Saturday, 5 February 2022

শৈলী-- অদিতি ঘটক

শৈলী
অদিতি ঘটক

বসে থাকতে ভালো লাগছে। এক পাশে বট আরেক পাশে অশ্বথ।
  অশ্বথরকচি কচি সবুজ পাতা বিরাট গাছটার গায়ে ছোট পুঁচকে বাচ্ছার নতুন নতুন আঁকা শেখার মত মনে হচ্ছে।
  চৈত্রের প্রথম দিক। গরম তেমন একটা নেই। অহনা অলস ভাবে লঞ্চ,  স্টিমারের চলাচল, জেলেদের মাছ ধরা দেখে চলেছে। স্ট্যান্ডের বেঞ্চে বসে মানুষের আনাগোনার মাঝে ছিটকে ছিটকে আসা কথা শুনছে। কান করে যে শুনছে বা মনে রাখছে এর কোনোটাই নয়। হাওয়ায় যেমন আসছে তেমনি মিলিয়ে যাচ্ছে। নানা বয়সের, নানা ধরনের নারী ,পুরুষের নানা অভিব্যক্তি।
  আজ অহনা একটা বেঞ্চে একাই বসে আছে। এক মনে সামনের ডিঙি নৌকায় বাবা আর তার বালক ছেলের মাছ ধরা দেখে যাচ্ছে। সঠিক ভাবে বলতে গেলে তাদের অধ্যবসায় দেখে যাচ্ছে। প্রায় এক ঘন্টা হতে চলল একটা মাছও ওঠেনি। চালাক মাছেরা বার বার চার খেয়ে চলে যাচ্ছে। দুজনেই কি নিষ্ঠা ও ধৈর্য্যের সঙ্গে আবার চার গাঁথছে---
 "কি ধৈর্য্য বলুন। দরদাম করার সময় কিন্তু এই একাগ্রতার কথা মনে রাখিনা।"
 অহনা চমকে ওঠে। ও নিজের খেয়ালে এত মগ্ন ছিল এই বুড়োটে, ক্ষয়া, উলোঝুলো লোকটা কখন এসে বসেছে জানতেও পারেনি। তাহলে অহনা আগেই উঠে যেত। 
আসলে অহনা অনেক কিছুই জনতে পারেনা। যেমন প্রলয়ের মুখে না বলা অবধি তাকে ভালোবাসার কথা। বিয়ের পর প্রলয় বলেছিল "এই বুদ্ধি নিয়ে চাকরি করো কি করে ? বাবাহ ! এত মোটা, মোটা হিন্ট এও বুঝতে পারলে না। গোছা গোছা ফুল, গিফট, আমার শরীরী ভাষা সব ব্যর্থ ! ম্যাডামকে মুখে না বললে উনি কিছু বুঝতে উঠতে পারেন না।"
 অহনা বোকা চাহনি ,বোকা হাসি নিয়ে প্রলয়ের বুকে মুখ গুঁজে ছিল।
 প্রলয় নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়ে বলেছিল এই সোজা সরল মেয়েটিকেই তো আমি ভালোবেসেছি। সারা জীবন এমন বোকা হয়েই থেকো।
  এত বড় ভরসা দেওয়ার মানুষ সেই প্রলয়ই এখন পারমিতার প্রেমে পাগল। বুবলাই এর কথাও ভাবে না। অহনা সত্যি কি বোকা ! পারমিতার ঘন ঘন বাড়িতে আসা, প্রলয়ের ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে এনগেজ থাকা, অফিসের কাজ বলে দুজনেরই একসাথে বেপাত্তা থাকা। বেয়ারা সুজয়দা যদি চোখে আঙুল দিয়ে না দেখাতো তাহলে অহনা এত সবের পরেও অজ্ঞই থেকে যেত।

লোকটা বলছে," জানেন জীবনটাও ঠিক এরকমই, বোকাদের এখানে কোনও জায়গা নেই। তারা হেরো হয়ে  পিছন থেকে আরও পিছনে যেতে যেতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
 চার, আর অধ্যবসায় থাকলে ছিপে মাছ গাঁথবেই।"
অহনা দেখল সত্যিই বাবা আর ছেলে দুজনের ছিপেই টপাটপ মাছ উঠছে।
লোকটা বলছে দেখলেন, "একেই বলে কেরামতি আগে চার ছড়িয়ে প্রলুব্ধ করে তারপর বড়শিতে গেঁথে নেওয়া।
 জীবনে চোখ কান খোলা রাখা আর  শৈলী রপ্ত করা জরুরি। না হলে.... চলিহিঃ---"
  
অহনা এবার আর ছিপটা গুটিয়ে রাখবে না। চার সাজিয়ে সে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করবে। বুবলাই এর জন্য ওর নিজের জন্য ওকে বেঁচে থাকার শৈলী রপ্ত করতেই হবে।

No comments:

Post a Comment

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...