার গায়ে ছোট পুঁচকে বাচ্ছার নতুন নতুন আঁকা শেখার মত মনে হচ্ছে।
  চৈত্রের প্রথম দিক। গরম তেমন একটা নেই। অহনা অলস ভাবে লঞ্চ,  স্টিমারের চলাচল, জেলেদের মাছ ধরা দেখে চলেছে। স্ট্যান্ডের বেঞ্চে বসে মানুষের আনাগোনার মাঝে ছিটকে ছিটকে আসা কথা শুনছে। কান করে যে শুনছে বা মনে রাখছে এর কোনোটাই নয়। হাওয়ায় যেমন আসছে তেমনি মিলিয়ে যাচ্ছে। নানা বয়সের, নানা ধরনের নারী ,পুরুষের নানা অভিব্যক্তি।
  আজ অহনা একটা বেঞ্চে একাই বসে আছে। এক মনে সামনের ডিঙি নৌকায় বাবা আর তার বালক ছেলের মাছ ধরা দেখে যাচ্ছে। সঠিক ভাবে বলতে গেলে তাদের অধ্যবসায় দেখে যাচ্ছে। প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল একটা মাছও ওঠেনি। চালাক মাছেরা বার বার চার খেয়ে চলে যাচ্ছে। দুজনেই কি নিষ্ঠা ও ধৈর্য্যের সঙ্গে আবার চার গাঁথছে---
 "কি ধৈর্য্য বলুন। দরদাম করার সময় কিন্তু এই একাগ্রতার কথা মনে রাখিনা।"
 অহনা চমকে ওঠে। ও নিজের খেয়ালে এত মগ্ন ছিল এই বুড়োটে, ক্ষয়া, উলোঝুলো লোকটা কখন এসে বসেছে জানতেও পারেনি। তাহলে অহনা আগেই উঠে যেত। 
আসলে অহনা অনেক কিছুই জনতে পারেনা। যেমন প্রলয়ের মুখে না বলা অবধি তাকে ভালোবাসার কথা। বিয়ের পর প্রলয় বলেছিল "এই বুদ্ধি নিয়ে চাকরি করো কি করে ? বাবাহ ! এত মোটা, মোটা হিন্ট এও বুঝতে পারলে না। গোছা গোছা ফুল, গিফট, আমার শরীরী ভাষা সব ব্যর্থ ! ম্যাডামকে মুখে না বললে উনি কিছু বুঝতে উঠতে পারেন না।"
 অহনা বোকা চাহনি ,বোকা হাসি নিয়ে প্রলয়ের বুকে মুখ গুঁজে ছিল।
 প্রলয় নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়ে বলেছিল এই সোজা সরল মেয়েটিকেই তো আমি ভালোবেসেছি। সারা জীবন এমন বোকা হয়েই থেকো।
  এত বড় ভরসা দেওয়ার মানুষ সেই প্রলয়ই এখন পারমিতার প্রেমে পাগল। বুবলাই এর কথাও ভাবে না। অহনা সত্যি কি বোকা ! পারমিতার ঘন ঘন বাড়িতে আসা, প্রলয়ের ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে এনগেজ থাকা, অফিসের কাজ বলে দুজনেরই একসাথে বেপাত্তা থাকা। বেয়ারা সুজয়দা যদি চোখে আঙুল দিয়ে না দেখাতো তাহলে অহনা এত সবের পরেও অজ্ঞই থেকে যেত।

লোকটা বলছে," জানেন জীবনটাও ঠিক এরকমই, বোকাদের এখানে কোনও জায়গা নেই। তারা হেরো হয়ে  পিছন থেকে আরও পিছনে যেতে যেতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
 চার, আর অধ্যবসায় থাকলে ছিপে মাছ গাঁথবেই।"
অহনা দেখল সত্যিই বাবা আর ছেলে দুজনের ছিপেই টপাটপ মাছ উঠছে।
লোকটা বলছে দেখলেন, "একেই বলে কেরামতি আগে চার ছড়িয়ে প্রলুব্ধ করে তারপর বড়শিতে গেঁথে নেওয়া।
 জীবনে চোখ কান খোলা রাখা আর  শৈলী রপ্ত করা জরুরি। না হলে.... চলিহিঃ---"
  
অহনা এবার আর ছিপটা গুটিয়ে রাখবে না। চার সাজিয়ে সে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করবে। বুবলাই এর জন্য ওর নিজের জন্য ওকে বেঁচে থাকার শৈলী রপ্ত করতেই হবে।

যমের দক্ষিণ দুয়ারে শিব আর আমি-- প্রদীপ দে

" যমের দক্ষিণ দুয়ারে শিব আর আমি  "
                      প্রদীপ দে ~

সক্কাল সক্কাল বউয়ের সঙ্গে ঝামেলা হয়ে গেল। আরে রিটেয়ার করে বসে আছি।  সরকারী পেনশন ও পাই না। কিছু সুদের আয়ে কষ্ট করে দিন চালচ্ছি,  কিন্তু হালার বউ কিছুতেই তা মানবে না?
আজ ঘুম থেকে উঠেই হাতে থলে ধরিয়ে দিয়েছে ,
--  ভালো মাছ, না হলে নিদেনপক্ষে  মাংস নিয়ে আসো!

আমি কত বোঝালাম। আর কত বোঝাবো?
বিবি না শোনে কোন ব্যথার কথা!

রাগ করে থলে হাতে বেড়িয়ে পড়েছি বাড়ি থেকে।
--  ধুৎ! নিকুচি করেছে তোর সংসারে …
ভেবেছিলাম আর বাড়িমুখো হবো না।
থলে হাতে আজ ই হোক আমার এই শেষযাত্রা!
যমের দক্ষিণ দুয়ারে চললেম …

ভীষণ কাহিল। কি করা যায়? ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার জন্য ধানজমি পেরিয়ে ফাঁকা মাঠে এক‌টি বটবৃক্ষের নীচে লুঙ্গি পরে বসে পড়লাম। আহাঃ কি আরাম! গ্রীষ্মকালীন  ফুরফুরে হাওয়ায় ভাসছি যেন! এবার চিন্তা করে দেখি, কোন চুলোয় যাবো?
চোখ বুজে এল…

ডুগ… ডুগ… ডুগ…
ডুগডুগি বেজে উঠলো, সঙ্গে নূপুরের ঝনঝনানি আওয়াজে ঝিমুনি উধাও …
চমকে চোখ খুলে দেখি … 
একি…
এ যে স্বয়ং বাবা মহাদেব …
শিব বাবা!
উদোম গাঁট্টাগোট্টা ছাইরঙা গা, মাথায় বিরাট এক জটা, বটগাছের ঝুরি কাঁধ ছাড়িয়ে ঝুলছে, পরনে ছোট্ট বাঘছাল, পায়ে বড় বড় ঘুঙুর বেঁধে আর হাতের ডুগডুগি বাজিয়ে রুক্ষ মাটিতে বেধড়ক এক নাচ জুড়েছেন!

আমিতো থ! আরে ঝামেলার পর একেবারে শিবের দেখা? বুঝলাম আর কেউ না বুঝুক শিব বাবা আমার দুঃখ বুঝেছেন। এবার আমি উদ্বার হয়ে যাবো নিশ্চিত - কারণ সূর্য পুত্র যমই শিবের এজেন্ট এবার আমায় ভালোবেসে শিবলোকে নিয়ে নেবে নিশ্চয়ই  …

--  প্রনাম মহাদেব! আপনার অশেষ কৃপা। আপনি আমার দুঃখে সাড়া দিয়েছেন। এবার আমায় উদ্ধার করুন … আর কোনো কালে আমি বিবাহ করবো না - কথা দিচ্ছি … এই নাক কান মুলে ক্ষমা মানছি …
আমার চোখ বেয়ে জল নেমে এল, -কথা গেল থেমে।

ভাবলাম শিব খুব খুশি হবে। ওমাঃ এ কি দেখছি?
দেখি শিব নাচাগানা থামিয়ে হু হু করে কাঁদছে …

--  ঠাকুর সাব, আপনি কাঁদেন কেন? আমার জন্যি?

--  না রে পাগল বৎস,  না রে না! তোর দুঃখ দেখে কাঁদিনি - তোর দুঃখ দেখে আমার দুঃখের কথা মনে এল যে! দুঃখ ভুলতে নাচি গাই - তোকে দেখে মুখপোড়া আমার আবার সেই কষ্টের কথাই মনে পড়ে গেল …

--  সে কি?  আপনি হলেন গিয়ে এই দুনিয়ার মালিক মহাদেব?  আপনার আবার কিসের দুঃখ?

--  চুপ কর বেয়াদপ! মালিক! মালিক আবার কি রে? ঘরে বউ থাকলে এ কথা বলা যায়? সব বউয়েরাই এক, এটা বুঝিস না?

--  ওমাঃ সে কি কথা গো ঠাকুর। তোমার গিন্নি যে জগৎজননী মা দুর্গা? সে তো বিরাট ব্যাপার, বিরাট ভাগ্য তোমার?

