Friday, 4 February 2022

শোক-- কৌস্তভ দে সরকারের গল্প--



শোক
কৌস্তুভ দে সরকার

সকালেই ফেসবুকে খবরটা দেখে ফেলেছিল অঞ্জনা
বাংলা সাহিত্যে আরো এক নক্ষত্রপতন
Rip দিয়ে দু এক জায়গায় কমেন্ট করতেই মনে পড়ে গেল
আজ তো কাজের মাসি আসবে না, ছুটি নিয়েছে
তড়িঘড়ি রাতের বাসন ধুয়ে ব্ল্যাক কফি বসিয়ে দেয় অরূপের জন্য, তারপর নিজের জন্য দুধ চা, ছেলেকে বাটার টোস্ট করে দিয়ে 
ব্রেকফাস্টে বসতেই অতসীর ফোন
- কি রে খবর টা শুনলি?
- আর বলিস না, এই মৃত্যু মিছিল কবে যে থামবে, আর নিতে পারছি না রে।
- আচ্ছা শোন, আজ সন্ধ্যায় তমালতরু ভবনে আসিস কিন্তু, স্মরনবাসরে, একটা কবিতাও নিয়ে আসিস, পাঠ করতে হতে পারে
- ও, আচ্ছা, দেখি! ওকে, রাখছি, বাই। অনেক কাজ আছে রে। কাজের মাসি আজকে আসে নাই।
আজ আবার অরূপের ইচ্ছে, দুপুরবেলায় একটু শপিং সেরে নেবে। পুজো আসছে। আগাম বাজার কিছু করে রাখলে ঐমাসে অত টান পড়বে না। ছুটির দিনে অরূপ একটু ভালোমন্দ খেতে ভালোবাসে।
তবে, আজ জন্মাষ্টমী, নিরামিষ খাওয়াই ভালো। তাই মটর পনির আর গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি কাঁচামুগ ডাল দিয়ে বেশ জমিয়ে ঝটপট রেঁধে নেয় ।
তারপর স্নান সেরে অরূপের দেওয়া এবারের জন্মদিনের দামি শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে বলে,
- দ্যাখোতো কেমন লাগছে, তোমার পাশে মানাচ্ছে কিনা।
অরূপও সেজেগুজে রেডি। দুজনে বেরিয়ে যাবার আগে রূপমকে কপালে চুমু দিয়ে বলে যায়, 
- বাবান দরজাটা লাগিয়ে দাও, আর, দুষ্টুমি কোরো না। ঘুমিয়ে নিও, তাহলে সন্ধ্যায় আমরা এক অনুষ্ঠানে তোমাকে নিয়ে যাব।
সিটিবাজারে আজ বেশ ভিড়। অনেকেই এসেছে ছুটির মেজাজে। মলেই দেবীকার সাথে দেখা।
 - কিরে, তোরাও!?
- হ্যাঁ রে, ছুটি পেয়ে তমাল বলল, কিছুটা মার্কেটিং সেরে নেবে, আর একটু কেএফসিতে...
- আমরাও সেই ভেবেই রে। আচ্ছা শোন, পরে কথা হচ্ছে। এগোলাম।
এরই মধ্যে কয়েকজন ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াটসআপে বুদ্ধবাবুর স্মরণে শ্রদ্ধায় কতকিছু লিখে পাঠিয়েছে। ইসসস, তুন এখনো বুদ্ধবাবুর লেখা একটা লাইন দিয়েও স্ট্যাটাস পারেনি দিতে। সব এই অরূপের জন্য, এমন দিনে বাজারে আসতে চাইল। আর বুদ্ধদেববাবুকেও কি আজই চলে যেতে হত? সব একদিনে পড়ে গেলে কি করে সব সম্ভব? উনার সাথে তোলা কোনো ছবি এই মোবাইলে নেই, তারজন্য ল্যাপটপে বসতে হত। সে সুযোগ পেল কই। কাজের মাসীকেও আজকেই ভ্যাকসিন নিতে যেতে হল। ধুর ছাই, এভাবেই সাহিত্য সমাজে ওর দামগুলো কমে যাচ্ছে যেন। আর বুদ্ধবাবুও এত বই লিখেছেন, তার একটিও সেভাবে পড়াই হয়নি, যে কোনো একটা লাইন মনে করে স্ট্যাটাসে লিখবে। শপিংএর ফাঁকেই তুন একবার দেখে নেয় মাসুদের প্রোফাইল। মাসুদের খুব পড়াশুনা। আর ওর স্ট্যাটাস চুরি করে লিখলেও ধরা পড়ার জো নেই, একটু পাল্টে দিলেই কেউ বুঝবে না। আর খুব বেশি সন্দেহবশত: কেউ কিছু বললে নীচে টুক করে লিখে দেবে, সংগৃহীত, অমুকের ওয়াল থেকে। হয়ে গেল। একফাঁকে বুদ্ধদেব গুহকে সম্মান শ্রদ্ধা জানানো। মলের বাইরে বেশ ভালো পাপড়ি চাট, ফুচকা, মমো বানায়। দুজনে জম্পেশ করে খেয়ে এক হাতে আইসক্রিম, আরেকহাতে শপিং ব্যাগ নিয়ে ওরা উঠে পরে মেট্রোয়। কবি নজরুলে নেমে একটু যাবে মনিকাঞ্চনে। ওখানে অরূপের ইচ্ছে তুনকে একটা সুন্দর মানতাশা উপহার দিতে চায়। সবকিছু সেরে ফিরতে ফিরতে একটু সন্ধ্যেই হয়ে যায়। আবার অতসীর ফোন,
