ঘড়িওলার নেশা
-অরুণ চট্টোপাধ্যায়
বাজারে আজকাল কোনও খাঁটি জিনিস আর পাওয়া যায় না। চারিদিকে শুধু ভেজাল। সর্ষের তেলে শিয়াল কাঁটা নিয়ে এককালে খুব হৈ হৈ হয়েছিল। আজকাল সব কিছুতেই ভেজাল। দুধে ভেজাল। কি একটা কেমিক্যাল জলে মিশিয়ে নাকি নকল দুধ হয়। বাসি মাছ কেমিক্যাল দিয়ে ঝকঝকে টাটকা করা হয়। মাংসতেও নাকি ভেজাল। ভাগাড়ের মাংস নিয়ে কি হৈ হৈ টাই না জানি হল। আনাজপাতি, শাক-সব্জি, ফল কীসে আর ভেজাল নেই? বোতলে বোতলে পরিশুদ্ধ জল বিক্রি হচ্ছে সেও নাকি ভেজাল। নামি ব্র্যান্ডের বোতলে বিক্রি হচ্ছে বেনামি কোম্পানীর পানীয় জল।
--আমাদের ছেলেবেলায় এমন ভেজাল ছিল না বাপু। সব একেবারে টাটকা টাটকা। এক খদ্দের বিশ্বরূপবাবু খুব বুক বাজিয়ে গলা উঁচু করে বলে গেলেন।
কথাটা ভাবিয়ে তুলল বিকাশকে। চা বিক্রি ছেড়ে দিয়ে সে এখন ঘড়ি সারানো ধরেছে। তাতেও তেমন লাভ হচ্ছে না। আজকাল একটা স্মার্ট ফোনে নাকি ঘড়িরও চাহিদা মেটে। তাই ঘড়ি পরার লোক আর তেমন জোটে না। সারানো তো দূরের কথা।
বিকাশের মাথায় চিন্তার পরে চিন্তা আসে। সে বিজ্ঞানী নয়। নয় অর্থনীতিবিদ বা সমাজতাত্ত্বিক। কিন্তু মনে সমাজের উন্নতির গভীর চিন্তা। এই ভেজাল দূর করতেই হবে। আবার আনতে হবে খাঁটির যুগকে। খাঁটি দুধ, খাঁটি মাছ-মাংস, রঙ না করা টাটকা সবজি। আর খাঁটি মানুষ।
আজকাল ঘড়ি সারানোর তেমন লোক নেই। ঘড়িও সব ডিজিট্যাল। কাজ নেই কম্ম নেই। কথায় বলে অলস মস্তিষ্ক নাকি—যাক গে যাক। তার মাথায় শুধু চিন্তা আগের সেই নির্ভেজাল দিনগুলোকে কি করে ফিরিয়ে আনা যায়। আচ্ছা, যত দিন যায় তত সময় বয়ে যায়। এই সময় বয়ে যাওয়ার সূচনা করে কে? ঘড়ির কাঁটা বাঁদিক থেকে ডানদিকে ঘুরে যায় বলেই তো?
হুররে, পেয়েছে বিকাশ পেয়েছে। একটা পুরোন জং ধরা ঘড়ি পড়ে ছিল। একজন গত বছর দিয়েছিল বিকাশের কাছে। তারপর বোধহয় দুই তরফেই ভুলে গেছে। রিস্টে হাতঘড়ির বদলে হাতে সে এখন ঝকঝকে স্মার্ট ফোন নিয়ে যাতায়াত করে। সময় দেখার কায়দাও সে খুব স্মার্ট করে নিয়েছে। আগের মত সময় দেখার প্রয়োজনও আজকাল কারোর তেমন হয় না বললেই চলে। সকলের হাতেই তো একটা করে স্মার্ট ফোন।
সেই ঘড়িটা নিয়ে আজ পরীক্ষা করার ইচ্ছে পেয়ে বসল বিকাশকে। ঘড়ির কাঁটাগুলো একটু জং পড়ে গেছে। তেল দিয়েও হচ্ছে না। একটু চেপেচুপে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিল। প্রথমটা একটু বেগ দিলেও পরে ঘুরতে লাগল। মানে ডানদিক থেকে বাঁদিকে। তেলে পিছলে গিয়ে একেবারে হুড়হুড় করে ঘুরেই যাচ্ছে।
চোখের সামনের জগতটা কেমন পালটে যাচ্ছে বিকাশের। আধুনিক ভেজাল যুগ পালটে গিয়ে বিশ্বরূপবাবুর ছেলেবেলার নির্ভেজাল যুগ। কি সুন্দর! চাল খাঁটি, ডাল খাঁটি, সব্জি-আনাজ-ফল-ফুল, জল, দুধ সব খাঁটি। আর মানুষগুলোও খাঁটি।
