Monday, 31 January 2022

পাথরের চোখ --শংকর ব্রহ্ম

পাথরের চোখ
শংকর ব্রহ্ম

লোকটা আমাদের দপ্তরেই চাকরী করত।
মাস কয়েক আগে জয়েন করেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কারও সঙ্গে মিশত না, কথা বলত না। কারও সাতে পাঁচে থাকত না। একা একা ক্যান্টিনে গিয়ে টিফিন করত। তার সম্পর্কে মেয়েদের কৌতূহল ছিল অপার।
আমরা অফিসে পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কত কথা বলতাম, রাজনীতি,খেলা,সিনেমা, বইমেলা নিয়ে আলোচনা করতাম। সে থাকত নীরব।
যতবার তার চোখের দিকে তাকিয়েছি,দেখছি
পাথরের চোখ, ভাষাহীন।
মেয়ে মহলে তার প্রসঙ্গ উঠলে, বুদ্বুদের মতো উঠেই মিলিয়ে যেত। কারণ কেউ তার সম্পর্কে বেশী কিছু বলতে পারত না।
কখনো সখনো সে আমার হাতের বই বা পত্রিকা চেয়ে নিয়ে পড়ত। কিন্ত তার সম্পর্কে কখনও কোন মন্তব্য করত না।
তাকে দেখে আমার মনে হত, গোবেচারা স্বভাবের ভাবলেশহীন মানুষ এক। যার আমাদের কারও  সম্পর্কে কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই ।
অফিস ক্যান্টিনে ভেঙে নতুন করে গড়া হচ্ছে।
অনেকেই নিজের টেবিলে চা আনিয়ে খাচ্ছে।
কেউ কেউ ভাঙা ক্যান্টিনের আসে পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। লোকটিও একপাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। কিছু দূরে দাড়িয়ে আমি, একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে, হাতের পত্রিকাটা খুলে দেখছি। চা খেতে খেতে সে ওই পত্রিকাটি একবার দেখতে চাইল আমার কাছে। দিলাম। হাতে নিয়ে নববিবাহিতদের পাতায় একটি ছবি দেখে, তার হাত থেকে চায়ের কাপটি পড়ে গেল।
সেও ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। আমরা হৈ চৈ করে তাকে তুলে এনে অফিসে পাখার নীচে এনে শোয়ালাম। চোখে জলের ঝাপটা দিতে, কিছুক্ষণ পরে তার জ্ঞান ফিরে এলো। সে উঠে বসলো। আমরা বললাম,আপনার শরীর ভাল নেই, আপনি আজ বাড়ি চলে যান।
- ঐ পত্রিকাটি একটু নেবো?
-নিন
- ওর থেকে একটা ছবি কেটে নেবো?
- কেটে নিন।
পত্রিকটাই নিয়ে যান বাড়ি।
সে পত্রিকাটি নিয়ে চলে গেল সেদিন।

পরের দিন সে আর অফিসে আসেনি। তারপর দিনও না। মাসখানেক পরে শুনলাম,তিনি চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন।
তার কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। জীবনে কত লোকের সঙ্গে আলাপ,পরিচয়,হৃদ্যতা হয়, কিন্তু ক'জনের কথাই বা মনে থাকে বলুন?
কয়েকমাস পর পোষ্ট অফিস থেকে একটি চিঠি আসায়, তার কথা আবার মনে পড়ল।
তিনি লিখেছেন,আপনার কাছ থেকে যে পত্রিকাটা নিয়ে গিয়েছিলাম, তাতে আমার প্রাক্তন স্ত্রীর ছবি ছিল। ছবিতে তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, ছবিতে তার সৌন্দর্য ধরে রাখা যায় না। যার চোখে কবিতার ভাষা আছে সে বুঝবে ,ক্যামেরার চোখে তো আর তা নেই। 
তার এই সৌন্দর্যই শেষ পর্যন্ত কাল হলো। 
প্রতিবেশী এক তরুণ কবি তার রূপে মুগ্ধ হয়ে,
আস্ত একখানা প্রেম উপাখ্যান লিখে ফেললো। সেটা আবার টাকা খরচ করে ছাপিয়ে তাকে উৎসর্গ করলো।
আশ্চর্য, সেও সেই তরুণ কবির প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। পাগল হয়ে উঠল। কিছুদিন আমি তা লক্ষ্য করে বুঝতে পেরে, প্রথমে খুব কষ্ট পেলাম।
পরে ভাবলাম যে আমাকে ভালবাসে না তাকে ভুলে থাকাই ভাল। তাই আমি তাকে মিউচুয়ালি ডিভোর্স দিলাম।
গত মাসের সাতাশ তারিখে তার আবার নতুন বিয়ে হয়েছে ওই তরুণ কবির সাথে । তারই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ওই পত্রিকায়।
চিঠিটা পড়ে আমার চোখে,তার ভাবলেশহীন পাথরের চোখ দু'টো ভেসে উঠলো। চোখ দুটো থেকে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে আমার হাতে পড়ল মনে হলো। না হলে হাতটা আমার আর ভেজা কেন? আমি তো আর কাঁদিনি, তার দুঃখে অশ্রুসিক্ত হয়ে।
-------------------------------------------------------------------