--  হ্যা তাতো বাইরে দিয়ে মনে হয় রে চ্যালা! পরের বউ মানেই খুব ভাল।

--  ছিঃ ছিঃ এসব বলো না।

--  চুপ কর ব্যাটা সব মহিলারাই এক। বিয়ের একবছর পরেই এক্কেবারে রণচন্ডী! মেরে মেরে আমায় একেবারে শেষ করে দিল রে…
তাই নন্দীভৃঙ্গী নিয়ে নেচে নেচে দুঃখু ভুলি রে?

বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আমি একজন পার্টনার পেয়ে দুঃখ ভোলবার চেষ্টা করছি এমন সময় ভোলেবাবা নিজের টাল সামলাতে গিয়ে নিজের কোমরের বাঘছাল খসিয়ে দিল …

ছিঃ ছিঃ এ আমি কি দেখতাছি - তলার 'ইয়েটা' যে একেবারেই শুকিয়ে ছোট্ট হয়ে গেছে - ঠিক আমার টার মতোই। লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল - ছিঃ ছিঃ এই জন্যই যে আমাদের এত দুঃখ, বউদের আর কেন মিছে দোষ দিই,  ছিঃ!

চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। পুনরায় তাকিয়ে দেখি জনকোলাহল, শিব বাবা একহাতে বাঘছাল আর অন্যহাতে মাথার জটা ধরে মাঠ ধরে ছুটছে - আর তার পিছনে ছেলেবুড়ো সব্বাই তারস্বরে চিৎকার করছে, --
" বহুরূপী বহুরূপী  "  !

সময় -- অলভ্য ঘোষ

সময়
অলভ্য ঘোষ

কি দুঃসাহস মানুষের, মানুষ  সময়ের সাথে চলে।সময়ের সাথে চলতে হয় না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়।কোন এক সংবাদ মাধ্যমও তাই বলে।ভগবান ছাড়া আর কাউকেও ভয় পায় না যারা আসলে তারা একটা বুর্জোয়া ভয় পোষে।সময়ের সাথে চলতে হয় না হলে পিছিয়ে পড়তে হয়; এটা একটি যন্ত্র সভ্যতার কথা।আর যন্ত্র যদি মন্ত্র হয় মানুষ হয় যান্ত্রিক সে ক্রমশ ক্রমশ যত যন্ত্র হবে উৎপাদন আর উৎপাদক বৃদ্ধির উৎপাতের হারে সে মানুষ একটি পণ্য সমতুল্য যতোই হয়ে পড়বে পোল্ট্রির মুরগী ততোই তার চর্বি বাড়বে বটে গোস্তের দাম হবে আর বাড়বে ব্লাড প্রেসার সুগার কোলেস্টেরল হাইপার টেনশন, ডিপ্রেশন।মহাবিশ্বের কাছে আমরা একটি ধূলিকণার চেয়েও ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র ছোট বেলায় শিক্ষকেরা একথা বলেন।কিন্তু যত বড় হই মনে হয় মহাবিশ্ব টা একটা ধূলিকণার সমান আমাদের কাছে।আমরা এতটাই বৃহৎ এবং মহৎ।সময় আমাদের পকেটে।কত বড় মূর্খ আমরা।ছোটবেলায় বাঁদর নাচ আমরা সবাই দেখেছি।একটা লোক একটা বাঁদরের গলায় দড়ি বেঁধে হাতে একটি লাঠি নিয়ে।বাঁদর কে বলছে তুই গড়ের মাঠে ঘুরতে যাবি?বাঁদর মাথা নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে।তুই বাদাম ভাজা খাবি?বাঁদর মাথা নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে।তুই সেজে গুজে স্নো পাউডার মেখে হেমা মালিনীকে বিয়ে করতে যাবি?বাঁদর মাথা নেড়ে সম্মতি জানাচ্ছে কেবল তাই নয় আয়নায় মুখ দেখে পাউডার মেখে বাঁদরওয়ালার লাঠিতে ভর করে পাছা বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে বাঁদরীর সাথে বিয়ে করতে চলল বাঁদর।এরপর মালা বদল তারপর বাদর বাঁদরীর নাচ; ভাব ভালবাসা দাঁত খিচুনি সবই আছে।যত খেলা দেখাবে বাঁদর ততোই পাবে একটা করে খোসা ওয়ালা চীনা বাদাম।দর্শকের হাততালি খেলার শেষে বাটি হাতে ঘুরছে বাঁদর।আর বাটির ভিতর পড়ছে খুচরো পয়সা।ছোটবেলায় অতো গুরুত্ব দিয়ে দেখিনি।বড় হয়ে বুঝেছি যে এই বাঁদরেরা ভীষণ ক্ষুধার্ত থাকে।তাই এদের দিয়ে যে কোন খেলা একটি সামান্য  খোসা ওয়ালা চীনা বাদামের বিনিময়ে দেখিয়ে নিতে পারেন বাঁদরওয়ালা।বলুনতো এখানে কে কাকে নাচাচ্ছে?জানি বলবেন এটা আবার প্রশ্ন হল নাকি।বাঁদরওয়ালা বাঁদর নাচাচ্ছে। বাঁদর কখনোই বাঁদরওয়ালাকে নাচাচ্ছে না।সে স্থির তার দড়ি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।বাঁদরের গলায় বাঁধা।বলুনতো এখানে সময় কে?আর আপনিই বা কোনটা?ঠিক ধরেছেন সময় ঘড়ির কাঁটা বা বাঁদরটি নয়।সময় বাঁদরওয়ালা।সময় নাচে না সময় নাচায়।একটা গোটা খোসাওয়ালা চীনেবাদামের জন্য বাঁদর যেমন নাচে আমরাও নাচি পেটের জন্য।তবে মানুষ কেবল পেটের জন্য নাচে না বাঁচে না অন্যান্য প্রাণীকুলের মত।মানুষের খিদে বহু প্রকারের তবে তাদের মোটামুটি দুটি শিরোনামে ধরা যেতে পারে জৈবিক বা বস্তুবাদী ও আধ্যাত্মিক বা ভাববাদী।জৈবিক খিদে তাকে ভোগবাদী করে তোলে যদি সেখানে লাগাম বা আধ্যাত্মিক খিদে না থাকে।আবার জৈবিক খিদে না মিটলে আধ্যাত্মিক খিদে তৈরিই হয়না অর্থাৎ দুটি পরস্পরের নিয়ন্ত্রক একটা ছেড়ে আরেকটা কে অবলম্বন করা সম্ভব নয়।তবে সোনার পালঙ্ক আমাদের ঘুম দেয় না ঘুম দেয় সুখ, সমৃদ্ধি, শান্তি! সে ঘুম মাদুরে শুয়েও যদি মিলতে পারে সোনার পালঙ্কের পিছনে ছুটে আমার সময়, শরীর,মন এবং আত্মা কে ক্ষয় করা কেন-বাপু! দিনান্তে আমারো সাড়ে তিন হাত জমির দরকার তোমারো তাই।ভূতে ভর করে ভবিষ্যতের জন্য তবে কেন এত খাই খাই।কেন তবে এত আয়োজন।সময়কে তুমি নাচাও না।সময় তোমাকে নাচায়।এই কদিন আগে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন হয়ে গিয়েছিলে ভুলে গেলে।রোজ একটা করে ঝড় আসছে আর তুমি ঝড়ো কাকের মত ছুটে বেড়াচ্ছ।এটাই সময় ভায়া।ঘড়ির কাঁটা আর তুমি ছুটে মরছ রোজ বদলাচ্ছ ঠংঠং পেন্ডুলাম থেকে ডিজিটাল।সূচক বদলালে সময়  কি বদলাচ্ছে ভায়া।একই সময়ে একটি শিশু খেলা করছে মায়ের কোলে;যুবক প্রেমিকার আঁচলে আর বৃদ্ধ রয়েছেন চিতার দিকে ঢলে।এগুলো তাদের ব্যক্তিগত অঞ্চল; সময় কে তুমি লোকাল ট্রেন কেনও; গ্যালপিং দূরপাল্লার ট্রেন ভাবলেও ভুলহবে।অনন্তকাল ধরে চলে আসা সময়ের কোন স্টপেজ নেই।তার কোন অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ নেই।যেহেতু আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে তাই সময়কে আমরা আমাদের সীমানার ভেতর ধরতে চাই।সময়ের কাছে আমরা অসহায় বাঁদরের মতো।স্বাধীনতা নেই।বাইবেলে একটি কথা আছে;"তুমি কাল্যর কথা ভাবিও না।কাল্য আপনার কথা আপনি ভাবিবে।"
Life is a feeling;an emotion.আর কিছুই না।সময়ের পিছনে ছুটে জীবনকে অনুভব করার সময়  না পেলে জীবন বেকার।



