Monday, 31 January 2022

পাথরের চোখ --শংকর ব্রহ্ম

পাথরের চোখ
শংকর ব্রহ্ম

লোকটা আমাদের দপ্তরেই চাকরী করত।
মাস কয়েক আগে জয়েন করেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কারও সঙ্গে মিশত না, কথা বলত না। কারও সাতে পাঁচে থাকত না। একা একা ক্যান্টিনে গিয়ে টিফিন করত। তার সম্পর্কে মেয়েদের কৌতূহল ছিল অপার।
আমরা অফিসে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কত কথা বলতাম, রাজনীতি,খেলা,সিনেমা, বইমেলা নিয়ে আলোচনা করতাম। সে থাকত নীরব।
যতবার তার চোখের দিকে তাকিয়েছি,দেখছি
পাথরের চোখ, ভাষাহীন।
মেয়ে মহলে তার প্রসঙ্গ উঠলে, বুদ্বুদের মতো উঠেই মিলিয়ে যেত। কারণ কেউ তার সম্পর্কে বেশী কিছু বলতে পারত না।
কখনো সখনো সে আমার হাতের বই বা পত্রিকা চেয়ে নিয়ে পড়ত। কিন্ত তার সম্পর্কে কখনও কোন মন্তব্য করত না।
তাকে দেখে আমার মনে হত, গোবেচারা স্বভাবের ভাবলেশহীন মানুষ এক। যার আমাদের কারও  সম্পর্কে কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই ।
অফিস ক্যান্টিনে ভেঙে নতুন করে গড়া হচ্ছে।
অনেকেই নিজের টেবিলে চা আনিয়ে খাচ্ছে।
কেউ কেউ ভাঙা ক্যান্টিনের আসে পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। লোকটিও একপাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। কিছু দূরে দাড়িয়ে আমি, একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে, হাতের পত্রিকাটা খুলে দেখছি। চা খেতে খেতে সে ওই পত্রিকাটি একবার দেখতে চাইল আমার কাছে। দিলাম। হাতে নিয়ে নববিবাহিতদের পাতায় একটি ছবি দেখে, তার হাত থেকে চায়ের কাপটি পড়ে গেল।
সেও ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। আমরা হৈ চৈ করে তাকে তুলে এনে অফিসে পাখার নীচে এনে শোয়ালাম। চোখে জলের ঝাপটা দিতে, কিছুক্ষণ পরে তার জ্ঞান ফিরে এলো। সে উঠে বসলো। আমরা বললাম,আপনার শরীর ভাল নেই, আপনি আজ বাড়ি চলে যান।
- ঐ পত্রিকাটি একটু নেবো?
-নিন
- ওর থেকে একটা ছবি কেটে নেবো?
- কেটে নিন।
পত্রিকটাই নিয়ে যান বাড়ি।
সে পত্রিকাটি নিয়ে চলে গেল সেদিন।

পরের দিন সে আর অফিসে আসেনি। তারপর দিনও না। মাসখানেক পরে শুনলাম,তিনি চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন।
তার কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। জীবনে কত লোকের সঙ্গে আলাপ,পরিচয়,হৃদ্যতা হয়, কিন্তু ক'জনের কথাই বা মনে থাকে বলুন?
কয়েকমাস পর পোষ্ট অফিস থেকে একটি চিঠি আসায়, তার কথা আবার মনে পড়ল।
তিনি লিখেছেন,আপনার কাছ থেকে যে পত্রিকাটা নিয়ে গিয়েছিলাম, তাতে আমার প্রাক্তন স্ত্রীর ছবি ছিল। ছবিতে তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, ছবিতে তার সৌন্দর্য ধরে রাখা যায় না। যার চোখে কবিতার ভাষা আছে সে বুঝবে ,ক্যামেরার চোখে তো আর তা নেই। 
তার এই সৌন্দর্যই শেষ পর্যন্ত কাল হলো। 
প্রতিবেশী এক তরুণ কবি তার রূপে মুগ্ধ হয়ে,
আস্ত একখানা প্রেম উপাখ্যান লিখে ফেললো। সেটা আবার টাকা খরচ করে ছাপিয়ে তাকে উৎসর্গ করলো।
আশ্চর্য, সেও সেই তরুণ কবির প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। পাগল হয়ে উঠল। কিছুদিন আমি তা লক্ষ্য করে বুঝতে পেরে, প্রথমে খুব কষ্ট পেলাম।
পরে ভাবলাম যে আমাকে ভালবাসে না তাকে ভুলে থাকাই ভাল। তাই আমি তাকে মিউচুয়ালি ডিভোর্স দিলাম।
গত মাসের সাতাশ তারিখে তার আবার নতুন বিয়ে হয়েছে ওই তরুণ কবির সাথে । তারই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ওই পত্রিকায়।
চিঠিটা পড়ে আমার চোখে,তার ভাবলেশহীন পাথরের চোখ দু'টো ভেসে উঠলো। চোখ দুটো থেকে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে আমার হাতে পড়ল মনে হলো। না হলে হাতটা আমার আর ভেজা কেন? আমি তো আর কাঁদিনি, তার দুঃখে অশ্রুসিক্ত হয়ে।
-------------------------------------------------------------------

*লেখক পরিচিতি
---------------------------
নাম - শংকর ব্রহ্ম
জন্ম - কোলকাতা ( ২রা মার্চ ১৯৫১.)
শিক্ষাগত যোগ্যতা - বানিজ্যে স্নাতক
জীবিকা - বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা (প্রধান-শিক্ষক,
বর্তমানে - অবসর প্রাপ্ত)।
কবিতা চর্চা -১৯৭০ সালের শুরু থেকে -
সান্নিধ্য লাভ - অন্নদা শংকর রায়, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শিব নারায়ণ রায়, অমিতাভ চৌধুরী, পবিত্র সরকার, সমরেশ বসু, অরুণ মিত্র, সুশীল রায়, নারায়ণ গাঙ্গুলী, অমিতাভ চৌধুরী, যজ্ঞেশ্বর রায়, নীহার রঞ্জন গুপ্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্র বিশ্বাস,
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, সুনীল গাঙ্গুলী, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, শক্তি চ্যাটার্জী, দীপক মজুমদার, পবিত্র মুখার্জী, দিব্যেন্দু পালিত, দেবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম চ্যাটার্জী ( মহীনের ঘোড়াগুলি) প্রমুখ।
প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ -
১). তোমাকে যে দুঃখ দেয়
২).স্মৃতি তুমি আমাকে ফেরাও
৩).যাব বলে এখানে আসিনি
৪).আবার বছর কুড়ি পরে
এ'ছাড়াও আরও দশটি 'ই-বুক' প্রকাশিত হয়েছে।
এই ওয়েব লিঙ্কে সব বইগুলি পাবেন পড়ার জন্য।
https://sites.google.com/view/sblekhalikhi/home

প্রকাশিত কবিতা শ'পাঁচেক-এর চেয়েও বেশী। প্রায় শতাধিক পত্রিকার লেখক। 'দৈনিক বাংলা স্টেটসম্যান', পুরশ্রী, 'প্রসাদ', 'ঘরোয়া' 'বিকল্প বার্তা (শারদীয়া সংখ্যা - ১৪২৮) এ'ছাড়া রয়েছে -
( সমরেশ বসু সম্পাদিত - মহানগর, শিবনারায়ণ রায় সম্পাদিত - জ্ঞিসাসা, কিরণ শংকর সেনগুপ্ত সম্পাদিত - সাহিত্য চিন্তা, পবিত্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত - কবিপত্র প্রভৃতি)।
বহু পুরস্কারে ভূষিত। 'সারা বাংলা কবি সন্মেলন' ( ১৯৭৮ সালে) সালে তরুণদের মধ্যে প্রথম পুরস্কার। 'সময়ানুগ' (১৯৭৯ সালে) প্রথম পুরস্কার। ' যুব উৎসব (১৯৮০ সালে)-এ পুরস্কৃত।
ও অন্যান্য আরও পুরস্কারে ভূষিত।
'বাংলা সাহিত্য - লাইব্রেরী'-তে প্রকাশিত
এই কবির লেখার লিঙ্ক -
http://banglasahitya.net/tag/sankar-brahma-শংকর-ব্রহ্ম/
'শব্দব্রহ্ম' ও 'সাহিত্য সংহিতা' দুটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
বর্তমানে ' সাম্প্রতিক সাহিত্য' ও ' শায়েরী ও রুবাই' গ্রুপের এডমিন।