- কিরে, বললি যে আসবি! আসবি না?
- এই তো বেরোচ্ছি, জাস্ট, দাঁড়া, তুই তোর পাশের চেয়ারটা রাখিস আমার জন্য। দুটো রাখিস। বাবান যদি যায়।
- ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আয়। অনুষ্ঠান শুরু হল বলে। সকলেই চলে এসেছে প্রায়।
বাবান বাপির সাথে ক্যারাম খেলতে চায়। ও যাবে না। শেষে একাই লিপস্টিকের শেষ টানটা রুমালের কোণে মুছে নিয়ে তুন উঠে পড়ে রিক্সায়। চেতলা মোড় পেরিয়েই তমালতরু ভবন। বাইরে অনেকেই দাঁড়িয়ে। সাদা পাঞ্জাবি পাজামায় ওই তো রুদ্ধস্বত্ত্ব, দ্রাবিড়, কুঞ্জদার পাশে জিন্স টপে অতসীও। সব চা খাচ্ছে আর বেশ মশগুল আড্ডায়। তুনকে দেখে সকলেই বেশ উৎফুল্ল হয়ে যায়। 
- আরে আরে, এসো এসো। এত দেরি করলে কেন? আমরা সেই কখন থেকে আড্ডায়। 
- এই চলো চলো, ভেতরে যাই সবাই।
ততক্ষণে সুবীর চাটুজ্যের বক্তৃতা শুরু হয়ে গেছে। বুদ্ধবাবুর স্মরণে ও শ্রদ্ধায় এক মিনিট নীরবতার পর হল বেশ গমগম। ঘোষক দু একবার বলেও দিলেন, আপনারা প্লিজ একটু শান্ত হয়ে বসুন, একটু সাইলেন্স, যাতে সবার কবিতাপাঠ ঠিকমতো শোনা যায়। সকলেই বুদ্ধবাবুর সাথে নিজের যোগাযোগ কতটা ছিল, দেখা হয়েছিল কোথায় কোথায়, কোন বই তাকে উপহার দিতে পেরেছিল, লেখা নিয়েছিল পূজো সংখ্যায়, সেইসব বলেকয়ে কবিতা আউড়িয়ে হাততালি কুড়িয়ে নিলেন। পিন ড্রপ সাইলেন্স ছিল তুনের বেলায়। কারণ, সকলেরই চোখে জল এসে গেল তুনের কবিতা পাঠ শুনে, লাইটের থেকে এক ছোট্ট পোকা উড়ে এসে পড়ে জল এনে দিয়েছিল তুনের চোখেও । হাতে মোবাইল ঢাকা রুমালে তা মুছে ফেলতেই সকলেরই গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি সে পেয়ে যায়। বুদ্ধবাবুকে নিয়ে অনেক স্তুতিবাক্য ছিল ওর কবিতায়।
রাত প্রায় দশটা নাগাদ অনুষ্ঠান শেষে ও বাড়ি ফিরলো রুদ্ধস্বত্ত্বর সুইপ্ট ডিজায়ারে। যে কোনো অনুষ্ঠানে গেলে বরাবর রুদ্ধস্বত্ত্বই ওকে বাড়ি পৌঁছে দেয়।
ডিনারে বসে অরূপ জানতে চায়, 
- কোন কবিতাটা পড়লে আজ স্মরণসভায়?
- কেন, তোমার মনে নেই? ওই যেটা লিখেছিলাম, পাঠ করেছিলাম, সবার ভালো লেগেছিল খুউব, সুনীল দা যখন মারা যায়।
- সেটা তো সুনীলবাবুর জন্য লিখেছিলে!
- আরে সেটাতেই তো নাম বদলে চালিয়ে দিলাম। বুদ্ধদেব বললাম সুনীলের জায়গায়। কে অত বুঝতে পেরেছে বা মনে রেখেছে বলো? আর তাছাড়া কয়জন যে আর কার লেখা মন দিয়ে শোনে স্মরণ সভায়! সব তো ব্যস্ত আলাপ পরিচয়ে আর আড্ডায়। 
লাইট অফ করে এরপর নিবিড়ভাবে অলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ওরা শুয়ে পড়ে, এবার ঘুমের অপেক্ষা।