*অলভ্য ঘোষ
৯৪৫ হরিদেবপুর নেতাজী পল্লী কলকাতা ৭০০০৮২

Friday, 4 February 2022

প্রতারক --সাবিত্রী দাস

প্রতারক
সাবিত্রী দাস 

      অরূপের কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে।এই অস্বস্তি টা খুব বেশি বলতে গেলে আট দশ দিনের হবে।ঘরে তো মাত্র  দুটি প্রাণী সে আর তনু মানে অরূপের স্ত্রী তনিমা। 
   অরূপ কাজ করে করপোরেশনে । সাফাই বিভাগের সিনিয়র ক্যাশিয়ার সে। সাফাই কর্মীদের পেমেন্টের হিসাব রাখা এবং তাদের ব্যাংকের খাতায়  পেমেন্ট পাঠানোই হলো অরূপের কাজ।
  তনুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে চার বছর।বাড়ীর লোকের দেখাশোনাতেই বিয়ে।সাদামাটা মেয়ে তনু।ভারী সরল আর হাসি খুশী। চার বছর বিয়ে হলেও এখনো পর্যন্ত তাদের কোন সন্তানাদি নেই। যদিও বহু ডাক্তার কবিরাজ দেখানো হয়েছে।লাভের লাভ কিছুই হয় নি।ডাক্তারের মত  দুজনের কারো কোন সেরকম দোষ বলে কিছু পাওয়া যায়নি। হাসি খুশী ভাব টি তনুর এখন আর তেমন দেখতে পাওয়া যায় না বিশেষ।এহেন তনুকে নিয়ে অরূপের কোন সমস্যা হওয়ার কথাও নয়।শুধু সবসময় অরূপের মনে হয় তনুর সরলতার সুযোগ নিয়ে কেউ না ওকে ঠকিয়ে দেয়।যে কদিন তনুকে যেন একটু অন্যমনস্ক দেখছে অরূপ।মনে হচ্ছে কিছু যেন একটা লুকোচ্ছে ও।
এখনও সন্তানের জন্য  ঠাকুর দেবতা কবচ তাবিজ করে চলছে তনু।বাধা দেয় না অরূপ,মনে যাতে শান্তি পায় তাই করুক!
তনুর কি একটা ব্রত চলছে।দুজনে দুঘরে আজ সাতদিন হলো।দুজনের ঘর দুটো একেবারে মুখোমুখি ।দরজা বন্ধ করতে গিয়ে অরূপ দেখে তনুর ঘরের জানালা খোলা।ঘরে আলো জ্বলছে।মানে তনু এখনো জেগে!ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে পৌনে বারোটা।তনু তো এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে!কিছু একটা খেলো যেন।কোন ওষুধ হবে আরকি।
দরজা বন্ধ করে অরূপ শুয়ে পড়ে  বিছানায়। 
   আজ তিনদিনের দিন তার ওষুধ খাবার কথা।ভৈরব বাবার মন্দিরের পাশে এক সাধুবাবা এসেছেন দিন  পনেরো আগে।লোকমুখে খবর পেয়ে সেখানে তনুও গেছিলো যদি কোন সুরাহা হয়। খুব ভালো মানুষ সাধুবাবা।তাকে আশ্বাস দিয়েছেন,সন্তান হবেই।শুধু তনু যেন কারোকে কিছু না বলে!পাঁচকান হলে ওষুধে ফল ফলবে না  একথা বারবার করে বলে দিয়েছেন তিনি।অরূপকেও কিছু জানানো পর্যন্ত বারণ। আজ পর্যন্ত অরূপকে কোন কিছু লুকোয় নি তনু। প্রথমে মনটা বড়ো খচখচ করলেও ভাবে ভালো কাজের জন্য যখন তখন তার দোষ কী!  ওষুধ খাবার পর ঘড়ি দেখছে তনু ,বাবা বলেছেন বারোটার দশ মিনিট আগে  ওষুধটা খেতে।আর ঠিক বারোটায় ঘর থেকে একা একাই বেরিয়ে  পৌঁছতে হবে মন্দিরে।হ্যাঁ ওষুধে কাজ হচ্ছে মনে হচ্ছে যে।হঠাৎ শরীরে একটা পরিবর্তন অনুভব করে সে।কেমন একটা অস্থির ভাব!ঘর খুলে বেরিয়ে পড়ে তনু।চারদিক ভালো করে দেখে বাইরের দরজা খুলে পথে নামে।বড়ো অস্থির  সে এ কদিন যাতায়াতের পর আজ সে পাবে  বাবা ভৈরবের কৃপা। 
......
   আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না অরূপের।তনুকে ছেড়ে থাকতে ভালো লাগে না।
ভাবতে ভাবতে চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল।একটা শব্দ হলো মনে হলো না!
ভালো করে কান খাড়া করে শোনে হ্যাঁ ঐতো দরজা খোলার শব্দ না!তাড়াতাড়ি জানালা দিয়ে দেখতে পায় তনু দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ কী! তনু একা! রাত বারোটায় তনু একা কোথায় যাচ্ছে।ভারি আশ্চর্য লাগলো।এতোদিন ধরে তনুকে দেখছে.......
আজ কি হলো কি তনুর! 
দরজা খুলে বেরিয়ে আসে অরূপ।কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তনুকে অনুসরণ করতে থাকে সে।
দূর থেকে দেখে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে যেন চলে যাচ্ছে তনু।তার তনু এভাবে...
বুকের ভেতর একটা মোচড় পড়লো অরূপের।ততক্ষণে তনু ভৈরব মন্দিরে পৌঁছে গেছে।দরজা খোলাই ছিল।সাধু বাবার মুখে মৃদু হাসি,যাক এসেছে তাহলে।আহারে বাচ্ছা চাইছে।তা বাচ্ছা তাকে দেবে বৈকি! নিশ্চয়ই দেবে।তার আগে যা করার করে নিতে হবে।ক্যামেরা রেডি করাই আছে।বোকা মেয়ে ! সাধু বলে নিজের মনেই ।
তাড়াতাড়ি দুহাতে জাপটে ধরে তনুকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।ওষুধের ক্রিয়া ততক্ষণে তনুর শরীর কে অস্থির করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
  হাঁপাচ্ছে অরূপ দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে কি বোকামিটাই না করেছে সে।স্পষ্ট দেখতে পেল তনু মন্দিরের পাশের ঘরটায় ঢুকলে কেউ যেন দরজা বন্ধ করে দিল।পাগলের মতো দৌড়ে এসে দেখে দরজা বন্ধ।ঘরের পিছন দিকে একটা দরজা আছে না!ছোট বেলায় কতবার লুকোচুরি খেলতে চলে আসতো এখানে। সেই দরজাটা খোলাই থাকতো সবসময়ই।
 পৌঁছে গেছে সেই খোলা দরজা দিয়ে ঠিক সময়েই। দেখে বদমাশ সাধু তনুর দিকে  তাক করে  ক্যামেরা অন করে দিয়েছে। তনু মাটিতে পড়ে আছে আচ্ছন্ন হয়ে।কোনো হুঁশ নেই তার!বদমাশ টা তনুর শাড়ি ধরে খুলতে শুরু করেছে কি না, শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে সজোরে আঘাত করেছে অরূপ, সাধুর মাথায়।কয়লা ভাঙা হাতুড়িটা দিয়ে। এক ঘায়েই সাধু অজ্ঞান।তড়িঘড়ি তনুকে উঠিয়ে নেয় অরূপ দৌড় দেয় ঘরের দিকে।তনুকে ঘরে রেখে পুলিশে খবর দিতে হবে।সাধুর জ্ঞান ফিরে আসার আগেই আসতে হবে পুলিশ নিয়ে।

সুদখোর ভূত -- ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

সুদখোর ভূত
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

গল্পটা বিধুদা বলেছিল। এমনিতে অলৌকিক কাহিনী তে আমার বিশ্বাস হয় না। তবে বিধুশেখর মুখুজ্যে বললে অবিশ্বাসটা করি কী করে। তবে সত্যি একটা কথা বলছি। ভূত না থাকলেও ভয়টা আছেই। তাই রাতের বেলা মনে পড়লে গা ছমছম করে।
বিধুদার বাড়ি ছিল মেলকি তে। অজ পাড়া গাঁ। ওখানেই এক সুদখোর লোক বাস করতো। টাকার কুমীর যাকে বলে তাই ছিল লোকটা। থুরি!নামটা বলা হয় নি। ওর নাম ছিল অনন্ত। মক্ষীচুষ লোক মাইরি।

চারিদিকে অনন্ত সুদে টাকা খাটাতো। বিধুদা নিজেও মায়ের অসুখের সময় ধার নিয়েছিল। আসল না দাও ক্ষতি নেই। মাসের শেষে সুদ দিয়ে দাও। অনন্ত খুশি।
কিন্তু ঘটনাটা ওখানেই শেষ নয়। একদিন টাকার তাগাদা করতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়লো অনন্ত। রেললাইনের উপরে ওর দেহটা অনেকেই দেখলো। একটা পা কাটা ।

