একটি রহস্যময় ঘটনা
শুভ্রব্রত রায়
একদিন একটি রাত্রিতে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। কারণ সেই সময় ছিল বর্ষাকাল। সারাদিন প্রবল বৃষ্টির হওয়ার পর যখন খানিকটা বৃষ্টির পরিমাণ ও ঝড় হাওয়ার দাপট কমল, তখন প্লাটফর্মে একটাও লোক নেই। প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক শুনশান। অর্ক বলে একটি ছেলে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে বাড়ি ফিরবে বলে। কারণ তার বাড়ি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে। কিন্তু ট্রেন আসতে অনেক দেরী, তাই অর্ক প্লাটফর্মের একটি বেঞ্চে পা তুলে বসল, রাত্রি তখন প্রায় ঘড়ির কাঁটায় আটটা বাজে। তখন সে ভাবলো এই ঠান্ডা আবহাওয়াতে একটু চা পেলে ভালোই হতো, কথাটা ভাবা মাত্রই দেখল সে-খানিকটা দূরে একটি লোক চায়ের কাপ ও কেটলী হাতে সামনের দিকে এগিয়ে আসছ। তৎক্ষণাৎ অর্ক হাত নেড়ে লোকটিকে ডাকল। অর্ক বলল এক কাপ চা দিন। লোকটি বলল চা নেই বাবু কফি আছে। অর্ক শুনে মনে মনে বেশ খুশি হয়ে ভাবলো "আরও ভালো"। এই ভেবে সে এক কাপ কফি কিনে খেতে লাগলো আর প্লাটফর্মেই পায়চারি করতে লাগলো।
হঠাৎ খানিকটা দূরে তার দৃষ্টি পড়ল, সেখানে একটা একটা কী যেন একটা পড়ে আছে। দূর থেকে বিদ্যুতের আলোতে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তাই অর্ক একটু এগিয়ে গেল সেই দিকে। আর দেখল একটি মানুষ পড়ে আছে রেল লাইনের ধারে। সে ভাবল লোকটি হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে বা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে রয়েছে। তখন প্রায় রাত্রি নটা বাজে।
ঠিক আর একটু বাদেই রাত্রি সাড়ে নটা নাগাদ ট্রেন আসবে। তাই অঘটনের আশঙ্কায় তার বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাই তাকে সেই রেল লাইন থেকে তোলার জন্য অনেক ডাকাডাকি করতে লাগলো। কিন্তু অর্ক লোকটির কোনো সাড়া পেলনা, সাড়া না পেয়ে লোকটির ডান হাতটি ধরে সজোরে হ্যাঁচকা টান দিল। এ কী! বরফের মতো ঠান্ডা তার হাত। কিন্তু তার শরীরের পোশাকটা তো ভদ্রলোকদের মতোই মনে হচ্ছে। আর একটি জিনিস তাকে অবাক করে দিল। লোকটির ডান হাতের তর্জনী যেন লাইনের পাশের ঝোপের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। সে অনেক চেষ্টা করে লোকটির দুটি পা টেনে তাকে লাইনের বাইরে নিয়ে এল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! তার তার ডান হাতের তর্জনী সেই ঝোপের দিকেই রয়েছে।