টার্গেট
কৌস্তুভ দে সরকার

দ্যাখোতো, কে যেন মনে হল চলে গেল..."
আজকাল নমিতার এরকমই মনে হচ্ছে কেন যেন। সন্ধ্যায় দোতলার ঘরে বিছানায় বসে টিভি দেখে ওরা, বাবান পড়তে যায় তখন। অরূপ আর ও সেসময় চা খেয়ে, টিভি দেখে, একসাথে কিছুটা সময় কাটায়। সামনের দরজাটা খোলাই থাকে।  সামনের দরজায় সাদা পর্দা ঝুলতে থাকে। আর দরজার সামনেই সিঁড়ি। নমিতার মনে হয়, কে যেন এক ঝটকায় দরজার সামনে দিয়ে চলে গেল। উঠে যে গিয়ে দেখবে, তাতেও ভয় ওর । অরূপকেই বলে, "যাওনা, গিয়ে দেখে আসোনা একটু।" অরূপ বলে, "আরে ইঁদুর টিদুর হবে বোধহয়। তাছাড়া পাশের বাড়ির বেড়ালটাও আসে, ওটাই হবে হয়তো!" নমিতা জিদ ধরে বসে থাকে।  অগত্যা, অরূপ যায়। গিয়ে দেখে ঘুরে এসে বলে, "কই কিছু নাই তো। কেউ না। ওটা তোমার ভ্রম।" নমিতা কিছুটা আশ্বস্ত হয়। আবার মনে মনে কিছুটা ভয়ও পায়। বুঝতে পারেনা, এটা ওর নার্ভের দুর্বলতা নাকি অন্য কিছু। এত বড় বাড়ি ওদের, বড় বড় জানলা, কতরকম হাওয়া-বাতাস আসে, আসতেই পারে। ভেতরে অনেক গাছ, টবে, বারান্দায়। সেগুলোর ছায়াও প্রতিফলিত হতে পারে। তা সত্বেও কেন যেন ওর মনে হয়, ঘরে কেউ, কিছু একটা ঘোরাঘুরি করে। নমিতার কাছে পাড়ার কিছু মেয়ে সেলাই শিখতে আসে। ওরাও ওকে বলেছিল একদিন, "ম্যাম, আপনার বাড়িতে কি আর কেউ থাকে?" নমিতা বলে, "কেন বলতো?" ওরা বলে, "কেন যেন মাঝেমধ্যে মনে হয়, কে যেন চলে গেল দরজার সামনে দিয়ে।" ওরাও ভয় পায়। তবে কোনোদিন কোনোরকম ক্ষতি না হওয়ায় নমিতা মনকে কখনো আবার এই বলেও সান্ত্বনা দেয়, নিশ্চই কোনো ভাল আত্মা। হতে পারে তার শ্বশুরমশায়। এখানে উনার ছেলে, বৌমা আর নাতিকে পাহারা দিতে আসে। গোটা বাড়িটাই দেখে রাখে ওদের। হয়তো এটাই ঠিক। কেননা, সেদিন সামনের বাড়ির দাদা গল্পে গল্পে জানতে চেয়েছিলেন, "আচ্ছা, শ্রাবণী পূর্ণিমার সন্ধ্যায় সারা বাড়িতে কি আপনারা প্রদীপের আলো দেখান?" "কেন