ঘড়িওলার নেশা--ডা. অরুণ চট্টোপাধ্যায়

ঘড়িওলার নেশা
-অরুণ চট্টোপাধ্যায়

বাজারে আজকাল কোনও খাঁটি জিনিস আর পাওয়া যায় না। চারিদিকে শুধু ভেজাল। সর্ষের তেলে শিয়াল কাঁটা নিয়ে এককালে খুব হৈ হৈ হয়েছিল। আজকাল সব কিছুতেই ভেজাল। দুধে ভেজাল। কি একটা কেমিক্যাল জলে মিশিয়ে নাকি নকল দুধ হয়। বাসি মাছ কেমিক্যাল দিয়ে ঝকঝকে টাটকা করা হয়। মাংসতেও নাকি ভেজাল। ভাগাড়ের মাংস নিয়ে কি হৈ হৈ টাই না জানি হল। আনাজপাতি, শাক-সব্জি, ফল কীসে আর ভেজাল নেই? বোতলে বোতলে পরিশুদ্ধ জল বিক্রি হচ্ছে সেও নাকি ভেজাল। নামি ব্র্যান্ডের বোতলে বিক্রি হচ্ছে বেনামি কোম্পানীর পানীয় জল।
--আমাদের ছেলেবেলায় এমন ভেজাল ছিল না বাপু। সব একেবারে টাটকা টাটকা। এক খদ্দের বিশ্বরূপবাবু খুব বুক বাজিয়ে গলা উঁচু করে বলে গেলেন।
কথাটা ভাবিয়ে তুলল বিকাশকে। চা বিক্রি ছেড়ে দিয়ে সে এখন ঘড়ি সারানো ধরেছে। তাতেও তেমন লাভ হচ্ছে না। আজকাল একটা স্মার্ট ফোনে নাকি ঘড়িরও চাহিদা মেটে। তাই ঘড়ি পরার লোক আর তেমন জোটে না। সারানো তো দূরের কথা।
বিকাশের মাথায় চিন্তার পরে চিন্তা আসে। সে বিজ্ঞানী নয়। নয় অর্থনীতিবিদ বা সমাজতাত্ত্বিক। কিন্তু মনে সমাজের উন্নতির গভীর চিন্তা। এই ভেজাল দূর করতেই হবে। আবার আনতে হবে খাঁটির যুগকে। খাঁটি দুধ, খাঁটি মাছ-মাংস, রঙ না করা টাটকা সবজি। আর খাঁটি মানুষ।  
আজকাল ঘড়ি সারানোর তেমন লোক নেই। ঘড়িও সব ডিজিট্যাল। কাজ নেই কম্ম নেই। কথায় বলে অলস মস্তিষ্ক নাকি—যাক গে যাক। তার মাথায় শুধু চিন্তা আগের সেই নির্ভেজাল দিনগুলোকে কি করে ফিরিয়ে আনা যায়। আচ্ছা, যত দিন যায় তত সময় বয়ে যায়। এই সময় বয়ে যাওয়ার সূচনা করে কে? ঘড়ির কাঁটা বাঁদিক থেকে ডানদিকে ঘুরে যায় বলেই তো? 
হুররে, পেয়েছে বিকাশ পেয়েছে। একটা পুরোন জং ধরা ঘড়ি পড়ে ছিল। একজন গত বছর দিয়েছিল বিকাশের কাছে। তারপর বোধহয় দুই তরফেই ভুলে গেছে। রিস্টে হাতঘড়ির বদলে হাতে সে এখন ঝকঝকে স্মার্ট ফোন নিয়ে যাতায়াত করে। সময় দেখার কায়দাও সে খুব স্মার্ট করে নিয়েছে। আগের মত সময় দেখার প্রয়োজনও আজকাল কারোর তেমন হয় না বললেই চলে। সকলের হাতেই তো একটা করে স্মার্ট ফোন।
সেই ঘড়িটা নিয়ে আজ পরীক্ষা করার ইচ্ছে পেয়ে বসল বিকাশকে। ঘড়ির কাঁটাগুলো একটু জং পড়ে গেছে। তেল দিয়েও হচ্ছে না। একটু চেপেচুপে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিল। প্রথমটা একটু বেগ দিলেও পরে ঘুরতে লাগল। মানে ডানদিক থেকে বাঁদিকে। তেলে পিছলে গিয়ে একেবারে হুড়হুড় করে ঘুরেই যাচ্ছে।  
চোখের সামনের জগতটা কেমন পালটে যাচ্ছে বিকাশের। আধুনিক ভেজাল যুগ পালটে গিয়ে বিশ্বরূপবাবুর ছেলেবেলার নির্ভেজাল যুগ। কি সুন্দর! চাল খাঁটি, ডাল খাঁটি, সব্জি-আনাজ-ফল-ফুল, জল, দুধ সব খাঁটি। আর মানুষগুলোও খাঁটি। 
যুগ পাল্টেছে। মানুষের পোশাক, হাবভাব, স্বভাব, শিক্ষাদীক্ষা সব কিছু। সনাতন সুন্দর এক ভারত। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে আর ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে উলুখড়ের প্রাণ যাচ্ছে। আকাশে বাতাসে একটা বীরত্ব অথচ পবিত্রতা।
খুব ভাল লাগছে বিকাশের। এ এক সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কার। আরে, এ তো টাইম মেশিন। তাহলে টাইম মেশিন কি বিকাশের কোনও পূর্বপুরুষ আবিষ্কার করেছিল? এ নিয়ে ভাবতে বসার টাইমও নেই তার হাতে। আছে শুধু নেশার তাড়না। 
সেই তাড়নায় সে কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। এই যা সব আলো নিভে গিয়ে অন্ধকার চলে এল কেন? আর অন্ধকার বাড়ছে তো বাড়ছেই। তবে কি ইতিহাসের অনেক পেছনে চলে যাচ্ছে বিকাশ? হায় রে ঘড়ির কাঁটা যে আর থামে না। 
[শব্দঃ ৪৯২]