অনন্তের মৃত্যুর খবরে অনেকেই আনন্দ পেল। যাকগে। আর সুদ গুনতে হবে না। বিধুদারও হয়ত স্বস্তি হয়েছিল। তবে মুখে সবাই বলতে লাগল "আহা! মানুষ টা মরে গেল"।
তেরাত্রি পার হল না। কেষ্টর বৌ পুকুর ঘাটে যাচ্ছিল। হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো। একটা সাদা কাপড় পরা খোঁড়া মানুষ একটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আর নাকি সুরে বলছে "ওঁই কেঁষ্টার বৌঁ। টঁকাঁ দেঁ।"
ওরে বাবা রে বলে কেষ্টর বৌ দাঁত ছরকুটে পরে র ইল।
গ্রামের সব লোক জেনে গেল অনন্ত ভূত হয়ে টাকা চাইছে। উফফ!মরেও টাকা টাকা করছে। আবার কেউ কেউ বললে ও অনন্ত হয় নাকি!চিটিংবাজি করে কেউ অনন্ত সেজে টাকা উপায়ের ফিকির খুঁজছে। কথায় আছে"রূপায়া ইতনা চিজ/খোদা কা উনিশ বিশ"।

মেলকির বিনোদিনীকে চেনে না এমন মানুষ নেই। বেশ চটক আছে সাজগোজের। তার উপরে ঠমক ঠমক চলন।পায়ে নুপূর পরে। অনন্ত ওকে খুব ভালোবাসতো। ভোরের দিকে ঘুমটা ওর আসবো আসবো করছে তখন ই শুনতে পেলো" ওঁবিঁনু। দঁরজাঁটা খোঁল নাঁ।" তবে ওর কাছে টাকা চাইতে যায় নি।বিনোদ তো পাড়া তোলপাড় করে চেঁচাতে লাগল।
মাকে ভালো করতে গিয়ে দেনাটা করেছিল বিধুদা। এখন তো সুদে আসলে আশি হাজার হয়ে গেছে।এখন যদি অনন্ত ওর কাছে আসে টাকা চাইতে। কী হবে তাহলে!এইসব চিন্তা শান্তি দেয় না।

শ্রাবণ মাসের দিন ।ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। জানালার একটা পাল্লা ভাঙা। বারবার খুলে যাচ্ছে। দূরদূর।ভাল্লাগে না।বন্ধ করতে দ্বিতীয় বার উঠে দেখে অনন্ত। উরিব্বাস!
অনন্ত বললে কীঁ রেঁ বিঁধু। টঁকাঁ দে। আমতা আমতা করে বিধু বললে অ্যাই!তুই তো মরে গেছিস। কী হবে টাকা নিয়ে?
অনন্ত রেগে কাঁই। বললে ঘঁড় মঁটকাবো তঁর।তখন বিধু বললে দেখ ভাই। রাগ করিস নি। তোর ভূত হয়ে অনেক খেমতা।যদি একটা কথা রাখিস তো একটা বুদ্ধি দিই।অনন্ত হাসলে।বললে বঁল।শঁনি।

বিধু বললে জানিস তো সামনে ভোট।তুই শুধু কটা ভোট ভূত হয়ে গিয়ে এই চিহ্নে টিপে দিবি।পার্টি জিতলেএত্ততো টাকা।ওহহহ।
বললে বিশ্বাস করবে কিনা জানি না। সে বারে বিধুদার দল জিতেছিল।
এখন এটাই বিশ্বাস জন্মেছে যে টাকার টানে ভূত আসবেই আসবে।

শেষ ট্রেকিং --তমা কর্মকার

শেষ ট্রেকিং
তমা কর্মকার

শিশির এই শিশির বলোনা কবে আসবে বাড়িতে? শিশির কে বলা এই শেষ কথাটাই চোখের কোণে জল ও বুকে উৎকণ্ঠার ঝড় তুলে সেই ঝড়ে তৃণের মতো উড়তে উড়তে ভাবতে লাগলো ধীরা|শিশিরের সাথে দীর্ঘ সাত বছরের প্রেম ধীরার সেই কলেজ লাইফ থেকে,সমীর বাবু মানে শিশিরের বাবা এবার চেয়েছিলেন শিশিরের ট্রেকিংয়ে যাবার আগে ধীরা কে শিশিরের সাথে বিয়ে দিয়ে পাকাপাকি ভাবে ঘরে নিয়ে আসতে, কিন্তু ধীরার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার জন্য সেটা পিছিয়ে গেলো| ঠিক হলো শিশির এবার ট্রেকিং থেকে ফিরে আসার সাথে সাথে ধীরা কে পুত্রবধূ রূপে ঘরে নিয়ে আসবে, শিশির একটা ব্যাঙ্কের ম্যানেজার কিন্তু পাহাড়ে ট্রেকিং করা ওর ছেলে বেলা থেকেই শখ আর এখন তো ট্রেকিংটা  ওর মজ্জায় মিশে গেছে,  শিশির ধীরাকে জানিয়েছে এটাই তার শেষ ট্রেকিং আর সে ট্রেকিংএ যাবেনা এরপর সে ধীরাকে নিয়ে হানিমুনে যাবে, ধীরা প্রতিবারের মতো এবারো এসেছিলো শিশির কে ট্রেনে তুলে দিতে, আজ শিশিরকে তিস্তা তোর্সা ট্রেনে তুলে দিয়ে ও শিয়ালদহ স্টেশনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়েছিলো, যতক্ষণ ট্রেনটা দেখা যায় ততক্ষন,তারপর ট্রেনটা আস্তে আস্তে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো,ধীরা ধীর পায়ে ফিরে এলো নিজের বাড়ী , পরেরদিন সকালে ধীরা একাপ চা নিয়ে বসলো খবরের কাগজ নিয়ে এটা ওর প্রতি দিনের অভ্যেস রোজ  সকালে ও চা খেতে খেতে খবরের কাগজটাতেও চোখ বুলিয়ে নেয় কেনোনা সারাদিন  
নিজের জন্য ধীরা একটু সময় পায়না প্রত্যেক দিন সকালের সমস্ত কাজ মিটিয়ে বাবাকে খাইয়ে দায়িয়ে সে চলে যায় অফিসে তাই আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো এক কাপ চা হাতে  নিয়ে টেবিলে বসেছে পেপারটা খুলেই প্রথম পাতায় চোখ বুলাতে গিয়েই  ধীরার মাথা ঘুরে যায়, একি দেখছে সে তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়, সে  দেখে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় তিস্তা তোর্সা ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে তার খবর বেরিয়েছে অ্যাক্সিডেন্টের খবর পড়তে পড়তে ধীরা অজ্ঞান হয়ে যায় কারণ তিস্তা তোর্সার যে কম্পার্টমেন্টে শিশিরকে তুলে দিয়েছিলো গত রাত্রে সেই কম্পার্টমেন্ট একদম চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে গেছে, সেই কম্পার্টমেন্টের কেউ বেঁচে নেই, শিশিরের জীবনের সাথে সাথে শেষ হয়ে গেলো তার জীবনের
শেষ ট্রেকিং |আর ধীরা,,,,,,,,,,???

