বাঁশি
জয়িতা ভট্টাচার্য
মধু পা দেখে সারাদিন। বিভিন্ন রকমের পা।খড়ি ওঠা পা,চকচকে বুটের তলার সোল ছেঁড়া পা,চটি পরা রঙিন নোখের পা,লোমহীন নিটোল গমরঙা পা।একেকটা ট্রেন থামলেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।ট্রেন চলে যাবার পরে পা রাও কমে আসে।
সেই ভোর পাঁচটায় তার মা কোলপাঁজা করে এখানে রেখে শহরে চলে যায় সস্তার সিন্থেটিকের শাড়ি আর মোটা কাজল আর লাল টিপ পরে।
ক্রমে দুপুর ,ক্রমে রাত পা কমে।ফাঁকা প্লাটফর্মে তখন তার ভাঙা বাঁশিতে সুর তোলে।তেমন কোনো গান নয় কখনো শুধু সুরের ওঠা নামা।একসময় স্থান কাল পাত্র হারিয়ে ফেলে।বাঁশির সুর ধুয়ে দেয় সারা প্লাটফর্ম।চা-ওয়ালা হারাধন,আজিজুল আর অন্য দোকানিরা কাজ বন্ধ করে মগ্ন হয়ে যায় সে সুরে।শেষ ট্রেন এলে মা ফেরে পরিপাটি নয় কেমন ছেঁড়া খোঁড়া হয়ে।
মধু নতুন পা খোঁজে প্রতিদিন।আসলে ওই পা অবধি তার দেখার দৌড়। দৌড় কাকে বলে তাও সে জানে না।একেকবার তাকায় তার সরু হয়ে যাওয়া লিকলিকে পা দুটোর দিকে।মুখ ফিরিয়ে নেয় ঘেন্নায়।কোনো বল নেই ওতে।কোমর ঘষটে ঘষটে প্লাটফরমের ধারে গিয়ে পেচ্ছাব করে আসে।হারাধন দা বলে কোন দিন চলে যাবি ট্রেনের নিচে।তা হারাধন দা সকালে চা এক ভাঁড় বিস্কুট দেয় তাকে।ট্রেন এলে ত্যাবড়ানো বাটিতে পয়সা পড়ে। দুপুরেও এ-ও-সে রুটির টুকরো,ঘাঁটা ঘুগনির তলানি আর মুড়ি দেয় ওতেই পেট ভরে।
এক রাতে মা আর এলো না শেষ ট্রেনে।পরদিনও নয়।আর কোনোদিনই নয়।কেউ বললো ট্রেনে চাপা পড়েছে কেউ বলে ভেগে গেছে কারো সঙ্গে। সেই তেলচিটে বিছানায় আর ফিরতে পারে না সে স্টেশনের পাড়ের ঝুপড়িটায়।লক্ষ মাইল দূরে তার কাছে ।ওই চটের ওপরেই রাত দিন।মুটেরা গায়ে কম্বল ঢেকে দেয় শীতে।
সেদিন সুধীন কাকা নতুন খবর দিল "তোর বাস উঠল রে মধু এখান থেকে"
কেন।"সচ্ছ ভারত অভিযান"হবে টেশন ঝকঝক করবে ভিখিরি নাগারি সব বাদ।কয়েকজন জড়ো হয়।ওরাই বলে "তোকে তুলে নিয়ে যাবে ওই পাগলদের ডেরায় নাতো ভবঘুরেদের সেখানে"কেউ বলল ন্যাংটো করে রেখে দেবে।হারাধন ভাবে মধুর কথা।ঘরে অভাব।পঙ্গু টাকে নিয়ে যাবার যো নেই তাড়িয়ে দেবে বউটা।মধু সেদিন সারাদিন বাঁশি বাজায়। সে অদ্ভূত করুণ সুরে আজিমচাচার চোখে জল আসে।পুলিশ আসে অনেক সঙ্গে অফিসার।সরেজমিনে দেখে যায় স্টেশন।সারাদিন মধু খায় না।শেষ ট্রেন ঢুকছে।চোখ ঝলসানো আলোয় সব ঢেকে যায় আর তারপর মধু নেই হয়ে যায়।দলা মোচড়া শরীরটা হারাধনই চিহ্নিত করে পুলিশের কাছে।
হারাধন সকাল পাঁচটায় স্টোভে পাম্প দেয়।ওই সময় দুটো সিটের মাঝে সরু জায়গাটায় পেতে দেয় ময়লা ছেঁড়া শতরঞ্জিখানা।ফাঁকা পড়ে থাকে।আর পড়ে থাকে ভাঙা বাঁশিটা। কেউ ছোঁয়নি।
অনেক রাতে এখনো কোথা থেকে হাওয়ায় ভেসে আসে বাঁশির করুণ সুর।হয়তো মনের ভুল।ওরা যারা প্লাটফর্মে থাকে ওরা ভাবে।হারাধন দোকান বন্ধ করার সময় মাঝে মাঝে অকারণে চোখ মুছে নেয়।
🎶
*[30/01, 21:52] জয়িতা ভট্টাচার্য: জয়িতা ভট্টাচার্য
পেশা_ শিক্ষকতা
প্রকাশিত বই_ চারটি কবিতার বই ও একটি উপন্যাসের বই ও নানা সংকলনে স্থান পেয়েছে লেখা।
লেখার মাধ্যম_বাংলা ও ইংরেজি
শিক্ষা_এম.কম,এম.এ(ইংরেজি),বি এড প্রভৃতি।
গল্প,প্রবন্ধ,কবিতা ও অনুবাদ করেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।
নিবাস-কলকাতা,
পশ্চিমবঙ্গ
No comments:
Post a Comment