Saturday, 5 February 2022

খুব বাঁচান বেঁচেছি--ঊশ্রী মন্ডল

খুব বাঁচান বেঁচেছি 
ঊশ্রী মন্ডল

সূর্য ডোবার সাথে সাথেই বজ্জাত সন্ধ্যা আদিখ্যেতা দেখিয়ে দাঁত কেলিয়ে হুড়মুড়িয়ে এসে গেলো , সন্ধ্যে হলেই আমাদের পাড়াটা একেবারেই নিঝুম হয়ে যায় , রাস্তায় এক্কা দোক্কা লোককেই চলাচল করতে দেখা যায়, এই সময় কপকপানি শীতও খুব রঙ্গ দেখাচ্ছে l সিগারেট না ফুকেও মুখ থেকে অনবরত ধুঁয়া বের করছি , সঙ্গে সংগীত ধরছি হুঁ হুঁ হুঁ..| 
   আমরা থাকি বিধানগরের ডেয়ারি কলোনিতে, আমাদের কলোনির চারিদিক ঘন জঙ্গলে ভরা ,একদিকে এ.বি.এল'র জঙ্গল, ঐ জঙ্গল পেরিয়েই রোজ আমাকে স্কুলে যেতে হয়,আমি ক্লাস নাইনে পরি l দিনের বেলায় যেতেই ভীষণ গা ছমছম করে, সন্ধ্যা হতে না হতেই দুস্টু লোকেদের উপদ্রব ভীষণ ভাবে বেড়ে যায় l
ওপরপারেও তেমনই গভীর জঙ্গল l সেই জঙ্গলে একটা না ভাঙাচোরা পোড়ো বাড়ি আছে  l আমি একটু ডানপিটে মেয়ে,ভয়ডোর একটু কম , তবে কৌতূহল খুব বেশী l মাঝে মাঝেই পাঁচিল টপকে বন্ধুদের সাথে জঙ্গলের ভিতরে ঐ বাড়িতে যাই এডভেঞ্চার করতে l শুনেছি ওটা নাকি নীলকর সাহেবদের কুঠি ছিলো l কখনো কখনো ঐ কুঠিতে রাতের অন্ধকারে মৃদু আলো জ্বলতে দেখি l মাকে জিজ্ঞাসা করাতে উনি বললেন, "ওরা চোর ডাকাত, খবরদার একদম ঐ দিকে যাবি না বলে দিলাম ll"

     কালিপূজো আসছে, তার সাথে চোরের উপদ্রব খুব বেড়েছে,আমাদের উপরের ফ্ল্যাটে,জানিনা কী ভাবে চোর উঠে কাঁচ ভেঙ্গে, অনেক কিছু নিয়ে চম্পট দিয়েছে l তাই সকলেই সজাগ ও চকিত হয়ে থাকতাম l 
      তাড়াতাড়ি খাবার পাঠ চুকিয়ে আমরা যে যার ঘরে দোর এঁটে শুয়ে পড়লাম , ও ঘর থেকে দাদার নাক ডাকার আওয়াজ বেশ শোনা যাচ্ছে , যথারীতি ঝিঁঝিপোকারা তাঁদের কনসার্ট চালু করে দিয়েছে l তারস্বরে হুক্কাহুয়ার দল ঝগড়া করছিলো জানিনা কোথায়..? দূর থেকে শুধু আওয়াজ ভেসে আসছিলো l এক সময় রাত বাড়ার সাথে সাথেই চারিদিক নিঃশব্দ হয়ে গেলো l
             ঘুম আসছিলো না, একবার এপাশ আরেকবার ওপাশ করছিলাম l হঠাৎ বাইরে শুনতে পেলাম কারোর পায়ে চলার খসখস শব্দ l কে .. চোর নাকি ? দেখার আগ্রহে বিছানা ছেড়ে পা টিপে টিপে ধীর পায়ে অন্ধকার বারান্দায় জানলার কাঁচে মুখটা সাঁটিয়ে বাইরেটা দেখতে এলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না,শব্দের উৎস খুঁজতে লাগলাম,না তো.. কেউ কোথাও নেই তো, আমি কি তবে ভুল শুনলাম, নাকি ঐ মাটির ঢিপিতে যে সাপ দুটো মাঝে মাঝেই নাচ দেখায় তাদের চলার আওয়াজ শুনলাম , আনমনে সেই কথাই ভাবছি আর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি l
একটু পরে,হঠাৎ শুনতে পেলাম এক ভয়ঙ্কর হুঙ্কার, "কে রে, এই কেরে তুই ?" চমকে পিছন ফিরে দেখলাম  ,লম্বা একজন লোক একটা ডান্ডা উঁচিয়ে তেড়ে আসছে আমার দিকে , ভয়ে চিৎকার করে বললাম ," ওমা,মাগো আমাকে বাঁচাও," মা আমার চিৎকার শুনে বলে, "কি হয়েছে, কি হয়েছে, দাঁড়া আমি এখুনি আসছি l" হুড়মুড়িয়ে আসতে গিয়ে মশারিতে জড়িয়ে পড়ে গেলেন, কোনোরকম  নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে লেংচে লেংচে এসে লাইট জ্বেলে দিলেন l
      ওমা,দেখি এটা তো আমার বড়ো দাদা, যে অন্ধকার ঘরে ঘুমোচ্ছিলো নাক ডেকে ,আমাকে দেখে দাদা গোল্লা গোল্লা লাল চোখে বলে, "কেন আর কিসের জন্য ভূতের মতো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছিস, এখনই যদি একটা ডান্ডার বাড়ি মেরে বসতাম,তাহলে কী হতো বলতো ? আমি মিনিমিন করে বললাম,"না.. মানে, একটা সরসর আওয়াজ শুনলাম, ভাবলাম চোর এসেছে নাকি, তাই দেখছিলাম l" দাদা বলল," ন্যাকামো হচ্ছে,প্যাঁদানী খেয়ে যে মরে যেতিস, খুব বাঁচা বেঁচেছিস ,খবরদার এভাবে অন্ধকারে কখনই দাঁড়াবি না বলে দিলাম l"
                        ওরে বাবা, খুব বাঁচান বেঁচেছি , আজ থেকে আর কোনোদিন শব্দের পিছনে অকারণে বোকার মতো ছুটবো না,বরঞ্চ লেপের তলায় আরও সেঁধিয়ে যাবো আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞl করলাম l


* আমি ঊশ্রী মন্ডল1965 -21 june  হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় জন্ম । পিতা -ঈশ্বর রমা প্রসন্ন দাশ গুপ্ত, মাতা - শ্রীমতি কমলা দাশ গুপ্ত l স্বামী ও সন্তান নিয়ে আমার সংসার, বাল্যকাল দুর্গাপুরে কেটেছে ; বর্তমানে সল্টলেকে থাকি । 
আমি পেশাদার কোনো লেখক নই l তবে আমি এখন,কাগজে মনের ভাবনাকে কলমের সাহায্যে এঁকে যাই ; আমার চিন্তনকে অক্ষরের সুতায় গেঁথে শব্দের মালা নির্মাণ করি ll

No comments:

Post a Comment

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...