বিশাখার সারপ্রাইজ-- বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

বিশাখার সারপ্রাইজ
বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

টোটো চড়ে বসলাম । নিঃশব্দে চলে । সুতরাং দু'জনে একান্তে কথা বললে অসুবিধা নেই । আর টোটোর চালক তো বাংলা বোঝে না । আমরা গৌরীপুর থেকে বড়গাছিয়ার মোড় পর্যন্ত যাব টোটো চড়ে । তারপর বিশাখাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে । জায়গাটার নাম কুসুমপুর । 
উঠেই বিশাখাকে বললাম , " একেই তো এই রুটটায় ট্রাফিক কম । তার ওপর আধাগ্রাম আধাশহুরে পরিবেশ । আজ আবার লকডাউন ।
নেহাৎ দরকার না হলে পথে বেরোবে না কেউ । এরকম পার্সোনাল পরিবেশ পেয়ে মনের মানুষের সঙ্গে ঘোরার অন্তরঙ্গতা কত না নিবিড় উপলদ্ধির সৃষ্টি করে । " 
আমার কথাটা নিজের কানেই বিজ্ঞের মত শোনালো । এই হয়েছে আমার দোষ । কিংবা গলতি । কলেজে বাংলা পড়াই । কথায় সেই আভাস এসেই যায় ।
বিশাখা কিন্তু হেসে বলল , " তোমার শেষ লাইনটায় আমি হলে বলতাম ,  " উপলদ্ধির উদ্রেক করে " । বলে বিশাখা সিট পাল্টে আমার পাশে একেবারে ঘনিষ্ঠভাবে বসে ভ্রূ টান করে চোখ বড় বড় করে চাইল । 
আমি তারই সাথে বিশাখার শরীরের গরম তাপ নিজের গায়ে মাখলাম । কারন বিশাখা আমার গায়ের ওপর এলিয়ে পড়ে মাথাটা কাঁধে রেখেছে ।
টোটো চলেছে কর্তব্য মাফিক । চুক্তি মত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিষ্ঠাবান চালক । রোজগারের সঙ্গে কোন ফিকির খাটে না । সে মগ্ন চালক । আর আমরা বেরিয়েছি , এই একটু এনজয় করে আসি , মতলবে । না ,‌ বিশাখা জানিয়ে রেখেছে , একটা সারপ্রাইজ দেবে । লকডাউনের নিরাসক্ত দুঃসময়ে পরোয়াহীন যাত্রা । 
বিশাখার সঙ্গে আমিও দূরের দিকে তাকিয়ে আছি । কালচে রাস্তা সাপের মত সরসর করে পেছনে ছুটে যাচ্ছে । দু'পাশে বহুচেনা একঘেঁয়ে দৃশ্যাবলী আমার চোখ টানছিল না।  বড়গাছিয়ার মোড় এলে জার্নি শেষ । মাঝে মাঝে বিশাখার নরম স্তনের সঙ্গে ঘষটে যাচ্ছে আমার বাঁ কাঁধের আবৃত শার্ট । গরম মাংসল স্পর্শ । পথচারীদের মধ্যে কেউ কেউ একটু বা তাকাচ্ছিল । কেউ বা উপেক্ষা বা তাচ্ছিল্যভরে পথে যার যার মত চলে যাচ্ছিল । 
ঘন্টা দুই পরে একটা তিনমাথা রাস্তার মোড়ে আমাদের টোটো থামলো । এটাই বড়গাছিয়ার মোড় । বিশাখা ঝটকা মেরে উঠে বলল । এসে গেছি , নামো । একটু হাঁটা রাস্তা , তারপর বনানীর বাগানবাড়ি । ওখানেই যাব আমরা । 
আমি টোটো থেকে নেমে বললাম , আমাদের যাবার কথা ছিল তো কুসুমপুর ।
বিশাখা মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল , ওই তল্লাটটা কুসুমপুর । 
বনানীর কুসুমপুরের বাড়ি আর পাঁচটা বাগানবাড়ির মত । খুব কিছু দর্শনীয় নয় । কিন্তু জায়গাটার নির্জনতা আর ভৌতিক একটা গা ছমছমে ভাব যেন অস্বীকার করা যায় না । 
কিন্তু বনানীর সারপ্রাইজটা যে আমাকে এমন চমকে দেবে ভাবিনি । 
এই বনানীকে আমি আগে থেকেই দেখেছিলাম ।
ওর কাগজে ছাপানো ফটো আর ছোট্ট খবর পড়ে জানতাম বনানী সুইসাইড করেছে । কিন্তু আমার সামনে যে হেসে অভ্যর্থনা করে সাদরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল সে সংবাদের ফটোর বনানী । বনানী বেঁচে আছে । কি আশ্চর্য ! 
আমি আর বনানী একসঙ্গে রিসার্চ করছিলাম । 
বিষয় অবশ্য ভিন্ন । দু'জনেই পি . এইচ . ডি . করেছিলাম । বনানী আমার কাছে জীবন্ত সারপ্রাইজ । থ্যাঙ্ক ইউ বিশাখা ফর ইওর এক্সেলেন্ট সারপ্রাইজ । বিশাখা বলল , তাহলে আমি তোমায় ঠকাইনি , তাই তো ?


*লেখক -- বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী
মোবাইল : ৯৬৪৭১৩৮১২৬

স্মৃতি.....শান্তা মিত্র

স্মৃতি.....শান্তা মিত্র 

কয়েক বছর আগে একটা শ্যুটে গেছিলাম বকখালি তে।  গোছগাছ শুরু আনন্দ করে রওনা  দেবো, কয়দিনের জন্য আউটডোর শ্যুট। বিকেলবেলা নামখানা ধরবো শিয়ালদহ স্টেশনে গেছি। কোন কাউন্টারের দিয়ে টিকিট কাটলে সুবিধা হবে তখন ওতো বুঝি না। হাতে টিকিট এর টাকা নিয়ে যাচ্ছি টিকিট কাটবো প্ল্যাটফর্মের দিকে... হঠাৎ মহিলা একজন জিজ্ঞেস করলো আপনার টিকিট কই..? আমি হাতের টাকা দেখিয়ে বললাম এইতো কাটবো এখুনি, আমি যে প্ল্যাটফর্মের উপরে উঠে গেছি ততক্ষণে আমার খেয়াল ছিলো না সেটা। ব্যস হয়ে গেলো ২৫১/ টাকার ধাক্কা.... দিতেই হবে ভুলের মাসুল , আমি অনেক অনুনয় বিনয় করলাম উনাকে যাতে আমাকে ছেড়ে দেয় বেকার এতগুলো টাকা কেউ দিতে চায় বলুন তো ... চুরি না করে চোর হলাম......কিছুতেই শুনলো না এদিকে দেরি হচ্ছে রাত হয়ে গেলে আরো চাপ গাড়ি পাবো না। কি খারাপ লাগছে নিজেকে তখন ছোটো লাগছিলো খুব। ওরা একটা ঘরে নিয়ে গেলো আমাকে ওখানে কেউ টিকিট করে নি করবে বলেও মনে হয় না।  সবাই বেশ জমিয়ে বসেছে আর কি.. কিন্তু আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না একটা কেমন যেন ভয় কাজ করছে মনে.....তারপর মনের সাথে যুদ্ধ করে দিয়ে দিলাম টাকাটা খুব হাল্কা লাগছিলো  নিজেকে। তারপর আর দেরি না করে ট্রেন ধরে সোজা বকখালি। আমার ট্রেন টা একদম খালি ছিলো তাই বেশ ভয়  আর টেনশন  নিয়েই বসে সময় গুনছিলাম।  কিন্তু  মুখে সাহসিকতার ছাপ নিয়ে একজন যাত্রীর সাথে কথা বলতে বলতে নামখানা নামলাম।  টিমের একজন এসেছিলো আমাকে নিতে।  উনাকে দেখে বুকে বল এলো। তারপর স্পটে পৌঁছলাম। একটু ডিনার করে রাতে শুয়ে পড়লাম সকালে শুট। পরের দিন শুটিং হলো রাত্রিবেলা প্রযোজকের রিলেটিভ এর বাড়িতেই ছিলাম। সে তো হেব্বি আয়োজন তাদের  পুকুর থেকে মাছ ধরে সেই মাছ দিয়ে লাঞ্চ সারলাম, সেই জল নিয়ে বাথরুমে যাওয়া স্নান করা, জমির সবজি দিয়ে রান্না সবেতেই একটা নস্টালজিক ব্যাপার ছিল। সেই ফিলিংস বলে বোঝানো যাবে না। গ্রামের মানুষগুলো আমাদেরকে যেন ভগবান মনে করছে তেমনই ছিলো  তাদের আদর আপ্যায়ন । ওরা  খুব সহজ সরল মানুষ তাই তাদের কাছে  পর কে আপন করার ক্ষমতা ছিলো প্রবল।  মনে হলো না কোন কাজে গেছি আমি বেড়াতে গেছি যেন বহু বছর পর কোন আপন জনের বাড়ি।  ওখান থেকে ফিরে আসতে মন চাইছিলো না একদম। কয়েকদিন ধরে মনে খুব খারাপ ছিলো। সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনি  শুরু টা এমন খারাপ পরে এমন  মধুর  অভিজ্ঞতা ভোলা যায় না। এতসব খারাপ এর মধ্যে একটা ভালো স্মৃতি আজীবন মনের কোণে বদ্ধ থাকবে।