*সংক্ষিপ্ত জীবনী
-অরুণ চট্টোপাধ্যায়
জন্মঃ ১৯৫৩ শ্রীরামপুরের মাহেশে। বর্তমানে বৈদ্যবাটী নিবাসী।
শিক্ষাঃ রসায়ন ও চিকিৎসা। 
পেশাঃ অবসরপ্রাপ্ত।
নেশাঃ সাহিত্য রচনা, ভ্রমণ, মাল্টিমিডিয়ার কাজ, ফোটোগ্রাফি।
সাহিত্য রচনাঃ ছোটদের গল্প, কবিতা, ছড়া, নাটক, প্রবন্ধ, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, কল্পবিজ্ঞান, ভূতের গল্প, উপন্যাস প্রভৃতি। বড়দের গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, চিকিৎসার প্রবন্ধ, কল্পবিজ্ঞানের গল্প ও উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, গোয়েন্দা গল্প ও উপন্যাস প্রভৃতি।
পত্রিকাঃ আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর ভারতী, কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞান, পথের সুজন, ছোটদের রূপকথা, ছোটদের কলরব, সঞ্চিতা, টুকলু, পালক, এক মুঠো খোলা আকাশ, কিশোর বার্তা, খুশির হাওয়া, দুষ্টু, অপরাজিত, আনন্দকানন প্রভৃতি।
সাপ্তাহিক বর্তমান, কথাসাহিত্য, রেওয়া, উত্তরের সারাদিন, সারাক্ষণ, শারদ অর্ঘ, অপরাজিত, বইসই, চৌরঙ্গী, কাগজের সন্দেশ, খড়কুটো, খোয়াই, কবিতা ক্লাব, করোনাকাল, কথা, সাসপেন্স বার্ষিকী, অসময়, পারক, প্রাচ্যদর্পণ, সাঁকো পত্রিকা, সপ্তপর্ণ, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী, সায়েন্টিফিলিয়া, অলীকপাতা, বইসই, দুর্নিবার, জলতরঙ্গ, হৃৎস্পন্দন, কথা কাহিনী, নবপ্রভাত, অঙ্কুর, আড্ডা নিউ জার্সি প্রভৃতি।  
প্রকাশিত বইঃ আবর্তন(বড়দের গল্প), আলোর ঠিকানা(বড়দের উপন্যাস), অর্ধাঙ্গিনী(বড়দের উপন্যাস), বন্ধ দরজার ওপয়ারে(বড়দের উপন্যাস)।    


Dr. ARUN CHATTOPADHYAY
181/44 G.T.ROAD (GANTIR BAGAN)
P.O. BAIDYABATI 
DIST. HOOGHLY (PIN 712222)
W.B.
MOB. 8017413028
EMAIL. chattopadhyayarun@gmail.com

অপশন্....শ্যামাপ্রসাদ সরকার।

অপশন্
............
শ্যামাপ্রসাদ সরকার।

এই একঘন্টা ধরে দেখছি চোখের সামনে একটা অর্ধস্বচ্ছ আবরণ থেকে থেকেই একবার আসছে আর সরে যাচ্ছে। এখন বেশ বুঝছি এটা বোধহয় দুপুর গড়িয়ে বিকেল । 'বোধহয়'টা আবার কেন বললাম তার কারণ বসবার ঘরে দেখছি টিউবলাইট জ্বলছে  আর এখন বাড়ীর সবাই অফিস - কাছারি থেকে এসে গোল হয়ে বসে ভীষণ চাপা গলায় কিছু একটা গভীর বিষয়ে কথা বলছে। 
এরই মধ্যে নীপা মানে আমার পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরনো ধর্মপত্নীটিকে দেখলাম মুখে আঁচল চাপা দিয়ে আগত কান্নাটাকে একবার আটকাল।
ছেলেরা, জামাইরা আর মেয়েরা যা বলাবলি করছে সে কথায় বোঝা গেল যে তপন ডাক্তার খানিক আগে এসে বলে গেছেন যে আমার আর ঠিক হবার কোন চান্স নেই। আমিও যেন ডাক্তারকে চলে যেতে যেতে একবার  অস্ফূট স্বরে বলতে শুনেছিলাম যে " অ্যাম ভেরী স্যরি" ! 
দেখছি ওরাও সকলে এই সম্ভাব্য মৃত্যুর ব্যাপারটায় বোধহয় একটু বিচলিত হয়ে পড়েছে। 
আর তাই এখন সবার মুখে এই নিয়ে গম্ভীর গম্ভীর সব আলোচনা। 
টুটুন মানে বড়ছেলে একবার আমতা আমতা করে বলল " সবই তো বুঝলাম! কিন্তু আমি থাকি সেই পুনা'য়। বুটুন মানে ভাই তো আবার সেই সাউথে! আর বনি আর মণি যে যার সংসারে ব্যস্ত। একজন থাকে বিলাসপুর আর অন্যজন ভোপালে। মা ঠিক কার কার কাছে পালা করে  বা কবে, কোথায় থাকবে এটা নিয়ে তোরা কিছু ভেবেছিস্ কি?" 
বড়জামাই মণীশ গলা খাঁকড়িয়ে যেন বলল - 
" দেখুন ! সেটা তো একটা প্রবলেম তো বটেই। তাই বলে আবার বাড়িটিও এভাবে ফাঁকা ছেড়ে দেওয়াটা কি ঠিক হবে !"
বনি আর মণি এসব কথার মধ্যেই  দেখলাম একফাঁকে উঠে চুপচাপ ওদের মাকে খানিক আগে ধরে ধরে আমার ঘর থেকে এসে একটু ঘুরে গেল। তখন দেখলাম মা আর মেয়ে দুটোই ওদের চোখমুখ সব লাল করে বসে আছে। 
তাহলে এখন আমি কি সত্যিই....
এবার শুনতে পেলাম যে বুটুন বলল,
 " আরে!আমার সাউথে মানে ব্যাঙ্গালোরে ওইতো দেড়খানা মাত্র ঘর। তার ওপর প্রায়সই  নাইট শিফট্ লেগেই থাকে। মা একা কি করে ওখানে থাকবে? আমার তো আর বউ নেই!"
ওর শেষের কথাটায় কাকলী মানে বড়বৌমার বোধহয় একটু আঁতে ঘা লাগল। ও তাৎক্ষণিক নিজের ঝাঁঝটাকে চট্ করে কান্নায় কনভার্ট করে নিয়ে বলল - " আসলে ঋভুও তো এখন বড় হচ্ছে! তাছাড়া আমার আবার স্কুলে পড়ানো আছে ! ওসব দিকে হুট করে আবার লোক টোক চট্ করে পাওয়া যায়না ! তা মা কে দেখবে কে ওখানে শুনি ? ওনারো তো আজকাল শুনছি আবার হাজারটা অসুখ!"
আমাদের ছোটজামাই সমীর আর্টিস্ট মানুষ। সে মার্জিত গলায় দাড়ি চুমড়ে বলল,- " এবারে মণি চাইলে আমরা না হয় এখানেই একটা আঁকার স্কুলটুল জাতীয় কিছু একটা খুলে চালাতে পারি। আর তাহলে মা এখানেই থাকলেন আর মণিরও একটা সাইড ইনকামের রাস্তা খোলা থাকল। কলকাতায় আমার নর্থে নেহাত জয়েন্ট ফ্যামিলি কাজেই মনে হয় এটাই বেটার অপশন্!"
ওদের সাহেবী উচ্চারণে ভোজবাজির মত ওই
" অপশন্" শব্দটা কেবল থেকে থেকে চারদিকে ঘুরপাক খেতে লাগল । 
বুঝলাম তাহলে বাহাত্তর বছরে মরলে বা সবার ওপর কোন বিপর্যয় আসলে এতদিন আমি বা আমরা দুজন কেবল ওদের গা বাঁচানোর জন্য        " অপশন" খুঁজতে হবে এটাই বোধহয় শিখিয়েছি! 
এখন তাই ওদের কাছে শিখলাম জীবন কি মৃত্যুর বদলে ওদের জাস্ট একটা " অপশন" ! আনাটাই এখন দরকার।
খুব নিজের ওপর রাগ হল। আচ্ছা যদি নীপা এরকমভাবে অসুস্থ হত তাহলেও কি ওরা আমায় এই ধরণের এক বুদ্ধিই দিত? 
কে জানে?
নীপা দেখলাম ঠাকুরঘর থেকে চুপ করে বেরোল। ওর মুখে এখন একটা আবেগহীন আর নির্মোহ গম্ভীর টাইপের ভাব। আমি জানি সবটা ওরও কানে গেছে বলেই এখন এরকম কঠিন হয়ে থাকছে। 
আচ্ছা ওও কি আমায় এরজন্য এখন দোষারোপ করছে?

...............

