Monday, 31 January 2022

মাটির টান--বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তী

মাটির টান
বিভূতি ভূষণ চক্রবর্তী

ভুপেন হাজারিকার গান শোনো নাই,কি কথা আচে গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা আমার দুই চোখে দুই জলের ধারা মেঘনা যমুনা।
আমি সব মায়েদের হাড়াইয়া এপারে শুখা ভাগীরথীর জলে নাইতেও যাইনা, খালি মনে পড়ে ঐ যমুনার কথা  স্থল নোয়াটায় দ্যাখা যমুনার কথা, কৈজুরীর হাট আমার শৈশবের খেলা করার গ্রাম সইদপুরের কথা, বাড়ির সামনে আমগাছ বেলগাছ তারপরে সারা জায়গা জুইরা চাষের জমি ধুধু করা মাঠ, ঐ অনেক দুরে দেখা যায় বুড়া কত্তার বাড়ি যাইতে হইলে বাড়িথ্যাইকা রাস্তায় যাইয়াই বাঞ্ছা কাকাদের বাড়ি ইস্কুল তিনুদাদু খুদুদাদু তাগো পুকুর, আমাগো সবার টিনের ছাওয়া কালি সিদ্ধেশ্বরী এনাদের ঘর, বরষায় ডুইবা যায় দুই মাস পর খালি বিচালির ঠাকুরগো কঙ্কাল  মনডা খারাপ হয়।
আবার পচ্চিম পাড়ায় জয়নাল চাচাদের পাড়া আরো কত্তো বাড়ি তাগো সব নাম মনে নাই, খালি বাবার লগে কথা কইতে আসত আর কিজানি তখন বুজিনাই পর বুজচি ভোটের লাইগা কথা কইতে আসত,  বরষায় নদী আর পরে বিলের ধারে যুবান আলী, ভোটে আমাগো বামুন বাড়ির মাইনষেরা কারে ভোট দিব জাইনতে আইসতো, জাইলারা নমশুদ্দুররা কার দিকে সেইডা জানতে আইসত।

আমার অতো কিছু মনে নাই খালি এইডা মনে আচে সরকি লাঠি বল্লম লইয়া একপাড়ার সক্কলে আরাক পাড়ায় আইসা মারামারি করতো, দ্যাখতে যাইতাম আবার কেউ জোর করইরা বাড়ি পাঠাইয়া দিত।

আর পুব পাড়ায় খালি সোমেশ চাচার বাড়ি ছাড়া আর দুইএকখান বাড়ি চেনা আছিল, আর সোমেশ চাচা আমাগো বাড়ির মানুষ, সেই বাবার খ্যাত চাষ করা  আমগাছের আম বিক্কির করা সবই সেই করত।

বরষায় বিলে যমুনার জল আইলে জল থ্যাইকা আইতে দেরি হইলে কত বকা মার খাইচি, বঁড়শি দিয়া মাছ ধরা নৌকায় বাবার লগে যাইয়া দোয়ারে কি মাছ ওঠে দেখা  নৌকায় এপাড়া ওপাড়া ঘোরাঘুরি কত্তো মজা হইত।
 বিলের জল অঘ্ঘান মাসে কইমা গ্যালে বাউত নাইমা মাছ ধরা আমরাও ধরতাম তবে কম, ঐসময় মাছ ধরার খুপচি আরো কতকি আমাগো আছিল না আর বাউত নামার পর মা কয়্যাকদিন কোনোখানে যাইতে দিত না, জিগাইলে কইত ওরা মাছ শুকায় না, ছোয়া লাইগলে কেডা তোমার কাপড় কাইচা দিবে।

বাবা স্থলের পাকরাশীগো বাড়িতে দুগ্গা পুজো করতে যাইতো, আমরা গেছিলাম বার দুই, মইশ বলি দ্যাখতে কোনোবারেই দ্যাখা হয় নাই যাওয়ার আগেই হইয়া যাইত কিন্তু সামনে দিয়া যমুনারে দেইখা ভয় পাইতাম আমাগো পাশের নদীতে জলের টান আর যমুনার জলের টান চখের পলক ফেইলতে না ফেইলতেই ঘুরনি হইয়া চইলা যায়।

আর দ্যাখতাম ওয়াগো মানে মোসোলমান পাড়ার কারো কিছু হইলে মায়ের কাচে আইসত, মা বাগানে ঘরের পেছনে থ্যাইকা কিসব গাছের পাতা  শিকড় আইনা কোনোডা এমনি আবার কোনডা বাইটা বড়ি কইরা দিতে।

আর শোমেশ চাচা কি মানুষ সেইডা কওয়া যায় না, বাবা যখন মির্জাপুর হাসপাতাল থ্যাইকা জবাব পাইয়া টাঙ্গাইলের দিদিমার বাড়িতে আইল ঐ চাচা তার গরু ধান আমাগো বাড়ির অনেক গাছ বিক্কির কইরা মাকে টাকা দিত, এমনকি বাবা চইলা গ্যালে এপারে আসার সময়  যখন পাকিস্তান হিন্দুস্থানের যুদ্ধু হইচিল সেই সময় আমাগো সব লইয়া টাকা কত কি দিছিল আমি জানিনা।

এপারে আইসাও অনেক দিন খালি মনে হইত এইডা আমাগো জায়গা না, কিছু মিল পাইতাম না আর সক্কলে বাঙাল বইলা কিছু কইত আর গালমন্দ করত, কইত তাগো সব নিতে আইছি, তোমরাই কওনা কারো কিছু কাইড়া নিচি নাকি।

হ্যাঁ চুয়ান্ন পঞ্চান্ন বছর হয়ে গেছে এখন আর কেউ বাঙাল বলে না, আমার  কথা, ভাষা আচরণ সবই পাল্টে গেছে স্ত্রী পুত্রদের নিয়ে চলছে, হয় তো আরেক পারে যাওয়ার ডাক আসবে, কিন্তু বলতে পারো কি আমার  নাড়ির টান কোথায় ওপার বাংলায় না  এপার বাংলায় বাঁধা আছে।

No comments:

Post a Comment

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...