পেটে খেলে পিঠে সয়-- "মধুসূদন সেনগুপ্ত


"পেটে খেলে পিঠে সয় "
মধুসূদন সেনগুপ্ত

যখনকার কথা লিখছি সেসময় পল্লীগুলোতে মানুষের মধ্যে ছিল সচেতনতা পরস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময়  ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।আর সবচেয়ে বড় ছিল একান্নবর্তী পরিবারের মহামিলন মঞ্চ। সেই রকম একটি পরিবার ছিল চৌধুরী পরিবার। তিন ভাইয়ের একই উঠোনে খেলা করত তিন ভাইয়ের এগারোজন ভাই-বোন । 
                      যৌথ পরিবারে বড় গিন্নিমা তদারকি করতেন । তাঁর মান্যতা দেওয়া হত খুব।এমনই প্রত্যন্ত গোপালনগর গ্রামের সাধারণ মধ্যবিত্ত চৌধুরী পরিবারের রাধু,রাজু আর বিমল থাকতেন একই উঠোনে । বাড়ির পাশেই প্রশস্ত খামার সেখানে কুঁড়ে ঘরে থাকতেন বিধবা পিসি। তিনিও পিঠে খেতে সাত ভোরে উঠে আসতেন।  তিন পরিবারের পিঠের হাঁড়ি বসত একটাই । রান্না হত উঠোনে কাঠের জ্বালে অথবা কাঁচা কয়লায় , সামনেই দামোদর নদ।নদ পেরলেই পাঁচ,ছটা কলিয়ারি ,চাঁদা, নিগা,কালিপাহাড়ি,চেলোদ ডামরা,ঘুঁষিক কলিয়ারি।তাই কয়লার অভাব ছিল না ।আর পলাশ গাছে চারিদিক ভরে ।বিশটা গাছ কাটলেও পঞ্চাশটা গাছ লাগানো হত।সবাই গাছের যত্ন করতেন ।আর ঝোঁপঝাড়ে ঘেরা । নদ পেরোলেই মানার জঙ্গল,বাঘ চিতা হরিণ দেখতে পাবেন।এমন সুন্দর পরিবেশে কার না মন চায় ঘুরে আসতে। সবাইকে বলব একবার ঘুরে আসতে।
             বড় ছিলেন রাধারমন চৌধুরী।দশ সের চালের গুঁড়ি হত ঢেঁকশালে ।এখন বললেও কেও বিশ্বাস করবেন না জানি । খেয়ে দেয়ে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলত চাল গুঁড়ো করার পর্ব । সেও এক মস্ত পালা। দেখলে বলবেন হরি নামের পালা ।কথায় বলে ," মিলে মিশে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ"! 
         চাল গুঁড়ো যে প্যাকেট বন্দী হতে পারে তখনকার সাদাসিধে মানুষ জানত না । শুনে একদিন দেবু জ্যেঠু তো তামাক টানতে টানতে বিষম খেয়ে পড়লেন বিছানা থেকে।এই দেবু জ্যেঠু সে বয়সে বিশ গণ্ডা পিঠে খেতেন মানে গুনে গুনে আশিটা । হাসছেন , বিশ্বাস হচ্ছে না তো , তা হবে কি করে আপনারা তো দেখেননি। তাঁর আবার অন্নপ্রাশন হয়েছিল ।একশত পাঁচ বছর বেঁচেছিলেন। তরকারিতে নুন বেশি হলে বলতেন পুষ্প আজ কি বাড়িতে নুন ছিল না।পুষ্প বলত, "কেন দাদু "? দাদু বলতেন তরকারিতে নুন হয়নি । পুষ্প আরো নুন দিয়ে ফুটিয়ে নিত ফলে কারো আর মুখে উঠতো না।এরকম দুচারটে মানুষ যে তখনকার দিনে ছিল না বলা খুব মুশকিল ।যাই হোক পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন উঠোন পরিস্কার করে গোবরজল ছিটা দিয়ে সুদ্ধ করে সেখানে চাল গুঁড়ো দিয়ে আলপনা কেটে তার উপর সরষে ফুল ছড়িয়ে দেওয়া হত।এটা হল বাড়ির বড় গিন্নির হুকুম।এটাই ছিল পল্লীগুলোতে মানুষের একমাত্র নিয়ম।আলপনার উপর আঁকা হত লক্ষ্মীমায়ের পা,প্যাঁচা আর রাখা হত কুলা,সপ্তডিঙা, নতুন ধানের ছড়া। বাড়ির বৌমারা ছড়া কাটতেন 
" আউনি বাউনি চাউনি, 
সকাল থেকে কিছু আমরা খাইনি,
তিন দিন কোথাও না যেও
ঘরে ঘরে বসে পিঠে ভাত খেও।" আউনি মানে মালক্ষ্মীর আগমন, বাউনি লক্ষ্মীর বন্ধন আর চাউনি মানে মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা। তিন জা কনকনে শীতের রাতে গরম জলে স্নান সেরে খামারের উঠোনে খামারের ধান গোলার পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন তারপর শুদ্ধ পরিস্কার কাপড় পরে পিঠা করতে বসতেন। তিন জা বসে পড়তেন উনুনের পাশাপাশি। দু'জন পিঠে গড়ছে একজন তা স্টিমে ভাপিয়ে নামাচ্ছে।
                      আমরা কথায় কথায় বলি "পেটে খেলে পিঠে সয়,পিঠে খেলে পেটে সয় না।" পিঠে সুস্বাদু ও লোভনীয় আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই ভালোবাসেন।
                সেবার দু'জায়ের জ্বর । শীতটাও জাঁকিয়ে বসেছে । বাইরে শীতের আমেজ আর ঘরের ভেতর নারকেলনাড়ু,তিলনাড়ু,ঝালঝাল সবজি আর টাটকা খেজুর গুড়ের সুঘ্রাণ।মণিবদ্যি ( বড় জা ) বসেছেন পিঠে করতে পাশে বসেছে ছোট্ট মেয়ে মৈনি,আজ হবে ভাপা পিঠা, নানান ধরণের পুর ভরে।মৈনির মা মৈনিকে পিঁড়ি পেতে বসতে দিয়ে একঝাঁক ভাপা পিঠা নামিয়ে তারই কিছু থালায় সাজিয়ে গেলেন তুলুসীতলায় ঘরের দেবদেবীদের পূজা দিতে কারণ আমাদের পল্লীগুলোতে মানুষের একমাত্র সম্বল চাষ আর মালক্ষ্মীর আরাধনা।তাই প্রথম পিঠে ঠাকুরের নামে। এদিকে ফাঁকা ঘর পেয়ে মৈনি এক হাতা সদ্য তৈরি ভাপা পিঠা আঁচলে নিয়ে উঠতে গেছে আর বাবাগো মাগো বলে সেখানেই চিৎপটাং ।মা ছুটে এসে বলেন, "কি হল মা, অত ছট্ফট্ করছিস কেন ? আয় বোস পিঠে দি খা !" ও-মা  মেঝেতে অত পিঠে ছড়ানো কেন? তুই গরম পিঠে নিতে গেছিলি বুঝি ? আওয়াজ শুনে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে দিদি ছুটে এসেছে।জামাটা তুলে দেখে- পেটের কাছটা পুড়ে গেছে ফোসকাও পড়েছে তাড়াতাড়ি বার্ণল এনে লাগিয়ে বলল," বোনের লোভ মন্দ না "!