ফড়িং ধরে ফিরছিলাম। একটু আগেই মাঠে উদ্দাম বল খেলা সেরে চাকলাদারদের গোয়ালে পাশ থেকে আসতে আসতে শুনলাম ফরিদপুর নাকি আর ভারতের মধ্যে থাকবেনা। নসু জ্যাঠা চাপা গলায় সবাইকে তল্পি তল্পা গোছাতে বলছেন। এবারে মুসলমানেরা নাকি সব এসে কেড়ে নেবে আমাদের। আমরা নাকি তাই ইন্ডিয়ায় চলে যাব। তাহলে এই ভিটে..নারকোল গাছ.. এগুলোও কিছু থাকবে না আর? কান্না পাচ্ছে।
সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। 

শুনতে পেলাম নসু জ্যাঠার গলাটায় বাষ্প জমে আছে। উনি আক্ষেপের সুরে বলছেন-
 " জহরলাল এটা কি করল? আর মহাত্মাজীও কিছু বললেন না? সুভাষটা যে কেন এইসময় চলে গেল...."
..............

ওয়ালশ্ জুটমিলের সামনে জটলায় কয়েকটা সোডার বোতল ছুঁড়ল কেউ একটা। দুম্ দুম্ করে দু আবার একটা হাত বোমাও পড়ছে। আসলে লকআউটে তিনমাস ধরে কেউ মাইনে পায়নি। অর্থাভাব মানুষকে এখন মরিয়া করে তুলেছে। একদল লোক এর মধ্যে কোত্থেকে এসে লাল নিশান হাতে এসে " নকশালবাড়িইইইই লাল সেলাআআম" বলতে বলতেই শুনতে পেলাম পুলিশের ভ্যানের আসার আওয়াজ। এখন একটা কোত্থেকে ধোঁয়ার মত এসে যেন চারদিক ঢেকে দিচ্ছে চেতনার গভীর পর্যন্ত।
................

নীপা,

চলে যাচ্ছি। কি জানি! হয়তো এতক্ষণে মরেও যেতে পারি।কিছু বুঝতে পারছিনা। সবাইকে অচেনা ঠেকছে।

 শুধু একমাত্র তোমায় চেনা লাগছে। 

দেখ, মনকে শক্ত কর! দু'দিন আগে আর পরে কাউকে তো একটা যেতেই তো হত বল। 
তুমি তাই বলে আবার মাছ টাছ খাওয়া ছেড়োনা যেন। নিরামিষ তোমার মুখে রোচেনা  তা আর আমি জানি না কি! আচ্ছা আমার বদলে তুমি আগে চলে গেলে আমায় কি কেউ সাদা পোশাক আর মাছ -টাছ ছাড়াই কেউ খেতে বলত? জানি উত্তরটা 'না' তো! 
আচ্ছা, তুমিও কি ওদের মত " অপশন" খুঁজবে গো? আমায় ভুলে যাবে বল!
এই বাড়িটার এক একটা ইঁট তোমার স্থৈর্য্য আর আমার কষ্টের কথা মনে রেখে কিন্তু এখনো দাঁড়িয়ে আছে ! বল একবার, সেটাও  সত্যি তুমি  ভুলে যাবে কি না , বল? 
এখন তাছাড়া তোমার জন্য যেটুকু আছে তাতে ভাতকাপড়টা জুটে যাবে। তাই ওদের কারুর দয়ায় নয়, নিজের অহঙ্কারে বেঁচো......
আর শোন! বিয়ের প্রথম প্রথম আমায় আদর করে  যেমন অরুউউউণ, অরুউউণ বলে যেমন ডাকতে... ডাকবে গো একবার..জাস্ট আর  একবাআআআআর !
আজ তাহলে আসি!
......


*Shyama P Sarkar
Ph : 8583829575

একটি রহস্যময় ঘটনা--শুভ্রব্রত রায়

একটি রহস্যময় ঘটনা
শুভ্রব্রত রায়

একদিন একটি রাত্রিতে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কারণ সেই সময় ছিল বর্ষাকাল। সারাদিন প্রবল বৃষ্টির হওয়ার পর যখন খানিকটা বৃষ্টির পরিমাণ ও ঝড় হাওয়ার দাপট কমল, তখন প্লাটফর্মে একটাও লোক নেই। প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক শুনশান। অর্ক বলে একটি ছেলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে বাড়ি ফিরবে বলে। কারণ তার বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে। কিন্তু ট্রেন আসতে অনেক দেরী, তাই অর্ক প্লাটফর্মের একটি বেঞ্চে পা তুলে বসল, রাত্রি তখন প্রায় ঘড়ির কাঁটায় আটটা বাজে। তখন সে ভাবলো এই ঠান্ডা আবহাওয়াতে একটু চা পেলে ভালোই হতো, কথাটা ভাবা মাত্রই দেখল সে-খানিকটা দূরে একটি লোক চায়ের কাপ ও কেটলী হাতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছ। তৎক্ষণাৎ অর্ক হাত নেড়ে লোকটিকে ডাকল। অর্ক বলল এক কাপ চা দিন। লোকটি বলল চা নেই বাবু কফি আছে। অর্ক শুনে মনে মনে বেশ খুশি হয়ে ভাবলো "আরও ভালো"। এই ভেবে সে এক কাপ কফি কিনে খেতে লাগলো আর প্লাটফর্মেই পায়চারি করতে লাগলো।
  হঠাৎ খানিকটা দূরে তার দৃষ্টি পড়ল, সেখানে একটা একটা কী যেন একটা পড়ে আছে। দূর থেকে বিদ্যুতের আলোতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তাই অর্ক একটু এগিয়ে গেল সেই দিকে। আর দেখল একটি মানুষ পড়ে আছে রেল লাইনের ধারে। সে ভাবল লোকটি হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে বা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। তখন প্রায় রাত্রি নটা বাজে।
ঠিক আর একটু বাদেই রাত্রি সাড়ে নটা নাগাদ ট্রেন আসবে। তাই অঘটনের আশঙ্কায় তার বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাই তাকে সেই রেল লাইন থেকে তোলার জন্য অনেক ডাকাডাকি করতে লাগলো। কিন্তু অর্ক লোকটির কোনো সাড়া পেলনা, সাড়া না পেয়ে লোকটির ডান হাতটি ধরে সজোরে হ্যাঁচকা টান দিল। এ কী! বরফের মতো ঠান্ডা তার হাত। কিন্তু তার শরীরের পোশাকটা তো ভদ্রলোকদের মতোই মনে হচ্ছে। আর একটি জিনিস তাকে অবাক করে দিল। লোকটির ডান হাতের তর্জনী যেন লাইনের পাশের ঝোপের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। সে অনেক চেষ্টা করে লোকটির দুটি পা টেনে তাকে লাইনের বাইরে নিয়ে এল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! তার তার ডান হাতের তর্জনী সেই ঝোপের দিকেই রয়েছে। 
সে তখন কৌতূহলবশতঃ সেই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে করে ঝোপগুলি সরাতেই তার চোখে পড়ল একটি কালো ব্যাগ। সে আরও কৌতুহল হয়ে পড়ল ব্যাগটি তাড়াতাড়ি খোলার জন্য। ব্যাগটি খুলে সে দেখল পাঁচ লক্ষ টাকা। অর্ক তখন ভাবতে লাগলো এত টাকা নিয়ে লোকটি কোথায় যাচ্ছিল? তার পরিচয়টাই বা কী? এইভাবেই সে ব্যাগটি আরও ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখল কয়েকটি বিবাহের কার্ড রয়েছে। তাতে পাত্র-পাত্রীর পিতা ও মাতার নাম লেখা। তবে কী লোকটির ছেলের বা মেয়ের বিবাহ? সে কৌতূহল হয়ে কার্ডটি পড়ল এবং ঠিক করল সব জেনে লোকটিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। এই ভেবেই অর্ক যেই পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে লোকটিকে দেখার জন্য যেখানে তাকে সে রেখেছিল। কিন্তু কোথায় কী? কেউ তো নেই! তন্ন তন্ন করে অর্ক খুঁজল চারপাশ। কিন্তু জরাজীর্ণ লোকটিকে কোথাও দেখা গেল না।
এখন সে কী করবে সেটাই ভাবতে লাগলো হতভম্ব হয়ে। ভাবতে ভাবতে কার্ডে লেখা ঠিকানাতেই সে যাবে মনস্থির করল। প্রথমে সে পাত্রীর পিতার ঠিকানাতেই যাবে বলে ঠিক করল। কারণ, তার মনে হচ্ছিল সেখানেই তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সে পাবে।
রাত্রি অনেক হয়ে গিয়েছিল, সমস্ত ট্রেন চলে গিয়েছিল। তাই অর্ক ঠিক করে রাতটা এই করিমপুর প্লাটফর্মেই কাটিয়ে পরের দিন খুব ভোরের ট্রেনে সে রওনা দেবে সেই ঠিকানার উদ্দেশ্য। সেইমত পরের দিন রাত পোহাতেই ভোর হতেই অর্ক তার গন্তব্যের উদ্দেশ্য রওনা দিল। খোঁজ করতে করতে সে যখন সেই বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল, তখন কিছু লোক তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখছিল। কারণ, অর্ক সেই এলাকাতে আগে কখনও যায়নি।
বাড়ির সামনে আসতেই এক ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেসা করলেন-"আপনি কি বরপক্ষের কেউ?" অর্ক উত্তর দিতে উদ্যত হলে সেই ভদ্রলোকটি অর্ককে থামিয়ে দিয়ে বলল-"দেখুন, এখানে একটু অসুবিধা হয়ে গেছে। গত পরশুদিন থেকে ভূপেনবাবু নিখোঁজ, তিনি পরশুদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন কিছু নিমন্ত্রণপত্র বিলি করতে আর বরপণের টাকা যোগাড় করতে। কিন্তু দুটি রাত পেরিয়ে গেল, আজও তিনি ফেরেননি। সেক্ষেত্রে বিয়েটা যে কী করে হবে, তা বুঝতে পারছি না"।
এই কথা শুনেই অর্ক সেই কালো ব্যাগটা তার দিকে এগিয়ে দিল এবং বলল, -" দেখুন তো, এই ব্যাগটি ভূপেনবাবুর ব্যাগ কিনা? টাকা-পয়সা যা ছিল, তা-ই-আছে। ব্যাগটি হাতে পেয়ে ভূপেনবাবুর বাড়ির সদস্যদের উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে অর্ক তার পূর্বদিনের ঘটনার কথা আর বলতে পারল না।
সে শুধু বলল, ভূপেনবাবু আমাকে পাঠিয়েছেন এটি দিয়ে। আর, বলেছেন যে বিয়েটা যেন সুষ্ঠভাবে হয়। উনি একটু বিশেষ কাজে আটকে পড়েছেন, তাই নিজে আসতে পারেননি। তিনি খুব শীঘ্রই বাড়িতে ফিরবেন"।
________________________________________
*নাম:- শুভ্রব্রত রায়
ঠিকানা:- গ্রাম + পোস্ট - মন্তেশ্বর
জেলা:- পূর্ব বর্ধমান
                   পিন:- ৭১৩১৪৫
মোবাইল নং:- ৬২৯৪৫২০৫৩৯
হোয়াটসঅ্যাপ নং:- ৭৪৭৭৬৬৮৮৩৫

