বিশাখার সারপ্রাইজ
বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী
টোটো চড়ে বসলাম । নিঃশব্দে চলে । সুতরাং দু'জনে একান্তে কথা বললে অসুবিধা নেই । আর টোটোর চালক তো বাংলা বোঝে না । আমরা গৌরীপুর থেকে বড়গাছিয়ার মোড় পর্যন্ত যাব টোটো চড়ে । তারপর বিশাখাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে । জায়গাটার নাম কুসুমপুর ।
উঠেই বিশাখাকে বললাম , " একেই তো এই রুটটায় ট্রাফিক কম । তার ওপর আধাগ্রাম আধাশহুরে পরিবেশ । আজ আবার লকডাউন ।
নেহাৎ দরকার না হলে পথে বেরোবে না কেউ । এরকম পার্সোনাল পরিবেশ পেয়ে মনের মানুষের সঙ্গে ঘোরার অন্তরঙ্গতা কত না নিবিড় উপলদ্ধির সৃষ্টি করে । "
আমার কথাটা নিজের কানেই বিজ্ঞের মত শোনালো । এই হয়েছে আমার দোষ । কিংবা গলতি । কলেজে বাংলা পড়াই । কথায় সেই আভাস এসেই যায় ।
বিশাখা কিন্তু হেসে বলল , " তোমার শেষ লাইনটায় আমি হলে বলতাম , " উপলদ্ধির উদ্রেক করে " । বলে বিশাখা সিট পাল্টে আমার পাশে একেবারে ঘনিষ্ঠভাবে বসে ভ্রূ টান করে চোখ বড় বড় করে চাইল ।
আমি তারই সাথে বিশাখার শরীরের গরম তাপ নিজের গায়ে মাখলাম । কারন বিশাখা আমার গায়ের ওপর এলিয়ে পড়ে মাথাটা কাঁধে রেখেছে ।
টোটো চলেছে কর্তব্য মাফিক । চুক্তি মত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিষ্ঠাবান চালক । রোজগারের সঙ্গে কোন ফিকির খাটে না । সে মগ্ন চালক । আর আমরা বেরিয়েছি , এই একটু এনজয় করে আসি , মতলবে । না , বিশাখা জানিয়ে রেখেছে , একটা সারপ্রাইজ দেবে । লকডাউনের নিরাসক্ত দুঃসময়ে পরোয়াহীন যাত্রা ।
বিশাখার সঙ্গে আমিও দূরের দিকে তাকিয়ে আছি । কালচে রাস্তা সাপের মত সরসর করে পেছনে ছুটে যাচ্ছে । দু'পাশে বহুচেনা একঘেঁয়ে দৃশ্যাবলী আমার চোখ টানছিল না। বড়গাছিয়ার মোড় এলে জার্নি শেষ । মাঝে মাঝে বিশাখার নরম স্তনের সঙ্গে ঘষটে যাচ্ছে আমার বাঁ কাঁধের আবৃত শার্ট । গরম মাংসল স্পর্শ । পথচারীদের মধ্যে কেউ কেউ একটু বা তাকাচ্ছিল । কেউ বা উপেক্ষা বা তাচ্ছিল্যভরে পথে যার যার মত চলে যাচ্ছিল ।
ঘন্টা দুই পরে একটা তিনমাথা রাস্তার মোড়ে আমাদের টোটো থামলো । এটাই বড়গাছিয়ার মোড় । বিশাখা ঝটকা মেরে উঠে বলল । এসে গেছি , নামো । একটু হাঁটা রাস্তা , তারপর বনানীর বাগানবাড়ি । ওখানেই যাব আমরা ।
আমি টোটো থেকে নেমে বললাম , আমাদের যাবার কথা ছিল তো কুসুমপুর ।
বিশাখা মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল , ওই তল্লাটটা কুসুমপুর ।
বনানীর কুসুমপুরের বাড়ি আর পাঁচটা বাগানবাড়ির মত । খুব কিছু দর্শনীয় নয় । কিন্তু জায়গাটার নির্জনতা আর ভৌতিক একটা গা ছমছমে ভাব যেন অস্বীকার করা যায় না ।
কিন্তু বনানীর সারপ্রাইজটা যে আমাকে এমন চমকে দেবে ভাবিনি ।
এই বনানীকে আমি আগে থেকেই দেখেছিলাম ।
ওর কাগজে ছাপানো ফটো আর ছোট্ট খবর পড়ে জানতাম বনানী সুইসাইড করেছে । কিন্তু আমার সামনে যে হেসে অভ্যর্থনা করে সাদরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল সে সংবাদের ফটোর বনানী । বনানী বেঁচে আছে । কি আশ্চর্য !
আমি আর বনানী একসঙ্গে রিসার্চ করছিলাম ।
বিষয় অবশ্য ভিন্ন । দু'জনেই পি . এইচ . ডি . করেছিলাম । বনানী আমার কাছে জীবন্ত সারপ্রাইজ । থ্যাঙ্ক ইউ বিশাখা ফর ইওর এক্সেলেন্ট সারপ্রাইজ । বিশাখা বলল , তাহলে আমি তোমায় ঠকাইনি , তাই তো ?
*লেখক -- বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী
মোবাইল : ৯৬৪৭১৩৮১২৬
No comments:
Post a Comment