শোক-- কৌস্তভ দে সরকারের গল্প--



শোক
কৌস্তুভ দে সরকার

সকালেই ফেসবুকে খবরটা দেখে ফেলেছিল অঞ্জনা
বাংলা সাহিত্যে আরো এক নক্ষত্রপতন
Rip দিয়ে দু এক জায়গায় কমেন্ট করতেই মনে পড়ে গেল
আজ তো কাজের মাসি আসবে না, ছুটি নিয়েছে
তড়িঘড়ি রাতের বাসন ধুয়ে ব্ল্যাক কফি বসিয়ে দেয় অরূপের জন্য, তারপর নিজের জন্য দুধ চা, ছেলেকে বাটার টোস্ট করে দিয়ে 
ব্রেকফাস্টে বসতেই অতসীর ফোন
- কি রে খবর টা শুনলি?
- আর বলিস না, এই মৃত্যু মিছিল কবে যে থামবে, আর নিতে পারছি না রে।
- আচ্ছা শোন, আজ সন্ধ্যায় তমালতরু ভবনে আসিস কিন্তু, স্মরনবাসরে, একটা কবিতাও নিয়ে আসিস, পাঠ করতে হতে পারে
- ও, আচ্ছা, দেখি! ওকে, রাখছি, বাই। অনেক কাজ আছে রে। কাজের মাসি আজকে আসে নাই।
আজ আবার অরূপের ইচ্ছে, দুপুরবেলায় একটু শপিং সেরে নেবে। পুজো আসছে। আগাম বাজার কিছু করে রাখলে ঐমাসে অত টান পড়বে না। ছুটির দিনে অরূপ একটু ভালোমন্দ খেতে ভালোবাসে।
তবে, আজ জন্মাষ্টমী, নিরামিষ খাওয়াই ভালো। তাই মটর পনির আর গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি কাঁচামুগ ডাল দিয়ে বেশ জমিয়ে ঝটপট রেঁধে নেয় ।
তারপর স্নান সেরে অরূপের দেওয়া এবারের জন্মদিনের দামি শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে বলে,
- দ্যাখোতো কেমন লাগছে, তোমার পাশে মানাচ্ছে কিনা।
অরূপও সেজেগুজে রেডি। দুজনে বেরিয়ে যাবার আগে রূপমকে কপালে চুমু দিয়ে বলে যায়, 
- বাবান দরজাটা লাগিয়ে দাও, আর, দুষ্টুমি কোরো না। ঘুমিয়ে নিও, তাহলে সন্ধ্যায় আমরা এক অনুষ্ঠানে তোমাকে নিয়ে যাব।
সিটিবাজারে আজ বেশ ভিড়। অনেকেই এসেছে ছুটির মেজাজে। মলেই দেবীকার সাথে দেখা।
 - কিরে, তোরাও!?
- হ্যাঁ রে, ছুটি পেয়ে তমাল বলল, কিছুটা মার্কেটিং সেরে নেবে, আর একটু কেএফসিতে...
- আমরাও সেই ভেবেই রে। আচ্ছা শোন, পরে কথা হচ্ছে। এগোলাম।
এরই মধ্যে কয়েকজন ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াটসআপে বুদ্ধবাবুর স্মরণে শ্রদ্ধায় কতকিছু লিখে পাঠিয়েছে। ইসসস, তুন এখনো বুদ্ধবাবুর লেখা একটা লাইন দিয়েও স্ট্যাটাস পারেনি দিতে। সব এই অরূপের জন্য, এমন দিনে বাজারে আসতে চাইল। আর বুদ্ধদেববাবুকেও কি আজই চলে যেতে হত? সব একদিনে পড়ে গেলে কি করে সব সম্ভব? উনার সাথে তোলা কোনো ছবি এই মোবাইলে নেই, তারজন্য ল্যাপটপে বসতে হত। সে সুযোগ পেল কই। কাজের মাসীকেও আজকেই ভ্যাকসিন নিতে যেতে হল। ধুর ছাই, এভাবেই সাহিত্য সমাজে ওর দামগুলো কমে যাচ্ছে যেন। আর বুদ্ধবাবুও এত বই লিখেছেন, তার একটিও সেভাবে পড়াই হয়নি, যে কোনো একটা লাইন মনে করে স্ট্যাটাসে লিখবে। শপিংএর ফাঁকেই তুন একবার দেখে নেয় মাসুদের প্রোফাইল। মাসুদের খুব পড়াশুনা। আর ওর স্ট্যাটাস চুরি করে লিখলেও ধরা পড়ার জো নেই, একটু পাল্টে দিলেই কেউ বুঝবে না। আর খুব বেশি সন্দেহবশত: কেউ কিছু বললে নীচে টুক করে লিখে দেবে, সংগৃহীত, অমুকের ওয়াল থেকে। হয়ে গেল। একফাঁকে বুদ্ধদেব গুহকে সম্মান শ্রদ্ধা জানানো। মলের বাইরে বেশ ভালো পাপড়ি চাট, ফুচকা, মমো বানায়। দুজনে জম্পেশ করে খেয়ে এক হাতে আইসক্রিম, আরেকহাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে ওরা উঠে পরে মেট্রোয়। কবি নজরুলে নেমে একটু যাবে মনিকাঞ্চনে। ওখানে অরূপের ইচ্ছে তুনকে একটা সুন্দর মানতাশা উপহার দিতে চায়। সবকিছু সেরে ফিরতে ফিরতে একটু সন্ধ্যেই হয়ে যায়। আবার অতসীর ফোন,
- কিরে, বললি যে আসবি! আসবি না?
- এই তো বেরোচ্ছি, জাস্ট, দাঁড়া, তুই তোর পাশের চেয়ারটা রাখিস আমার জন্য। দুটো রাখিস। বাবান যদি যায়।
- ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আয়। অনুষ্ঠান শুরু হল বলে। সকলেই চলে এসেছে প্রায়।
বাবান বাপির সাথে ক্যারাম খেলতে চায়। ও যাবে না। শেষে একাই লিপস্টিকের শেষ টানটা রুমালের কোণে মুছে নিয়ে তুন উঠে পড়ে রিক্সায়। চেতলা মোড় পেরিয়েই তমালতরু ভবন। বাইরে অনেকেই দাঁড়িয়ে। সাদা পাঞ্জাবি পাজামায় ওই তো রুদ্ধস্বত্ত্ব, দ্রাবিড়, কুঞ্জদার পাশে জিন্স টপে অতসীও। সব চা খাচ্ছে আর বেশ মশগুল আড্ডায়। তুনকে দেখে সকলেই বেশ উৎফুল্ল হয়ে যায়। 
- আরে আরে, এসো এসো। এত দেরি করলে কেন? আমরা সেই কখন থেকে আড্ডায়। 
- এই চলো চলো, ভেতরে যাই সবাই।
ততক্ষণে সুবীর চাটুজ্যের বক্তৃতা শুরু হয়ে গেছে। বুদ্ধবাবুর স্মরণে ও শ্রদ্ধায় এক মিনিট নীরবতার পর হল বেশ গমগম। ঘোষক দু একবার বলেও দিলেন, আপনারা প্লিজ একটু শান্ত হয়ে বসুন, একটু সাইলেন্স, যাতে সবার কবিতাপাঠ ঠিকমতো শোনা যায়। সকলেই বুদ্ধবাবুর সাথে নিজের যোগাযোগ কতটা ছিল, দেখা হয়েছিল কোথায় কোথায়, কোন বই তাকে উপহার দিতে পেরেছিল, লেখা নিয়েছিল পূজো সংখ্যায়, সেইসব বলেকয়ে কবিতা আউড়িয়ে হাততালি কুড়িয়ে নিলেন। পিন ড্রপ সাইলেন্স ছিল তুনের বেলায়। কারণ, সকলেরই চোখে জল এসে গেল তুনের কবিতা পাঠ শুনে, লাইটের থেকে এক ছোট্ট পোকা উড়ে এসে পড়ে জল এনে দিয়েছিল তুনের চোখেও । হাতে মোবাইল ঢাকা রুমালে তা মুছে ফেলতেই সকলেরই গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি সে পেয়ে যায়। বুদ্ধবাবুকে নিয়ে অনেক স্তুতিবাক্য ছিল ওর কবিতায়।
রাত প্রায় দশটা নাগাদ অনুষ্ঠান শেষে ও বাড়ি ফিরলো রুদ্ধস্বত্ত্বর সুইপ্ট ডিজায়ারে। যে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে বরাবর রুদ্ধস্বত্ত্বই ওকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
ডিনারে বসে অরূপ জানতে চায়, 
- কোন কবিতাটা পড়লে আজ স্মরণসভায়?
- কেন, তোমার মনে নেই? ওই যেটা লিখেছিলাম, পাঠ করেছিলাম, সবার ভালো লেগেছিল খুউব, সুনীল দা যখন মারা যায়।
- সেটা তো সুনীলবাবুর জন্য লিখেছিলে!
- আরে সেটাতেই তো নাম বদলে চালিয়ে দিলাম। বুদ্ধদেব বললাম সুনীলের জায়গায়। কে অত বুঝতে পেরেছে বা মনে রেখেছে বলো? আর তাছাড়া কয়জন যে আর কার লেখা মন দিয়ে শোনে স্মরণ সভায়! সব তো ব্যস্ত আলাপ পরিচয়ে আর আড্ডায়। 
লাইট অফ করে এরপর নিবিড়ভাবে অলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ওরা শুয়ে পড়ে, এবার ঘুমের অপেক্ষা।