অপেক্ষার অবসান-- সৌম্য পল্যে

অপেক্ষার অবসান 
সৌম্য পল্যে

বছর ৩ কয়েক আগে অপু তাঁর নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অনেক সময় একাকী ভাব তাকে যেন গ্রাস করে গিলে খেত। কারন সে পরিবারের এক মাত্র ছেলে ছিল,। অপুর বাবা - মা  এক দুর্ঘটনায় মারা যায়। অপু খরচ  একটি সংস্থা চালায়।  এখন সেই একাকী ভাবটা আর নেই কারণ, তার জীবনে এখন নতুন আলো রূপে লাবণ্যর আগমন ঘটেছে। লাবণ্যর সাথে পরিচয় কোচিং সেন্টারে। লাবণ্যকে প্রথমবার দেখেই অপু প্রেমে পড়ে যায়।সে বুঝতে পেরেছিল তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ, লাবণ্যই তার চিরসাথী হবার যোগ্য। অবশেষে সে তার প্রেম নিবেদন করতে প্রস্তুত হয়, কিন্তু লাবণ্যর সামনে গেলে কেন জানি না সে সবকিছু ভুলে যায়। অপুর খুব কাছের বন্ধু নীলিমা অপুর প্রেম নিবেদনটি লাবণ্যর কাছে তুলে ধরে। লাবণ্য পরিবারের কথা ভেবে প্রথমে না করলেও পরবর্তীকালে অপুর অতুলনীয় ভালোবাসা কাছে হারতে হয়, এবং সে অপুর প্রেমে সাড়া দেয়। এইভাবে তাদের ভালোবাসা এগিয়ে চলে। শীতের এক সকালে অপু লাবণ্য একসাথে কোচিং  সেন্টার যাবার জন্য বেরিয়ে ছিল। অপু স্টেশনে এসে পৌঁছে গেলেও লাবণ্য তখনও আসেনি। তাই অপু বহুদূরে অবস্থিত গলির দিকে তাকিয়ে বসে রইলো। প্রতিদিই লাবণ্য ওই গলি দিয়ে আসত। অবশেষে লাবণ্যর আগমণ ঘটল, অপুর যেন নয়ন স্থির হয়ে গেল লাবণ্যর সৌন্দর্যের টানে। অপুর মনে ধ্বনিত হতে লাগলো -
"আজ হারিয়েছে মন দাঁড়িয়ে গেছে দু-নয়ন,
অপরূপ সৌন্দর্যের টানে।
নয়নও চায়না সরিতে
রয়ে গেছে সে নয়নে নয়নে।"
লাবণ্য কুয়াশা ভেদ করে আসাটা যেন অপুর কাছে - "মেঘ ছেঁড়া রবির কিরণের মতন,
কুয়াশা ভেদী তাঁর আগমন" মনে হয়েছিল।
এরপর তারা একসাথে আসা-যাওয়া করত, কিছু দিন কেটে যাওয়ার পর লাবণ্যর বাড়িতে বিয়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু করে। লাবণ্য অশ্রু জড়ানো চোখে অপুর কাছে আসে আর সব কথা খুলে বলে। তখন ইতিমধ্যে অপু পড়াশোনা সঙ্গে সঙ্গে একটা দোকানে কাজ করে। অপু ভাবলো লাবণ্য পরিবারকে এখন না বোঝালে, তাঁরা লাবণ্য বিয়ে অন্য জায়গাতে দিয়ে দেবে। তাই সে আর দেরি না করে পরে দিনই লাবণ্যর বাড়ি যায় এবং লাবণ্য বাবা-মা তাদের বিষয়টা খুলে বলে। লাবণ্যর বাবা - মা পরবর্তীকালে তাদের সম্পর্কটা মেনে নেয় মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে। এইভাবেই অপুর একাকী জীবনের অবসান ঘটে।
                               " সমাপ্ত "


*নাম - সৌম্য পল্যে
ঠিকানা - 
গ্রাম /পোস্ট - রঘুদেববাটি
জেলা - হাওড়া
থানা- সাঁকরাইল
কলকাতা - 711310
ফোন নম্বর - ৯১২৩৯৮৬৭৩৯

