" যমের দক্ষিণ দুয়ারে শিব আর আমি "
প্রদীপ দে ~
সক্কাল সক্কাল বউয়ের সঙ্গে ঝামেলা হয়ে গেল। আরে রিটেয়ার করে বসে আছি। সরকারী পেনশন ও পাই না। কিছু সুদের আয়ে কষ্ট করে দিন চালচ্ছি, কিন্তু হালার বউ কিছুতেই তা মানবে না?
আজ ঘুম থেকে উঠেই হাতে থলে ধরিয়ে দিয়েছে ,
-- ভালো মাছ, না হলে নিদেনপক্ষে মাংস নিয়ে আসো!
আমি কত বোঝালাম। আর কত বোঝাবো?
বিবি না শোনে কোন ব্যথার কথা!
রাগ করে থলে হাতে বেড়িয়ে পড়েছি বাড়ি থেকে।
-- ধুৎ! নিকুচি করেছে তোর সংসারে …
ভেবেছিলাম আর বাড়িমুখো হবো না।
থলে হাতে আজ ই হোক আমার এই শেষযাত্রা!
যমের দক্ষিণ দুয়ারে চললেম …
ভীষণ কাহিল। কি করা যায়? ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করার জন্য ধানজমি পেরিয়ে ফাঁকা মাঠে একটি বটবৃক্ষের নীচে লুঙ্গি পরে বসে পড়লাম। আহাঃ কি আরাম! গ্রীষ্মকালীন ফুরফুরে হাওয়ায় ভাসছি যেন! এবার চিন্তা করে দেখি, কোন চুলোয় যাবো?
চোখ বুজে এল…
ডুগ… ডুগ… ডুগ…
ডুগডুগি বেজে উঠলো, সঙ্গে নূপুরের ঝনঝনানি আওয়াজে ঝিমুনি উধাও …
চমকে চোখ খুলে দেখি …
একি…
এ যে স্বয়ং বাবা মহাদেব …
শিব বাবা!
উদোম গাঁট্টাগোট্টা ছাইরঙা গা, মাথায় বিরাট এক জটা, বটগাছের ঝুরি কাঁধ ছাড়িয়ে ঝুলছে, পরনে ছোট্ট বাঘছাল, পায়ে বড় বড় ঘুঙুর বেঁধে আর হাতের ডুগডুগি বাজিয়ে রুক্ষ মাটিতে বেধড়ক এক নাচ জুড়েছেন!
আমিতো থ! আরে ঝামেলার পর একেবারে শিবের দেখা? বুঝলাম আর কেউ না বুঝুক শিব বাবা আমার দুঃখ বুঝেছেন। এবার আমি উদ্বার হয়ে যাবো নিশ্চিত - কারণ সূর্য পুত্র যমই শিবের এজেন্ট এবার আমায় ভালোবেসে শিবলোকে নিয়ে নেবে নিশ্চয়ই …
-- প্রনাম মহাদেব! আপনার অশেষ কৃপা। আপনি আমার দুঃখে সাড়া দিয়েছেন। এবার আমায় উদ্ধার করুন … আর কোনো কালে আমি বিবাহ করবো না - কথা দিচ্ছি … এই নাক কান মুলে ক্ষমা মানছি …
আমার চোখ বেয়ে জল নেমে এল, -কথা গেল থেমে।
ভাবলাম শিব খুব খুশি হবে। ওমাঃ এ কি দেখছি?
দেখি শিব নাচাগানা থামিয়ে হু হু করে কাঁদছে …
-- ঠাকুর সাব, আপনি কাঁদেন কেন? আমার জন্যি?
-- না রে পাগল বৎস, না রে না! তোর দুঃখ দেখে কাঁদিনি - তোর দুঃখ দেখে আমার দুঃখের কথা মনে এল যে! দুঃখ ভুলতে নাচি গাই - তোকে দেখে মুখপোড়া আমার আবার সেই কষ্টের কথাই মনে পড়ে গেল …
-- সে কি? আপনি হলেন গিয়ে এই দুনিয়ার মালিক মহাদেব? আপনার আবার কিসের দুঃখ?
-- চুপ কর বেয়াদপ! মালিক! মালিক আবার কি রে? ঘরে বউ থাকলে এ কথা বলা যায়? সব বউয়েরাই এক, এটা বুঝিস না?
-- ওমাঃ সে কি কথা গো ঠাকুর। তোমার গিন্নি যে জগৎজননী মা দুর্গা? সে তো বিরাট ব্যাপার, বিরাট ভাগ্য তোমার?
-- হ্যা তাতো বাইরে দিয়ে মনে হয় রে চ্যালা! পরের বউ মানেই খুব ভাল।
-- ছিঃ ছিঃ এসব বলো না।
-- চুপ কর ব্যাটা সব মহিলারাই এক। বিয়ের একবছর পরেই এক্কেবারে রণচন্ডী! মেরে মেরে আমায় একেবারে শেষ করে দিল রে…
তাই নন্দীভৃঙ্গী নিয়ে নেচে নেচে দুঃখু ভুলি রে?
বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আমি একজন পার্টনার পেয়ে দুঃখ ভোলবার চেষ্টা করছি এমন সময় ভোলেবাবা নিজের টাল সামলাতে গিয়ে নিজের কোমরের বাঘছাল খসিয়ে দিল …
ছিঃ ছিঃ এ আমি কি দেখতাছি - তলার 'ইয়েটা' যে একেবারেই শুকিয়ে ছোট্ট হয়ে গেছে - ঠিক আমার টার মতোই। লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল - ছিঃ ছিঃ এই জন্যই যে আমাদের এত দুঃখ, বউদের আর কেন মিছে দোষ দিই, ছিঃ!
চোখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। পুনরায় তাকিয়ে দেখি জনকোলাহল, শিব বাবা একহাতে বাঘছাল আর অন্যহাতে মাথার জটা ধরে মাঠ ধরে ছুটছে - আর তার পিছনে ছেলেবুড়ো সব্বাই তারস্বরে চিৎকার করছে, --
" বহুরূপী বহুরূপী " !
No comments:
Post a Comment