*লেখক পরিচিতি
---------------------------
নাম - শংকর ব্রহ্ম
জন্ম - কোলকাতা ( ২রা মার্চ ১৯৫১.)
শিক্ষাগত যোগ্যতা - বানিজ্যে স্নাতক
জীবিকা - বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা (প্রধান-শিক্ষক,
বর্তমানে - অবসর প্রাপ্ত)।
কবিতা চর্চা -১৯৭০ সালের শুরু থেকে -
সান্নিধ্য লাভ - অন্নদা শংকর রায়, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শিব নারায়ণ রায়, অমিতাভ চৌধুরী, পবিত্র সরকার, সমরেশ বসু, অরুণ মিত্র, সুশীল রায়, নারায়ণ গাঙ্গুলী, অমিতাভ চৌধুরী, যজ্ঞেশ্বর রায়, নীহার রঞ্জন গুপ্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্র বিশ্বাস,
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, সুনীল গাঙ্গুলী, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, শক্তি চ্যাটার্জী, দীপক মজুমদার, পবিত্র মুখার্জী, দিব্যেন্দু পালিত, দেবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম চ্যাটার্জী ( মহীনের ঘোড়াগুলি) প্রমুখ।
প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ -
১). তোমাকে যে দুঃখ দেয়
২).স্মৃতি তুমি আমাকে ফেরাও
৩).যাব বলে এখানে আসিনি
৪).আবার বছর কুড়ি পরে
এ'ছাড়াও আরও দশটি 'ই-বুক' প্রকাশিত হয়েছে।
এই ওয়েব লিঙ্কে সব বইগুলি পাবেন পড়ার জন্য।
https://sites.google.com/view/sblekhalikhi/home

প্রকাশিত কবিতা শ'পাঁচেক-এর চেয়েও বেশী। প্রায় শতাধিক পত্রিকার লেখক। 'দৈনিক বাংলা স্টেটসম্যান', পুরশ্রী, 'প্রসাদ', 'ঘরোয়া' 'বিকল্প বার্তা (শারদীয়া সংখ্যা - ১৪২৮) এ'ছাড়া রয়েছে -
( সমরেশ বসু সম্পাদিত - মহানগর, শিবনারায়ণ রায় সম্পাদিত - জ্ঞিসাসা, কিরণ শংকর সেনগুপ্ত সম্পাদিত - সাহিত্য চিন্তা, পবিত্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত - কবিপত্র প্রভৃতি)।
বহু পুরস্কারে ভূষিত। 'সারা বাংলা কবি সন্মেলন' ( ১৯৭৮ সালে) সালে তরুণদের মধ্যে প্রথম পুরস্কার। 'সময়ানুগ' (১৯৭৯ সালে) প্রথম পুরস্কার। ' যুব উৎসব (১৯৮০ সালে)-এ পুরস্কৃত।
ও অন্যান্য আরও পুরস্কারে ভূষিত।
'বাংলা সাহিত্য - লাইব্রেরী'-তে প্রকাশিত
এই কবির লেখার লিঙ্ক -
http://banglasahitya.net/tag/sankar-brahma-শংকর-ব্রহ্ম/
'শব্দব্রহ্ম' ও 'সাহিত্য সংহিতা' দুটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
বর্তমানে ' সাম্প্রতিক সাহিত্য' ও ' শায়েরী ও রুবাই' গ্রুপের এডমিন।

No comments:

Post a Comment

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...