মুক্তোর খোঁজে--শুভ্রা ভট্টাচার্য

মুক্তোর খোঁজে
শুভ্রা ভট্টাচার্য

"মিস, ও মিস, মিস" পঞ্চম শ্রেণীর গৌরব প্রার্থনা লাইনে প্রবেশের আগে ছুটে ছুটে আসছে আমার দিকে। বন্ধুবাৎসল দিদিমনি হিসাবে ছাত্রদের সাথে সখ্যতা একটু বেশী। বললাম "কি হলো রে, এতো হাঁপাচ্ছিস কেন?" "মিস,এক্ষুনি চলুন একটু স্কুলের বাইরে, স্কুলের পিছনের গেটের পাশে বাচ্চারা ডাস্টবিন থেকে নোংরা খাবার তুলে খাচ্ছে", কোনরকমে কথাগুলো শেষ করে আমার হাত ধরে সে টানতে থাকে। টিফিনের সময় ওকে নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখি শতছিন্ন জামা পরা দুটি ক্ষয়িষ্ণু চার পাঁচ বছরের বাচ্চা ডাস্টবিনের আবর্জনা নিয়ে খেলছে আপন মনে। হাতগুলো পরিষ্কার করে দিয়ে কিছু খাবার কিনে ওদের দিতেই নিষ্পাপ হাসিতে চারপাশ আলোকিত করে তুলল ওরা। আশেপাশে একটু খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ওদের মা রোজই খাবারের সন্ধানে চলে যায় একা ফেলে রেখে শিশুদুটিকে। অসহায় বাচ্চাদুটোর কথা ভেবে গৌরব কঁকিয়ে কেঁদে উঠে বললো "মিস, আমাদের স্কুলে তো কত্ত বড় জায়গা, ওদের সেখানে এনে রাখা যায় না এই সময়টা? আমার জন্মদিনের জমানো টাকা দিয়ে ওদের জন্য রোজ একটু করে খাবার কিনে এনে দেবো আমি?" একটা দশ বছরের ছাত্রের এমন গভীর মনুষ্যত্ব মমত্ববোধ আমাকে ভীষনভাবে মুগ্ধ করল। ভাবলাম নম্বর তো সবাই পায় কিন্তু এমন মানবিকতাবোধ কজনের গড়ে ওঠে! এমন মুক্তোর খোঁজই তো শিক্ষকতার জীবনকে সাফল্যমন্ডিত করে। হীরের টুকরো ছাত্রকে সস্নেহে কাছে টেনে নিয়ে বললাম," চিন্তা করিস না সোনা, ওদের জন্য নিশ্চিত কিছু করবো আমরা সকলে মিলে।।"
                  

*শুভ্রা ভট্টাচার্য (শিক্ষিকা)
বাবুগঞ্জ, শিবতলা
কে সি লেন
পোস্ট + জেলা : হুগলী
পিন - ৭১২১০৩
ফোন : ৯৮০৪৬৮৪৮১৮

মাটির টান--বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তী

মাটির টান
বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তী

ভুপেন হাজারিকার গান শোনো নাই,কি কথা আচে গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা।
আমি সব মায়েদের হাড়াইয়া এপারে শুখা ভাগীরথীর জলে নাইতেও যাইনা, খালি মনে পড়ে ঐ যমুনার কথা  স্থল নোয়াটায় দ্যাখা যমুনার কথা, কৈজুরীর হাট আমার শৈশবের খেলা করার গ্রাম সইদপুরের কথা, বাড়ির সামনে আমগাছ বেলগাছ তারপরে সারা জায়গা জুইরা চাষের জমি ধুধু করা মাঠ, ঐ অনেক দুরে দেখা যায় বুড়া কত্তার বাড়ি যাইতে হইলে বাড়িথ্যাইকা রাস্তায় যাইয়াই বাঞ্ছা কাকাদের বাড়ি ইস্কুল তিনুদাদু খুদুদাদু তাগো পুকুর, আমাগো সবার টিনের ছাওয়া কালি সিদ্ধেশ্বরী এনাদের ঘর, বরষায় ডুইবা যায় দুই মাস পর খালি বিচালির ঠাকুরগো কঙ্কাল  মনডা খারাপ হয়।
আবার পচ্চিম পাড়ায় জয়নাল চাচাদের পাড়া আরো কত্তো বাড়ি তাগো সব নাম মনে নাই, খালি বাবার লগে কথা কইতে আসত আর কিজানি তখন বুজিনাই পর বুজচি ভোটের লাইগা কথা কইতে আসত,  বরষায় নদী আর পরে বিলের ধারে যুবান আলী, ভোটে আমাগো বামুন বাড়ির মাইনষেরা কারে ভোট দিব জাইনতে আইসতো, জাইলারা নমশুদ্দুররা কার দিকে সেইডা জানতে আইসত।

আমার অতো কিছু মনে নাই খালি এইডা মনে আচে সরকি লাঠি বল্লম লইয়া একপাড়ার সক্কলে আরাক পাড়ায় আইসা মারামারি করতো, দ্যাখতে যাইতাম আবার কেউ জোর করইরা বাড়ি পাঠাইয়া দিত।

আর পুব পাড়ায় খালি সোমেশ চাচার বাড়ি ছাড়া আর দুইএকখান বাড়ি চেনা আছিল, আর সোমেশ চাচা আমাগো বাড়ির মানুষ, সেই বাবার খ্যাত চাষ করা  আমগাছের আম বিক্কির করা সবই সেই করত।

বরষায় বিলে যমুনার জল আইলে জল থ্যাইকা আইতে দেরি হইলে কত বকা মার খাইচি, বঁড়শি দিয়া মাছ ধরা নৌকায় বাবার লগে যাইয়া দোয়ারে কি মাছ ওঠে দেখা  নৌকায় এপাড়া ওপাড়া ঘোরাঘুরি কত্তো মজা হইত।
 বিলের জল অঘ্ঘান মাসে কইমা গ্যালে বাউত নাইমা মাছ ধরা আমরাও ধরতাম তবে কম, ঐসময় মাছ ধরার খুপচি আরো কতকি আমাগো আছিল না আর বাউত নামার পর মা কয়্যাকদিন কোনোখানে যাইতে দিত না, জিগাইলে কইত ওরা মাছ শুকায় না, ছোয়া লাইগলে কেডা তোমার কাপড় কাইচা দিবে।

বাবা স্থলের পাকরাশীগো বাড়িতে দুগ্গা পুজো করতে যাইতো, আমরা গেছিলাম বার দুই, মইশ বলি দ্যাখতে কোনোবারেই দ্যাখা হয় নাই যাওয়ার আগেই হইয়া যাইত কিন্তু সামনে দিয়া যমুনারে দেইখা ভয় পাইতাম আমাগো পাশের নদীতে জলের টান আর যমুনার জলের টান চখের পলক ফেইলতে না ফেইলতেই ঘুরনি হইয়া চইলা যায়।

আর দ্যাখতাম ওয়াগো মানে মোসোলমান পাড়ার কারো কিছু হইলে মায়ের কাচে আইসত, মা বাগানে ঘরের পেছনে থ্যাইকা কিসব গাছের পাতা  শিকড় আইনা কোনোডা এমনি আবার কোনডা বাইটা বড়ি কইরা দিতে।

আর শোমেশ চাচা কি মানুষ সেইডা কওয়া যায় না, বাবা যখন মির্জাপুর হাসপাতাল থ্যাইকা জবাব পাইয়া টাঙ্গাইলের দিদিমার বাড়িতে আইল ঐ চাচা তার গরু ধান আমাগো বাড়ির অনেক গাছ বিক্কির কইরা মাকে টাকা দিত, এমনকি বাবা চইলা গ্যালে এপারে আসার সময়  যখন পাকিস্তান হিন্দুস্থানের যুদ্ধু হইচিল সেই সময় আমাগো সব লইয়া টাকা কত কি দিছিল আমি জানিনা।