সে তখন কৌতূহলবশতঃ সেই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল। পায়ে করে ঝোপগুলি সরাতেই তার চোখে পড়ল একটি কালো ব্যাগ। সে আরও কৌতুহল হয়ে পড়ল ব্যাগটি তাড়াতাড়ি খোলার জন্য। ব্যাগটি খুলে সে দেখল পাঁচ লক্ষ টাকা। অর্ক তখন ভাবতে লাগলো এত টাকা নিয়ে লোকটি কোথায় যাচ্ছিল? তার পরিচয়টাই বা কী? এইভাবেই সে ব্যাগটি আরও ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখল কয়েকটি বিবাহের কার্ড রয়েছে। তাতে পাত্র-পাত্রীর পিতা ও মাতার নাম লেখা। তবে কী লোকটির ছেলের বা মেয়ের বিবাহ? সে কৌতূহল হয়ে কার্ডটি পড়ল এবং ঠিক করল সব জেনে লোকটিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। এই ভেবেই অর্ক যেই পিছনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে লোকটিকে দেখার জন্য যেখানে তাকে সে রেখেছিল। কিন্তু কোথায় কী? কেউ তো নেই! তন্ন তন্ন করে অর্ক খুঁজল চারপাশ। কিন্তু জরাজীর্ণ লোকটিকে কোথাও দেখা গেল না।
এখন সে কী করবে সেটাই ভাবতে লাগলো হতভম্ব হয়ে। ভাবতে ভাবতে কার্ডে লেখা ঠিকানাতেই সে যাবে মনস্থির করল। প্রথমে সে পাত্রীর পিতার ঠিকানাতেই যাবে বলে ঠিক করল। কারণ, তার মনে হচ্ছিল সেখানেই তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সে পাবে।
রাত্রি অনেক হয়ে গিয়েছিল, সমস্ত ট্রেন চলে গিয়েছিল। তাই অর্ক ঠিক করে রাতটা এই করিমপুর প্লাটফর্মেই কাটিয়ে পরের দিন খুব ভোরের ট্রেনে সে রওনা দেবে সেই ঠিকানার উদ্দেশ্য। সেইমত পরের দিন রাত পোহাতেই ভোর হতেই অর্ক তার গন্তব্যের উদ্দেশ্য রওনা দিল। খোঁজ করতে করতে সে যখন সেই বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল, তখন কিছু লোক তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দেখছিল। কারণ, অর্ক সেই এলাকাতে আগে কখনও যায়নি।
বাড়ির সামনে আসতেই এক ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেসা করলেন-"আপনি কি বরপক্ষের কেউ?" অর্ক উত্তর দিতে উদ্যত হলে সেই ভদ্রলোকটি অর্ককে থামিয়ে দিয়ে বলল-"দেখুন, এখানে একটু অসুবিধা হয়ে গেছে। গত পরশুদিন থেকে ভূপেনবাবু নিখোঁজ, তিনি পরশুদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলেন কিছু নিমন্ত্রণপত্র বিলি করতে আর বরপণের টাকা যোগাড় করতে। কিন্তু দুটি রাত পেরিয়ে গেল, আজও তিনি ফেরেননি। সেক্ষেত্রে বিয়েটা যে কী করে হবে, তা বুঝতে পারছি না"।
এই কথা শুনেই অর্ক সেই কালো ব্যাগটা তার দিকে এগিয়ে দিল এবং বলল, -" দেখুন তো, এই ব্যাগটি ভূপেনবাবুর ব্যাগ কিনা? টাকা-পয়সা যা ছিল, তা-ই-আছে। ব্যাগটি হাতে পেয়ে ভূপেনবাবুর বাড়ির সদস্যদের উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে অর্ক তার পূর্বদিনের ঘটনার কথা আর বলতে পারল না।
সে শুধু বলল, ভূপেনবাবু আমাকে পাঠিয়েছেন এটি দিয়ে। আর, বলেছেন যে বিয়েটা যেন সুষ্ঠভাবে হয়। উনি একটু বিশেষ কাজে আটকে পড়েছেন, তাই নিজে আসতে পারেননি। তিনি খুব শীঘ্রই বাড়িতে ফিরবেন"।
________________________________________
*নাম:- শুভ্রব্রত রায়
ঠিকানা:- গ্রাম + পোস্ট - মন্তেশ্বর
জেলা:- পূর্ব বর্ধমান
পিন:- ৭১৩১৪৫
মোবাইল নং:- ৬২৯৪৫২০৫৩৯
হোয়াটসঅ্যাপ নং:- ৭৪৭৭৬৬৮৮৩৫
No comments:
Post a Comment