যুগ পাল্টেছে। মানুষের পোশাক, হাবভাব, স্বভাব, শিক্ষাদীক্ষা সব কিছু। সনাতন সুন্দর এক ভারত। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে আর ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে উলুখড়ের প্রাণ যাচ্ছে। আকাশে বাতাসে একটা বীরত্ব অথচ পবিত্রতা।
খুব ভাল লাগছে বিকাশের। এ এক সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কার। আরে, এ তো টাইম মেশিন। তাহলে টাইম মেশিন কি বিকাশের কোনও পূর্বপুরুষ আবিষ্কার করেছিল? এ নিয়ে ভাবতে বসার টাইমও নেই তার হাতে। আছে শুধু নেশার তাড়না।
সেই তাড়নায় সে কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। এই যা সব আলো নিভে গিয়ে অন্ধকার চলে এল কেন? আর অন্ধকার বাড়ছে তো বাড়ছেই। তবে কি ইতিহাসের অনেক পেছনে চলে যাচ্ছে বিকাশ? হায় রে ঘড়ির কাঁটা যে আর থামে না।
[শব্দঃ ৪৯২]
*সংক্ষিপ্ত জীবনী
-অরুণ চট্টোপাধ্যায়
জন্মঃ ১৯৫৩ শ্রীরামপুরের মাহেশে। বর্তমানে বৈদ্যবাটী নিবাসী।
শিক্ষাঃ রসায়ন ও চিকিৎসা।
পেশাঃ অবসরপ্রাপ্ত।
নেশাঃ সাহিত্য রচনা, ভ্রমণ, মাল্টিমিডিয়ার কাজ, ফোটোগ্রাফি।
সাহিত্য রচনাঃ ছোটদের গল্প, কবিতা, ছড়া, নাটক, প্রবন্ধ, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, কল্পবিজ্ঞান, ভূতের গল্প, উপন্যাস প্রভৃতি। বড়দের গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, চিকিৎসার প্রবন্ধ, কল্পবিজ্ঞানের গল্প ও উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, গোয়েন্দা গল্প ও উপন্যাস প্রভৃতি।
পত্রিকাঃ আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর ভারতী, কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞান, পথের সুজন, ছোটদের রূপকথা, ছোটদের কলরব, সঞ্চিতা, টুকলু, পালক, এক মুঠো খোলা আকাশ, কিশোর বার্তা, খুশির হাওয়া, দুষ্টু, অপরাজিত, আনন্দকানন প্রভৃতি।
সাপ্তাহিক বর্তমান, কথাসাহিত্য, রেওয়া, উত্তরের সারাদিন, সারাক্ষণ, শারদ অর্ঘ, অপরাজিত, বইসই, চৌরঙ্গী, কাগজের সন্দেশ, খড়কুটো, খোয়াই, কবিতা ক্লাব, করোনাকাল, কথা, সাসপেন্স বার্ষিকী, অসময়, পারক, প্রাচ্যদর্পণ, সাঁকো পত্রিকা, সপ্তপর্ণ, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী, সায়েন্টিফিলিয়া, অলীকপাতা, বইসই, দুর্নিবার, জলতরঙ্গ, হৃৎস্পন্দন, কথা কাহিনী, নবপ্রভাত, অঙ্কুর, আড্ডা নিউ জার্সি প্রভৃতি।
প্রকাশিত বইঃ আবর্তন(বড়দের গল্প), আলোর ঠিকানা(বড়দের উপন্যাস), অর্ধাঙ্গিনী(বড়দের উপন্যাস), বন্ধ দরজার ওপয়ারে(বড়দের উপন্যাস)।
Dr. ARUN CHATTOPADHYAY
181/44 G.T.ROAD (GANTIR BAGAN)
P.O. BAIDYABATI
DIST. HOOGHLY (PIN 712222)
W.B.
MOB. 8017413028
EMAIL. chattopadhyayarun@gmail.com
No comments:
Post a Comment