এপারে আইসাও অনেক দিন খালি মনে হইত এইডা আমাগো জায়গা না, কিছু মিল পাইতাম না আর সক্কলে বাঙাল বইলা কিছু কইত আর গালমন্দ করত, কইত তাগো সব নিতে আইছি, তোমরাই কওনা কারো কিছু কাইড়া নিচি নাকি।

হ্যাঁ চুয়ান্ন পঞ্চান্ন বছর হয়ে গেছে এখন আর কেউ বাঙাল বলে না, আমার  কথা, ভাষা আচরণ সবই পাল্টে গেছে স্ত্রী পুত্রদের নিয়ে চলছে, হয় তো আরেক পারে যাওয়ার ডাক আসবে, কিন্তু বলতে পারো কি আমার  নাড়ির টান কোথায় ওপার বাংলায় না  এপার বাংলায় বাঁধা আছে।

বিবেক--অনন্যা দাস


বিবেক
অনন্যা দাস 


লজ্জা থাকা দরকার, নির্লজ্জের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কি লাভ বলতে পারিস।আচ্ছা তোর কি একেবারের জন্য অনুশোচনা হয় না।আমি তোর মা এত খাঁটি তোর জন্য। তোর মা যে স্বপ্ন গুলো রাত জেগে বসে বসে দেখছে, সেগুলো কে পূরণ করবে হতচ্ছাড়া।
দেখ গিয়ে পাড়ার শ্যামলী মাধ্যমিকে ৯৪% পেয়েছে, জানিস ও মা কি করে মানুষের বাড়ি থালা বাসন ধোয়।আর তুই সারাদিন ঘর বদ্ধ করে কি করিস ঘরে,,ওই লেখালেখি, কি ভেবেছিস ও তোকে ভাত দেবে।না রে না।হপ্তায় সাত থেকে আট দিন টিউশনি কামাই, হ্যাঁরে টিউশন ফি কি মাগনায় আসে হতচ্ছাড়া। তোর ডায়েরি শেষে‌ আগুনে খাবে।জীবনে স্বার্থপরের পক্ষ নিতে শিখ। কম্পিটিশন কম্পিটিশন কম্পিটিশন, চারিদিকে শুধু কম্পিটিশন রে হতভাগা।
না না বাবা না, আমি এই সব কিছু হতে চাইনা বাবা,বাবা আমি বড়ো লেখক হতে চাই, বাবা আমি মানুষের মনুষ্যত্ব কে জাগিয়ে তুলতে চাই।বাবা আমি কোনো প্রতিয়োগিতায় অংশ নিতে চাই না বাবা।বাবা আমি বাঁচতে চাই।উড়তে চাই আকাশে।এই ভাবে তোমরা কম্পিটিশনের লোভ দেখিয়ে আমার ডানা দুটো ছেঁটে দিও না বাবা। বাবা রোজ অফিস থেকে ফিরে তুমি আমার কাছে পড়া নিয়ে বস, কাল থেকে ঠাম্মার জ্বর দেখা করতে যাও কি বাবা? ঠাম্মার প্রয়োজন শেষ তাই তুমি তাকে গুরুত্ব দাও না?
বলো না বাবা কেমন হবে আমিও যদি তোমায় এমন করি।
বলো না বাবা কেমন হবে আমি যদি স্বার্থ খুঁজে মরি।
ক্ষমা করো বাবা আমি অনেক দিন আগেই বড়ো হয়ে গেছি,স্বপ্নটা আমার,দায়িত্বটাও আমার।
 চিঠিটা পড়ে রবীন বাবুর চোখ দুটো জলে ভরে গেল।      

            (বিবেক)
          অনন্যা দাস

আমি মোবাইল হতে চাই--তপন তরফদার

আমি  মোবাইল  হতে চাই
তপন  তরফদার
 

 আমরা সবাই জানি শিশুদের চরিত্র গঠন মনোবল বাড়াতে হবে ওই কচি  বয়স থেকেই। ওই মহৎ উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখে ছোট বেলায় ওই রচনাটি লিখতে বলা হয়। প্রকারন্তে উৎসাহ দেওয়া হয় লিখতে। প্রথম থেকেই মনস্থির করে উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণের সাহায্য পেলে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে। সুনাগরিক, সুদক্ষ শিক্ষক হিসাবে আমাদের উচিত ভবিষ্যতের সমাজকে সুগঠিত ও পূর্ণ বিকশিত করতে শিশুদের অনুপ্ররেণা দেওয়া।
       আমাদের “হাসি-খুশি আবাসন” নিজস্ব উদ্যোগে দূর্গা পুজো, ছোটখাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আয়োজক আমাদের মিতালী ধর চৌধুরী বৌদি। উনার স্বামী কবে ঘরে থাকে কবে বাইরে থাকবে বৌদিও বলতে পারেনা। আমদানি রপ্তানির ব্যবসা। মিতালী বৌদির বছর দশেকের ছেলে ঋষিকে নিয়েই মহানন্দে থাকে এবং আবাসন সহ বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 
মিতালী বৌদির অনুপ্রেরণায় আবাসনের ও আশেপাশের কিছু  বাচ্চাদের নিয়ে পড়াশোনার আয়োজন করা হয়েছে। বাচ্চারা শতরঞ্জীতে বসে। আমি, মিতালী বৌদি শান্তিনিকেতনী মোড়ায় বসে। পড়ুয়াদের  আঁকতে বা লিখতে বলে আমারা গল্প করি। মিতালী বৌদির সঙ্গে গল্প করে আমি অক্সিজেন পাই। বৌদির শরীরের প্যারিসের সুগন্ধি আমাকে হিপনোটাইজ করে রাখে। আমি নয়ন সার্থক করি বৌদির সঙ্গী হয়ে।
আজকে লিখতে দেওয়া হয়েছে, “ তুমি কি হতে চাও।“ সবাই শান্ত হয়ে মনোযোগ দিয়ে লিখে যাচ্ছে। এখন শিশুরা তাদের বয়সের থেকে এগিয়ে চিন্তা ভাবনায় দক্ষ। সবাই গুছিয়েই লিখছে। আমরা শিশু  বয়সে চিন্তাই করতে পারতাম না সুইচ টিপে ধরলেই খেলনা গাড়ি চলতে থাকবে। আমরা হালকা টিনের পিস্তলে ছোট্ট টিপের মত লালরঙের মশলা ক্যাপ একটা বসিয়ে ট্রিগার টিপে একবারই আওয়াজ তুলতে পারতাম। এখন অটোমেটিক বন্দুকে অনবরত আওয়াজ উগলে দিতে পারে। আমর সৌভাগ্য মিতালী বৌদি আজকে প্রাণচঞ্চল, অকপটে আমার সঙ্গে গল্পগুজবে মত্ত।  ওরা যেমন লিখছে আমাদের ও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠলো, আমাদের কি হওয়ার স্বপন ছিল।
আমি অকপটে স্বীকার করে নিই, কোনো স্বপন দেখার ফুরসত ছিলনা। যে কোনো কাজে লেগে যেতে পারলেই জীবনের মোক্ষ পাওয়া।
মিতালী বৌদি উজাড় করে তার মনের কথা উগলে দিতে প্রস্তুত। মানুষের মনের উপর কোনো কোনো সময়ে কোন ভূত ঘাড়ে বসে যায় যার প্রভাবে সে বলে যায় পরে আপশোষ করে। মিতালী বৌদির একান্তই ইচ্ছে ছিল রূপোলি জগতে বিচরণ করবেন। ইচ্ছা পূরণ হয়নি। অল্পবয়সেই প্যাঁচে পড়েই গাঁটছড়া বাঁধতে বাধ্য হয়। বৌদির মনে খুবই দুঃখ। আমার পক্ষে যতটা সম্ভব ভালো ভালো কথা বলে উনাকে সান্ত্বনা দিই।
আজকে অনেকেই এসেছে। মনের আনন্দে যত্ন করেই ওরা লিখে  জমা দিয়ে পার্কেই খেলছে। আমারা দুজনে ভাগাভাগি করে খাতা দেখছি। অনেকেই লিখেছে বড়ো হয়ে ডাক্তার হবে, সমাজের সেবা করবে। বেশ কয়েকজন লিখেছে শচিন তেন্ডুলকার হয়ে দেশের নাম উজ্জল করবে। এরপরের খাতাটার লেখা দেখে চোখে চড়কগাছ। একজন লিখেছে, “আমি মোবাইল হবো।“ বুঝতে পারি এখন কার ছেলেমেয়েরা ইংরাজী শব্দকে জলভাতের মত ব্যবহার করে। “মোবাইল” যার অর্থ সচল। ছেলেটা সবসময় সচল হয়ে থাকবে অচল হবেনা।
ওর লেখাটা পড়ে চোখ কচলে, প্রশ্নপত্রে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারি আমাদের প্রশ্নটাই ভুল হয়ে গেছে। তুমি কি হতে চাও, আর বড়ো হয়ে তুমি কি হতে চাও এর ফারাক অনেক।  
“আমি মোবাইল হলেই ভালো হয়। মা-বাবা দুজনেই আমার থেকে মোবাইলকে বেশি ভালোবাসে। এক মিনিট ও কাছছাড়া করেনা। আমার খিদে পেলেও মা আজকাল খেয়াল করেনা। মোবাইলের খিদে না পেলেও “রিচার্জ” করে রাখে মোবাইলকে। মা-বাবা কত যত্ন করে মোবাইলকে। আমাকে আদর করতে ওরা সময়ই পায়না। আমি মোবাইল হলে সবকিছু  পাব।
লিখেছে মিতালী বৌদির ছেলে ঋক। ভেবে পাচ্ছিনা,বিষয়টি  বৌদির নজরে আনা ঠিক হবেকি।