টার্গেট
কৌস্তুভ দে সরকার

দ্যাখোতো, কে যেন মনে হল চলে গেল..."
আজকাল নমিতার এরকমই মনে হচ্ছে কেন যেন। সন্ধ্যায় দোতলার ঘরে বিছানায় বসে টিভি দেখে ওরা, বাবান পড়তে যায় তখন। অরূপ আর ও সেসময় চা খেয়ে, টিভি দেখে, একসাথে কিছুটা সময় কাটায়। সামনের দরজাটা খোলাই থাকে।  সামনের দরজায় সাদা পর্দা ঝুলতে থাকে। আর দরজার সামনেই সিঁড়ি। নমিতার মনে হয়, কে যেন এক ঝটকায় দরজার সামনে দিয়ে চলে গেল। উঠে যে গিয়ে দেখবে, তাতেও ভয় ওর । অরূপকেই বলে, "যাওনা, গিয়ে দেখে আসোনা একটু।" অরূপ বলে, "আরে ইঁদুর টিদুর হবে বোধহয়। তাছাড়া পাশের বাড়ির বেড়ালটাও আসে, ওটাই হবে হয়তো!" নমিতা জিদ ধরে বসে থাকে।  অগত্যা, অরূপ যায়। গিয়ে দেখে ঘুরে এসে বলে, "কই কিছু নাই তো। কেউ না। ওটা তোমার ভ্রম।" নমিতা কিছুটা আশ্বস্ত হয়। আবার মনে মনে কিছুটা ভয়ও পায়। বুঝতে পারেনা, এটা ওর নার্ভের দুর্বলতা নাকি অন্য কিছু। এত বড় বাড়ি ওদের, বড় বড় জানলা, কতরকম হাওয়া-বাতাস আসে, আসতেই পারে। ভেতরে অনেক গাছ, টবে, বারান্দায়। সেগুলোর ছায়াও প্রতিফলিত হতে পারে। তা সত্বেও কেন যেন ওর মনে হয়, ঘরে কেউ, কিছু একটা ঘোরাঘুরি করে। নমিতার কাছে পাড়ার কিছু মেয়ে সেলাই শিখতে আসে। ওরাও ওকে বলেছিল একদিন, "ম্যাম, আপনার বাড়িতে কি আর কেউ থাকে?" নমিতা বলে, "কেন বলতো?" ওরা বলে, "কেন যেন মাঝেমধ্যে মনে হয়, কে যেন চলে গেল দরজার সামনে দিয়ে।" ওরাও ভয় পায়। তবে কোনোদিন কোনোরকম ক্ষতি না হওয়ায় নমিতা মনকে কখনো আবার এই বলেও সান্ত্বনা দেয়, নিশ্চই কোনো ভাল আত্মা। হতে পারে তার শ্বশুরমশায়। এখানে উনার ছেলে, বৌমা আর নাতিকে পাহারা দিতে আসে। গোটা বাড়িটাই দেখে রাখে ওদের। হয়তো এটাই ঠিক। কেননা, সেদিন সামনের বাড়ির দাদা গল্পে গল্পে জানতে চেয়েছিলেন, "আচ্ছা, শ্রাবণী পূর্ণিমার সন্ধ্যায় সারা বাড়িতে কি আপনারা প্রদীপের আলো দেখান?" "কেন বলেন তো?" নমিতা অবাকই হয়। আরে সেদিন সন্ধ্যায় তো ওরা তিনজনেই মলে গিয়েছিল, একটু এটা-সেটা কেনার জন্যে, আর একটু ঘুরে বেড়াতে - পূর্ণিমায়। সন্ধ্যায় তো  সেদিন ওরা ঘরে কেউই ছিল না। তাহলে বাতি দেখাচ্ছিল কে? সামনের বাড়ির দাদা বললেন, "আপনাদের জানলার কাঁচ দিয়ে আর সিঁড়িঘরের কাঁচ দিয়ে দেখলাম, মনে হল, বাতি নিয়ে কে যেন সারা বাড়িতে আলো দেখাচ্ছে!" নমিতা ঠিক বুঝতে পারে না, ব্যাপারটা কি। 
বাড়ির ছাদে প্রচুর টব, নানারকম ফুল ও ফলের গাছ নমিতাদের। বাড়ির পোষ্যকে রোজ রাতে ডিনারের পর ছাদে ঘোরাতে নিয়ে যেতে হয়। এটাই রেওয়াজ। নমিতারও ভালো লাগে এটুকু সময়। তাছাড়া কথাতেই আছে, আফটার ডিনার ওয়াক এ মাইল। তবে, এরই মধ্যে সামনের বাড়ির কর্তা প্রয়াত হয়েছেন। পাড়ায় একটা শোকের আবহ চলছে। দুদিন হল, পোষ্যকে নিয়ে ছাদে উঠতেও ভয় পায় সে। শরীর ভারী হয়ে আসে নমিতার। কেন যেন মনে হয়, পেছনে কেউ ঘুরছে, ও ছাড়াও কেউ আছে ছাদে। নমিতার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। যত তাড়াতাড়ি পারে পোষ্যকে নিয়ে দৌড়ে নেমে আসে ছাদ থেকে। রাত্রে ঘুমোতে যাবার আগে বাথরুমে গেলেও এখন অরূপকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে। কিন্তু এ যে আরেক নতুন আপদ মনে হচ্ছে ওর। শেষ অব্দি অরূপকে বলে, "চলো না একটা কীর্তন দিই বাড়িতে। লোকনাথ বাবার।" অরূপ রাজি হয়ে যায়। জন্মাষ্টমীর দিন লোকনাথ মিশনের কীর্তন দল এসে পুজো-পাঠ করে , খোল-কর্তাল বাজিয়ে কীর্তন করে সারা বাড়ি মাত করে তোলে। পাড়ার সবার নেমন্তন্ন ছিল। প্রাসাদে ছিল ফ্রায়েড রাইস, মটর-পনির, ছোলার ডাল, আলুভাজা, চাটনি, রসগোল্লা। সবাই তৃপ্ত হয়ে খেয়ে বাড়ি যায়। সেই রাতের পর থেকে নমিতা আর কোনোদিনও ভয় পায়নি বাড়িতে, একা থাকলেও।

বাঁশি -- জয়িতা ভট্টাচার্য



বাঁশি
জয়িতা ভট্টাচার্য 

মধু পা দেখে সারাদিন। বিভিন্ন রকমের পা।খড়ি ওঠা পা,চকচকে বুটের তলার সোল ছেঁড়া পা,চটি পরা রঙিন নোখের পা,লোমহীন নিটোল গমরঙা পা।একেকটা ট্রেন থামলেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।ট্রেন চলে যাবার পরে পা রাও কমে আসে।
সেই ভোর পাঁচটায় তার মা কোলপাঁজা করে এখানে রেখে শহরে চলে যায় সস্তার সিন্থেটিকের শাড়ি আর মোটা কাজল  আর লাল টিপ পরে।
ক্রমে দুপুর ,ক্রমে রাত পা কমে।ফাঁকা প্লাটফর্মে তখন তার ভাঙা বাঁশিতে সুর তোলে।তেমন কোনো গান নয় কখনো শুধু সুরের ওঠা নামা।একসময় স্থান কাল পাত্র হারিয়ে ফেলে।বাঁশির সুর ধুয়ে দেয় সারা প্লাটফর্ম।চা-ওয়ালা হারাধন,আজিজুল  আর অন্য দোকানিরা কাজ বন্ধ করে মগ্ন হয়ে যায় সে সুরে।শেষ ট্রেন এলে মা ফেরে  পরিপাটি নয় কেমন ছেঁড়া খোঁড়া হয়ে।
মধু নতুন পা খোঁজে প্রতিদিন।আসলে ওই পা অবধি তার দেখার দৌড়। দৌড় কাকে বলে তাও সে জানে না।একেকবার তাকায় তার সরু হয়ে যাওয়া লিকলিকে পা দুটোর দিকে।মুখ ফিরিয়ে নেয় ঘেন্নায়।কোনো বল নেই ওতে।কোমর ঘষটে ঘষটে প্লাটফরমের ধারে গিয়ে পেচ্ছাব করে আসে।হারাধন দা বলে কোন দিন  চলে যাবি ট্রেনের নিচে।তা হারাধন দা সকালে চা এক ভাঁড় বিস্কুট দেয় তাকে।ট্রেন এলে ত্যাবড়ানো বাটিতে পয়সা পড়ে। দুপুরেও এ-ও-সে রুটির টুকরো,ঘাঁটা ঘুগনির তলানি আর মুড়ি দেয় ওতেই পেট ভরে।
এক রাতে মা আর এলো না শেষ ট্রেনে।পরদিনও নয়।আর কোনোদিনই  নয়।কেউ বললো ট্রেনে চাপা পড়েছে কেউ বলে ভেগে গেছে কারো সঙ্গে। সেই তেলচিটে বিছানায় আর ফিরতে পারে না সে স্টেশনের পাড়ের ঝুপড়িটায়।লক্ষ মাইল দূরে তার কাছে  ।ওই চটের ওপরেই রাত দিন।মুটেরা গায়ে কম্বল ঢেকে দেয় শীতে।
সেদিন সুধীন কাকা নতুন খবর দিল "তোর বাস উঠল রে মধু এখান থেকে"
কেন।"সচ্ছ ভারত অভিযান"হবে টেশন ঝকঝক করবে ভিখিরি নাগারি সব বাদ।কয়েকজন জড়ো হয়।ওরাই বলে "তোকে তুলে নিয়ে যাবে ওই পাগলদের ডেরায় নাতো ভবঘুরেদের সেখানে"কেউ বলল ন্যাংটো করে রেখে দেবে।হারাধন ভাবে মধুর কথা।ঘরে অভাব।পঙ্গু টাকে নিয়ে যাবার যো নেই তাড়িয়ে দেবে বউটা।মধু সেদিন সারাদিন বাঁশি বাজায়। সে অদ্ভূত করুণ সুরে আজিমচাচার চোখে জল আসে।পুলিশ আসে অনেক সঙ্গে অফিসার।সরেজমিনে দেখে যায় স্টেশন।সারাদিন মধু খায় না।শেষ ট্রেন ঢুকছে।চোখ ঝলসানো আলোয় সব ঢেকে যায় আর তারপর মধু নেই হয়ে যায়।দলা মোচড়া শরীরটা হারাধনই চিহ্নিত করে পুলিশের কাছে।  
হারাধন সকাল পাঁচটায় স্টোভে পাম্প দেয়।ওই সময় দুটো সিটের মাঝে সরু জায়গাটায় পেতে দেয় ময়লা ছেঁড়া শতরঞ্জিখানা।ফাঁকা পড়ে থাকে।আর পড়ে থাকে ভাঙা বাঁশিটা। কেউ ছোঁয়নি। 
অনেক রাতে এখনো কোথা থেকে হাওয়ায় ভেসে আসে বাঁশির করুণ সুর।হয়তো মনের ভুল।ওরা যারা প্লাটফর্মে থাকে ওরা ভাবে।হারাধন দোকান বন্ধ করার সময় মাঝে মাঝে অকারণে চোখ মুছে নেয়।

                    🎶
*[30/01, 21:52] জয়িতা  ভট্টাচার্য: জয়িতা ভট্টাচার্য 
পেশা_ শিক্ষকতা
প্রকাশিত বই_ চারটি কবিতার বই ও একটি  উপন্যাসের বই ও নানা সংকলনে স্থান পেয়েছে লেখা।
লেখার মাধ্যম_বাংলা ও ইংরেজি 
শিক্ষা_এম.কম,এম.এ(ইংরেজি),বি এড প্রভৃতি।
গল্প,প্রবন্ধ,কবিতা ও অনুবাদ করেন বিভিন্ন  পত্র-পত্রিকায়।
নিবাস-কলকাতা,
পশ্চিমবঙ্গ

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...