বলেন তো?" নমিতা অবাকই হয়। আরে সেদিন সন্ধ্যায় তো ওরা তিনজনেই মলে গিয়েছিল, একটু এটা-সেটা কেনার জন্যে, আর একটু ঘুরে বেড়াতে - পূর্ণিমায়। সন্ধ্যায় তো  সেদিন ওরা ঘরে কেউই ছিল না। তাহলে বাতি দেখাচ্ছিল কে? সামনের বাড়ির দাদা বললেন, "আপনাদের জানলার কাঁচ দিয়ে আর সিঁড়িঘরের কাঁচ দিয়ে দেখলাম, মনে হল, বাতি নিয়ে কে যেন সারা বাড়িতে আলো দেখাচ্ছে!" নমিতা ঠিক বুঝতে পারে না, ব্যাপারটা কি। 
বাড়ির ছাদে প্রচুর টব, নানারকম ফুল ও ফলের গাছ নমিতাদের। বাড়ির পোষ্যকে রোজ রাতে ডিনারের পর ছাদে ঘোরাতে নিয়ে যেতে হয়। এটাই রেওয়াজ। নমিতারও ভালো লাগে এটুকু সময়। তাছাড়া কথাতেই আছে, আফটার ডিনার ওয়াক এ মাইল। তবে, এরই মধ্যে সামনের বাড়ির কর্তা প্রয়াত হয়েছেন। পাড়ায় একটা শোকের আবহ চলছে। দুদিন হল, পোষ্যকে নিয়ে ছাদে উঠতেও ভয় পায় সে। শরীর ভারী হয়ে আসে নমিতার। কেন যেন মনে হয়, পেছনে কেউ ঘুরছে, ও ছাড়াও কেউ আছে ছাদে। নমিতার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। যত তাড়াতাড়ি পারে পোষ্যকে নিয়ে দৌড়ে নেমে আসে ছাদ থেকে। রাত্রে ঘুমোতে যাবার আগে বাথরুমে গেলেও এখন অরূপকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে। কিন্তু এ যে আরেক নতুন আপদ মনে হচ্ছে ওর। শেষ অব্দি অরূপকে বলে, "চলো না একটা কীর্তন দিই বাড়িতে। লোকনাথ বাবার।" অরূপ রাজি হয়ে যায়। জন্মাষ্টমীর দিন লোকনাথ মিশনের কীর্তন দল এসে পুজো-পাঠ করে , খোল-কর্তাল বাজিয়ে কীর্তন করে সারা বাড়ি মাত করে তোলে। পাড়ার সবার নেমন্তন্ন ছিল। প্রাসাদে ছিল ফ্রায়েড রাইস, মটর-পনির, ছোলার ডাল, আলুভাজা, চাটনি, রসগোল্লা। সবাই তৃপ্ত হয়ে খেয়ে বাড়ি যায়। সেই রাতের পর থেকে নমিতা আর কোনোদিনও ভয় পায়নি বাড়িতে, একা থাকলেও।

No comments:

Post a Comment

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...