*তপন  তরফদার

 প্রেমবাজার(আই আই টি) খড়্গপুর721306

ফোন  ও হোয়াটসঅ্যাপ 9434077490

Thursday, 27 January 2022

ভালোর সাথে মন্দ আসে-- রানা জামান




ভালোর সাথে মন্দ আসে

                      রানা জামান

কষ্টের অন্ত নেই শাহেদের। গায়ের রংটা বিচ্ছিরি রকমের কালো, নিগ্রোকেও হার মানায়! মুখে লাবণ্যর পরিবর্তে ওমপুরির মতো মুখভর্তি ছোট ছোট গর্ত; একটা চোখের মণি শাদা। ডান পা টেনে হাঁটে আর বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলটা অনেক খাটো। অমন দৈহিক ত্রুটি নিয়ে জন্মের জন্য ও দায়ি না থাকলেও সবাই প্রকারান্তরে ওকেই দোষারোপ করে!

অপরিচিত কেউ ওর দিকে তাকালে দ্রুত ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। অনেক ডাক্তারের সাথে আলোচনা করেও ওর খুঁতসমূহ প্লাস্টিক সার্জারি কিংবা অন্য কোনো কৃত্রিম পদ্বতি প্রয়োগ করে সারানোর বা বাইরে যাবার সময় ঢাকার কোনো উপায় পাওয়া যায় নি। কী বলে সান্ত্বনা দেবে মা-বাবা ওকে? মা-বাবা কিছু বললে শাহেদ উল্টো ওঁদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে। মা-বাবার কষ্টটা ও বুঝতে পারে না এবং মা-বাবা ওর কষ্ট বুঝতে পেরেও অসহায় অবস্থায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শুধু।

ছোটবেলায় এতো স্পর্শকাতর ছিলো না শাহেদ। সহপাঠীরা খোঁচা মেরে কথা বললেও তেমন গা করতো না।তবে একবার এক সহপাঠীকে মেরে মারাত্মক জখম করে ফেলেছিলো।সালিশে মা-বাবা ক্ষমা চেয়েও পার পান নি- স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছ। পরের স্কুলে ভর্তির আগে খুব করে বুঝিয়েছে যে, এমনটা ফের করলে ওকে আর কোনো স্কুলে ভর্তি করা যাবে না; তখন ওকে গণ্ডমূর্খ হয়েই থাকতে হবে। শারীরিক এই ত্রুটি থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো লেখাপড়া করে বড় বিদ্বান হওয়া। একমাত্র উচ্চশিক্ষাই পারে শারীরিক ত্রুটি ঢেকে দিতে; যেমন বার্ণার্ড শ ও স্টিভেন হকিং। এই দুই জনের ছবি দেখে ও জীবনী শোনার পর শাহেদ শান্ত হয়েছে।

কিন্তু কলেজে উঠার পর বয়স্ক ক্লাশমেটদের টিটকারি ওর পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়লো। তাই সে কলেজে যাওয়া বাদ দিয়েছে; বলা যায় লেখাপড়াই বাদ দিয়েছে। ছোটকালে বার্ণার্ড শ ও স্টিভেন হকিং-এর জীবনী সান্ত্বনা দিলেও এখন আর তা পারছে না। শাহেদ একা একা বনবাদাড়ে, কখনো বা নদীর পাড়ে ঘুরে বেড়ায়।

একদিন। শাহেদ প্যান্টের পকেটে ডান হাত ঢুকিয়ে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছে। পথিমধ্যে একটা সাপকে চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ভাবলো মরে আছে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সাপটাকে নড়তে দেখে এক লাফে সরে গেলো দূরে। সাপটা সোজা হয়ে ফণা তুলতে গিয়ে নেতিয়ে গেলো ফের। একটা কাঁটা দুই চোয়াল একত্রিত করে এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে আছে। মানে সাপটা আহত!

দুধকলা দিয়ে পুষলেও একদিন সাপ ছোবল মারেই। একে সুস্থ করলে কী করবে ও? ওর জীবনের এমনিতেই কী মূল্য আছে? এই অছিলায় মরে যেতে পারলে জীবনের সমাপ্তি হবে সহজেই। এটাই দরকার ওর!

শাহেদ সাপের মাথার কাছে বসে হাত রাখলো মাথায়। এক টানে বের করে ফেললো কাঁটাটা। একটা সজারুর কাঁটা!

কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে সাপটা সোজা হয়ে একবার ফোঁস করে মাথা নোয়ালো। শাহেদ অবাক হলো সাপের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে। সাপটা খোলস ছেড়ে ইশারায় ওকে বললো খোলসটা গায়ে জড়াতে।

শাহেদ ভাবলো: যার জীবনের কোনো মূল্য নেই, সে সাপ হয়ে গেলে ক্ষতি কী!

শাহেদ সাপের খোলসটা জড়িয়ে দেখলো সাপটা নেই! ও টের পাচ্ছে কেমন যেনো পরিবর্তন হচ্ছে শরীরে। বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলটা বেড়ে ডান হাতের অনামিকা আঙ্গুলের সমান হয়ে গেলে সাপের খোলসটা ঝরে পড়লো ওর গা থেকে। আর কী পরিবর্তন হলো ওর শরীরে? হাতে তাকিয়ে বেশ অবাক: গায়ের রংটা মিশকালো থেকে আস্তে আস্তে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ হয়ে গেলো! মুখের কিছু হয়েছে কি?মুখে হাত দিলো শাহেদ। মুখের গর্তগুলো নেই!

অত্যন্ত খুশি মনে শাহেদ ফিরে এলো বাড়িতে। কলিংবেল টেপার পর দরজা খুললে মাকে খুশির খবরটা বলতে চাইলে গলা দিয়ে স্বর বের হলো না ওর!

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...