আমি মোবাইল হতে চাই
তপন তরফদার
আমরা সবাই জানি শিশুদের চরিত্র গঠন মনোবল বাড়াতে হবে ওই কচি বয়স থেকেই। ওই মহৎ উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখে ছোট বেলায় ওই রচনাটি লিখতে বলা হয়। প্রকারন্তে উৎসাহ দেওয়া হয় লিখতে। প্রথম থেকেই মনস্থির করে উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণের সাহায্য পেলে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে। সুনাগরিক, সুদক্ষ শিক্ষক হিসাবে আমাদের উচিত ভবিষ্যতের সমাজকে সুগঠিত ও পূর্ণ বিকশিত করতে শিশুদের অনুপ্ররেণা দেওয়া।
আমাদের “হাসি-খুশি আবাসন” নিজস্ব উদ্যোগে দূর্গা পুজো, ছোটখাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আয়োজক আমাদের মিতালী ধর চৌধুরী বৌদি। উনার স্বামী কবে ঘরে থাকে কবে বাইরে থাকবে বৌদিও বলতে পারেনা। আমদানি রপ্তানির ব্যবসা। মিতালী বৌদির বছর দশেকের ছেলে ঋষিকে নিয়েই মহানন্দে থাকে এবং আবাসন সহ বিভিন্ন ক্লাবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মিতালী বৌদির অনুপ্রেরণায় আবাসনের ও আশেপাশের কিছু বাচ্চাদের নিয়ে পড়াশোনার আয়োজন করা হয়েছে। বাচ্চারা শতরঞ্জীতে বসে। আমি, মিতালী বৌদি শান্তিনিকেতনী মোড়ায় বসে। পড়ুয়াদের আঁকতে বা লিখতে বলে আমারা গল্প করি। মিতালী বৌদির সঙ্গে গল্প করে আমি অক্সিজেন পাই। বৌদির শরীরের প্যারিসের সুগন্ধি আমাকে হিপনোটাইজ করে রাখে। আমি নয়ন সার্থক করি বৌদির সঙ্গী হয়ে।
আজকে লিখতে দেওয়া হয়েছে, “ তুমি কি হতে চাও।“ সবাই শান্ত হয়ে মনোযোগ দিয়ে লিখে যাচ্ছে। এখন শিশুরা তাদের বয়সের থেকে এগিয়ে চিন্তা ভাবনায় দক্ষ। সবাই গুছিয়েই লিখছে। আমরা শিশু বয়সে চিন্তাই করতে পারতাম না সুইচ টিপে ধরলেই খেলনা গাড়ি চলতে থাকবে। আমরা হালকা টিনের পিস্তলে ছোট্ট টিপের মত লালরঙের মশলা ক্যাপ একটা বসিয়ে ট্রিগার টিপে একবারই আওয়াজ তুলতে পারতাম। এখন অটোমেটিক বন্দুকে অনবরত আওয়াজ উগলে দিতে পারে। আমর সৌভাগ্য মিতালী বৌদি আজকে প্রাণচঞ্চল, অকপটে আমার সঙ্গে গল্পগুজবে মত্ত। ওরা যেমন লিখছে আমাদের ও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠলো, আমাদের কি হওয়ার স্বপন ছিল।
আমি অকপটে স্বীকার করে নিই, কোনো স্বপন দেখার ফুরসত ছিলনা। যে কোনো কাজে লেগে যেতে পারলেই জীবনের মোক্ষ পাওয়া।
মিতালী বৌদি উজাড় করে তার মনের কথা উগলে দিতে প্রস্তুত। মানুষের মনের উপর কোনো কোনো সময়ে কোন ভূত ঘাড়ে বসে যায় যার প্রভাবে সে বলে যায় পরে আপশোষ করে। মিতালী বৌদির একান্তই ইচ্ছে ছিল রূপোলি জগতে বিচরণ করবেন। ইচ্ছা পূরণ হয়নি। অল্পবয়সেই প্যাঁচে পড়েই গাঁটছড়া বাঁধতে বাধ্য হয়। বৌদির মনে খুবই দুঃখ। আমার পক্ষে যতটা সম্ভব ভালো ভালো কথা বলে উনাকে সান্ত্বনা দিই।
আজকে অনেকেই এসেছে। মনের আনন্দে যত্ন করেই ওরা লিখে জমা দিয়ে পার্কেই খেলছে। আমারা দুজনে ভাগাভাগি করে খাতা দেখছি। অনেকেই লিখেছে বড়ো হয়ে ডাক্তার হবে, সমাজের সেবা করবে। বেশ কয়েকজন লিখেছে শচিন তেন্ডুলকার হয়ে দেশের নাম উজ্জল করবে। এরপরের খাতাটার লেখা দেখে চোখে চড়কগাছ। একজন লিখেছে, “আমি মোবাইল হবো।“ বুঝতে পারি এখন কার ছেলেমেয়েরা ইংরাজী শব্দকে জলভাতের মত ব্যবহার করে। “মোবাইল” যার অর্থ সচল। ছেলেটা সবসময় সচল হয়ে থাকবে অচল হবেনা।
ওর লেখাটা পড়ে চোখ কচলে, প্রশ্নপত্রে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারি আমাদের প্রশ্নটাই ভুল হয়ে গেছে। তুমি কি হতে চাও, আর বড়ো হয়ে তুমি কি হতে চাও এর ফারাক অনেক।
“আমি মোবাইল হলেই ভালো হয়। মা-বাবা দুজনেই আমার থেকে মোবাইলকে বেশি ভালোবাসে। এক মিনিট ও কাছছাড়া করেনা। আমার খিদে পেলেও মা আজকাল খেয়াল করেনা। মোবাইলের খিদে না পেলেও “রিচার্জ” করে রাখে মোবাইলকে। মা-বাবা কত যত্ন করে মোবাইলকে। আমাকে আদর করতে ওরা সময়ই পায়না। আমি মোবাইল হলে সবকিছু পাব।
লিখেছে মিতালী বৌদির ছেলে ঋক। ভেবে পাচ্ছিনা,বিষয়টি বৌদির নজরে আনা ঠিক হবেকি।
*তপন তরফদার
প্রেমবাজার(আই আই টি) খড়্গপুর721306
ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ 9434077490
No comments:
Post a Comment