"পেটে খেলে পিঠে সয় "
মধুসূদন সেনগুপ্ত
যখনকার কথা লিখছি সেসময় পল্লীগুলোতে মানুষের মধ্যে ছিল সচেতনতা পরস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।আর সবচেয়ে বড় ছিল একান্নবর্তী পরিবারের মহামিলন মঞ্চ। সেই রকম একটি পরিবার ছিল চৌধুরী পরিবার। তিন ভাইয়ের একই উঠোনে খেলা করত তিন ভাইয়ের এগারোজন ভাই-বোন ।
যৌথ পরিবারে বড় গিন্নিমা তদারকি করতেন । তাঁর মান্যতা দেওয়া হত খুব।এমনই প্রত্যন্ত গোপালনগর গ্রামের সাধারণ মধ্যবিত্ত চৌধুরী পরিবারের রাধু,রাজু আর বিমল থাকতেন একই উঠোনে । বাড়ির পাশেই প্রশস্ত খামার সেখানে কুঁড়ে ঘরে থাকতেন বিধবা পিসি। তিনিও পিঠে খেতে সাত ভোরে উঠে আসতেন। তিন পরিবারের পিঠের হাঁড়ি বসত একটাই । রান্না হত উঠোনে কাঠের জ্বালে অথবা কাঁচা কয়লায় , সামনেই দামোদর নদ।নদ পেরলেই পাঁচ,ছটা কলিয়ারি ,চাঁদা, নিগা,কালিপাহাড়ি,চেলোদ ডামরা,ঘুঁষিক কলিয়ারি।তাই কয়লার অভাব ছিল না ।আর পলাশ গাছে চারিদিক ভরে ।বিশটা গাছ কাটলেও পঞ্চাশটা গাছ লাগানো হত।সবাই গাছের যত্ন করতেন ।আর ঝোঁপঝাড়ে ঘেরা । নদ পেরোলেই মানার জঙ্গল,বাঘ চিতা হরিণ দেখতে পাবেন।এমন সুন্দর পরিবেশে কার না মন চায় ঘুরে আসতে। সবাইকে বলব একবার ঘুরে আসতে।
বড় ছিলেন রাধারমন চৌধুরী।দশ সের চালের গুঁড়ি হত ঢেঁকশালে ।এখন বললেও কেও বিশ্বাস করবেন না জানি । খেয়ে দেয়ে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলত চাল গুঁড়ো করার পর্ব । সেও এক মস্ত পালা। দেখলে বলবেন হরি নামের পালা ।কথায় বলে ," মিলে মিশে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ"!
চাল গুঁড়ো যে প্যাকেট বন্দী হতে পারে তখনকার সাদাসিধে মানুষ জানত না । শুনে একদিন দেবু জ্যেঠু তো তামাক টানতে টানতে বিষম খেয়ে পড়লেন বিছানা থেকে।এই দেবু জ্যেঠু সে বয়সে বিশ গণ্ডা পিঠে খেতেন মানে গুনে গুনে আশিটা । হাসছেন , বিশ্বাস হচ্ছে না তো , তা হবে কি করে আপনারা তো দেখেননি। তাঁর আবার অন্নপ্রাশন হয়েছিল ।একশত পাঁচ বছর বেঁচেছিলেন। তরকারিতে নুন বেশি হলে বলতেন পুষ্প আজ কি বাড়িতে নুন ছিল না।পুষ্প বলত, "কেন দাদু "? দাদু বলতেন তরকারিতে নুন হয়নি । পুষ্প আরো নুন দিয়ে ফুটিয়ে নিত ফলে কারো আর মুখে উঠতো না।এরকম দুচারটে মানুষ যে তখনকার দিনে ছিল না বলা খুব মুশকিল ।যাই হোক পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন উঠোন পরিস্কার করে গোবরজল ছিটা দিয়ে সুদ্ধ করে সেখানে চাল গুঁড়ো দিয়ে আলপনা কেটে তার উপর সরষে ফুল ছড়িয়ে দেওয়া হত।এটা হল বাড়ির বড় গিন্নির হুকুম।এটাই ছিল পল্লীগুলোতে মানুষের একমাত্র নিয়ম।আলপনার উপর আঁকা হত লক্ষ্মীমায়ের পা,প্যাঁচা আর রাখা হত কুলা,সপ্তডিঙা, নতুন ধানের ছড়া। বাড়ির বৌমারা ছড়া কাটতেন
" আউনি বাউনি চাউনি,
সকাল থেকে কিছু আমরা খাইনি,
তিন দিন কোথাও না যেও
ঘরে ঘরে বসে পিঠে ভাত খেও।" আউনি মানে মালক্ষ্মীর আগমন, বাউনি লক্ষ্মীর বন্ধন আর চাউনি মানে মা লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা। তিন জা কনকনে শীতের রাতে গরম জলে স্নান সেরে খামারের উঠোনে খামারের ধান গোলার পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন তারপর শুদ্ধ পরিস্কার কাপড় পরে পিঠা করতে বসতেন। তিন জা বসে পড়তেন উনুনের পাশাপাশি। দু'জন পিঠে গড়ছে একজন তা স্টিমে ভাপিয়ে নামাচ্ছে।
আমরা কথায় কথায় বলি "পেটে খেলে পিঠে সয়,পিঠে খেলে পেটে সয় না।" পিঠে সুস্বাদু ও লোভনীয় আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই ভালোবাসেন।
সেবার দু'জায়ের জ্বর । শীতটাও জাঁকিয়ে বসেছে । বাইরে শীতের আমেজ আর ঘরের ভেতর নারকেলনাড়ু,তিলনাড়ু,ঝালঝাল সবজি আর টাটকা খেজুর গুড়ের সুঘ্রাণ।মণিবদ্যি ( বড় জা ) বসেছেন পিঠে করতে পাশে বসেছে ছোট্ট মেয়ে মৈনি,আজ হবে ভাপা পিঠা, নানান ধরণের পুর ভরে।মৈনির মা মৈনিকে পিঁড়ি পেতে বসতে দিয়ে একঝাঁক ভাপা পিঠা নামিয়ে তারই কিছু থালায় সাজিয়ে গেলেন তুলুসীতলায় ঘরের দেবদেবীদের পূজা দিতে কারণ আমাদের পল্লীগুলোতে মানুষের একমাত্র সম্বল চাষ আর মালক্ষ্মীর আরাধনা।তাই প্রথম পিঠে ঠাকুরের নামে। এদিকে ফাঁকা ঘর পেয়ে মৈনি এক হাতা সদ্য তৈরি ভাপা পিঠা আঁচলে নিয়ে উঠতে গেছে আর বাবাগো মাগো বলে সেখানেই চিৎপটাং ।মা ছুটে এসে বলেন, "কি হল মা, অত ছট্ফট্ করছিস কেন ? আয় বোস পিঠে দি খা !" ও-মা মেঝেতে অত পিঠে ছড়ানো কেন? তুই গরম পিঠে নিতে গেছিলি বুঝি ? আওয়াজ শুনে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে দিদি ছুটে এসেছে।জামাটা তুলে দেখে- পেটের কাছটা পুড়ে গেছে ফোসকাও পড়েছে তাড়াতাড়ি বার্ণল এনে লাগিয়ে বলল," বোনের লোভ মন্দ না "!
No comments:
Post a Comment