প্রতারক
সাবিত্রী দাস
অরূপের কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে।এই অস্বস্তি টা খুব বেশি বলতে গেলে আট দশ দিনের হবে।ঘরে তো মাত্র দুটি প্রাণী সে আর তনু মানে অরূপের স্ত্রী তনিমা।
অরূপ কাজ করে করপোরেশনে । সাফাই বিভাগের সিনিয়র ক্যাশিয়ার সে। সাফাই কর্মীদের পেমেন্টের হিসাব রাখা এবং তাদের ব্যাংকের খাতায় পেমেন্ট পাঠানোই হলো অরূপের কাজ।
তনুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে চার বছর।বাড়ীর লোকের দেখাশোনাতেই বিয়ে।সাদামাটা মেয়ে তনু।ভারী সরল আর হাসি খুশী। চার বছর বিয়ে হলেও এখনো পর্যন্ত তাদের কোন সন্তানাদি নেই। যদিও বহু ডাক্তার কবিরাজ দেখানো হয়েছে।লাভের লাভ কিছুই হয় নি।ডাক্তারের মত দুজনের কারো কোন সেরকম দোষ বলে কিছু পাওয়া যায়নি। হাসি খুশী ভাব টি তনুর এখন আর তেমন দেখতে পাওয়া যায় না বিশেষ।এহেন তনুকে নিয়ে অরূপের কোন সমস্যা হওয়ার কথাও নয়।শুধু সবসময় অরূপের মনে হয় তনুর সরলতার সুযোগ নিয়ে কেউ না ওকে ঠকিয়ে দেয়।যে কদিন তনুকে যেন একটু অন্যমনস্ক দেখছে অরূপ।মনে হচ্ছে কিছু যেন একটা লুকোচ্ছে ও।
এখনও সন্তানের জন্য ঠাকুর দেবতা কবচ তাবিজ করে চলছে তনু।বাধা দেয় না অরূপ,মনে যাতে শান্তি পায় তাই করুক!
তনুর কি একটা ব্রত চলছে।দুজনে দুঘরে আজ সাতদিন হলো।দুজনের ঘর দুটো একেবারে মুখোমুখি ।দরজা বন্ধ করতে গিয়ে অরূপ দেখে তনুর ঘরের জানালা খোলা।ঘরে আলো জ্বলছে।মানে তনু এখনো জেগে!ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে পৌনে বারোটা।তনু তো এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে!কিছু একটা খেলো যেন।কোন ওষুধ হবে আরকি।
দরজা বন্ধ করে অরূপ শুয়ে পড়ে বিছানায়।
আজ তিনদিনের দিন তার ওষুধ খাবার কথা।ভৈরব বাবার মন্দিরের পাশে এক সাধুবাবা এসেছেন দিন পনেরো আগে।লোকমুখে খবর পেয়ে সেখানে তনুও গেছিলো যদি কোন সুরাহা হয়। খুব ভালো মানুষ সাধুবাবা।তাকে আশ্বাস দিয়েছেন,সন্তান হবেই।শুধু তনু যেন কারোকে কিছু না বলে!পাঁচকান হলে ওষুধে ফল ফলবে না একথা বারবার করে বলে দিয়েছেন তিনি।অরূপকেও কিছু জানানো পর্যন্ত বারণ। আজ পর্যন্ত অরূপকে কোন কিছু লুকোয় নি তনু। প্রথমে মনটা বড়ো খচখচ করলেও ভাবে ভালো কাজের জন্য যখন তখন তার দোষ কী! ওষুধ খাবার পর ঘড়ি দেখছে তনু ,বাবা বলেছেন বারোটার দশ মিনিট আগে ওষুধটা খেতে।আর ঠিক বারোটায় ঘর থেকে একা একাই বেরিয়ে পৌঁছতে হবে মন্দিরে।হ্যাঁ ওষুধে কাজ হচ্ছে মনে হচ্ছে যে।হঠাৎ শরীরে একটা পরিবর্তন অনুভব করে সে।কেমন একটা অস্থির ভাব!ঘর খুলে বেরিয়ে পড়ে তনু।চারদিক ভালো করে দেখে বাইরের দরজা খুলে পথে নামে।বড়ো অস্থির সে এ কদিন যাতায়াতের পর আজ সে পাবে বাবা ভৈরবের কৃপা।
......
আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না অরূপের।তনুকে ছেড়ে থাকতে ভালো লাগে না।
ভাবতে ভাবতে চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল।একটা শব্দ হলো মনে হলো না!
ভালো করে কান খাড়া করে শোনে হ্যাঁ ঐতো দরজা খোলার শব্দ না!তাড়াতাড়ি জানালা দিয়ে দেখতে পায় তনু দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছে। এ কী! তনু একা! রাত বারোটায় তনু একা কোথায় যাচ্ছে।ভারি আশ্চর্য লাগলো।এতোদিন ধরে তনুকে দেখছে.......
আজ কি হলো কি তনুর!
দরজা খুলে বেরিয়ে আসে অরূপ।কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে তনুকে অনুসরণ করতে থাকে সে।
দূর থেকে দেখে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে যেন চলে যাচ্ছে তনু।তার তনু এভাবে...
বুকের ভেতর একটা মোচড় পড়লো অরূপের।ততক্ষণে তনু ভৈরব মন্দিরে পৌঁছে গেছে।দরজা খোলাই ছিল।সাধু বাবার মুখে মৃদু হাসি,যাক এসেছে তাহলে।আহারে বাচ্ছা চাইছে।তা বাচ্ছা তাকে দেবে বৈকি! নিশ্চয়ই দেবে।তার আগে যা করার করে নিতে হবে।ক্যামেরা রেডি করাই আছে।বোকা মেয়ে ! সাধু বলে নিজের মনেই ।
তাড়াতাড়ি দুহাতে জাপটে ধরে তনুকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।ওষুধের ক্রিয়া ততক্ষণে তনুর শরীর কে অস্থির করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
হাঁপাচ্ছে অরূপ দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে কি বোকামিটাই না করেছে সে।স্পষ্ট দেখতে পেল তনু মন্দিরের পাশের ঘরটায় ঢুকলে কেউ যেন দরজা বন্ধ করে দিল।পাগলের মতো দৌড়ে এসে দেখে দরজা বন্ধ।ঘরের পিছন দিকে একটা দরজা আছে না!ছোট বেলায় কতবার লুকোচুরি খেলতে চলে আসতো এখানে। সেই দরজাটা খোলাই থাকতো সবসময়ই।
পৌঁছে গেছে সেই খোলা দরজা দিয়ে ঠিক সময়েই। দেখে বদমাশ সাধু তনুর দিকে তাক করে ক্যামেরা অন করে দিয়েছে। তনু মাটিতে পড়ে আছে আচ্ছন্ন হয়ে।কোনো হুঁশ নেই তার!বদমাশ টা তনুর শাড়ি ধরে খুলতে শুরু করেছে কি না, শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে সজোরে আঘাত করেছে অরূপ, সাধুর মাথায়।কয়লা ভাঙা হাতুড়িটা দিয়ে। এক ঘায়েই সাধু অজ্ঞান।তড়িঘড়ি তনুকে উঠিয়ে নেয় অরূপ দৌড় দেয় ঘরের দিকে।তনুকে ঘরে রেখে পুলিশে খবর দিতে হবে।সাধুর জ্ঞান ফিরে আসার আগেই আসতে হবে পুলিশ নিয়ে।
No comments:
Post a Comment