Friday, 4 February 2022

ক্রস কানেকশন -- সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

ক্রস কানেকশন
সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

অমা রাত...
মৌনতার বৈভবে সারাদিনের ক্লান্তির পর ঘুমের টায়রা জড়িয়ে থাকতেই ভালোবাসি। ঘুমোতে সময় লাগে আমার বড় জোর পাঁচ থেকে দশ মিনিট। তাই আমি তখন আমার চুপকথাদের ঘুমের দেশে। না না স্বপ্ন টপ্ন কিছু দেখি না, বিশ্বাস করুন। তবে শরীর একটু অগোছালো হলে একটু হাঁসফাঁস, ব্যস! এই পর্য্যন্ত! তা্রপর আবার ঘুমের জগতে...আমাকে যারা দেখে তারা বলে কি সাংঘাতিক ঠাকুরের আশীর্বাদের বস্তু আমি। 
আবার অন্য কথায়? এই 'আমি'টাকে নিয়ে আর আমি পারি না। আসল কথায় আসি।
হঠাৎ বেশ জোরে জোরে খসখস আওয়াজে ঘুম হোঁচট খেল। ভয়ে চাদর মুড়ি। ভাবলাম নির্ঘাত কোন ভূতের আবির্ভাব হয়েছে। পা ঠিক করে ধুয়ে শুই নি হয়ত। হ্যাঁ! আমি আবার বড্ড প্রেজুডিস। এদিকে আমি ভূতকেও খুব বিশ্বাস করি। 
কিন্তু খসখস আমার চারিদিকে ঘুরঘুর করছে কেন রে বাবা? আপাদমস্তক চাদর ঢাকা অবস্থায় কোনরকমে একটা হাত বার করে বিছানার পাশের জন কে হাতড়ালাম। তিনি নেই সেখানে। কোথায়? চাদরের পাশ থেকে একটু সরিয়ে একটা চোখ পিটপিট করে দেখি এই খসখস আওয়াজ করছেন আর কেউ না। টুনি বাল্বের আলোর খেলায় কত্তা স্বয়ং । 
লাইট জ্বালান নি কারণ অহেতুক আমার ঘুমের বিঘ্ন ঘটাতে চাননি বোধহয়। বিড় বিড় করে কী বলছেন, ঘুমের ঘোরে কানে আসছে না ঠিকমত। চাদরটা সরিয়ে আমার দিকের বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালালাম। এইবার ওনার চাপা গলার আওয়াজ দ্রুত পরিবর্তন হয়ে...চটাপট আমার কানে এল...
“ ক্যায়া পায়া হায়...হাঁ। এটা আমেরিকা হায়। অভি কিঁউ বিরক্ত করতা হায় রাত্রি ২টোর সময়? শেরিফ কে বলে দেগা? বুঝেগা তখন।” বলে ফোন রেখে দিলেন...গজর গজর করতে করতে আবার বিছানার দিকে আসলে...
-কে ফোন করেছিল? হাসি চেপে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
-কে জানে। হিন্দিতে কি যে বলে বোঝাও যায় না। কথা শেষ হতে না হতে আবার ফোন। তিনি তো বিদ্যুতের কারেন্ট লাগার মতন করে এক ছিটকে গিয়ে ফোন হাতে নিয়েই...বিশুদ্ধ ভালো হিন্দিতে “কি ব্যাপার হায় ...হ্যাঁ? ইয়ার্কি পায়া হ্যায়। রাত্রে ডিস্টার্ব করতা। কাজকম্ম নেই হ্যায়? কত পয়সা লাগতা...জানতা কি?” বলে ফোন ডিস্কানেক্ট করতে না করতেই আবার ফোন...
জানি না অপরপ্রান্তে কে? দমকা হাসির চোটে পেট ফেটে যাবার জোগাড় যখন আমার... তিনি তখন ততই গজরাচ্ছেন। আমি কিন্তু আমার হাসিকে পেটের ভেতর রেখেই হেসে চলেছি। 
এইরকম ফোন আসতে আসতে রাত দুটো থেকে ভোর সাড়ে চারটে হল। আবারও ফোন আসাতে আমিই ছোঁ মেরে ফোন তুলে নিয়ে,
-'হ্যালো! আপ কৌন বোল রহে হ্যাঁয়?' বলতেই অপরপ্রান্তে হাসি গলায় শোনা গেল...
-মুঝে মাফ কর দিজিয়ে, মেমসাহাব। ক্রশ কানেকশন হো গয়া, বাই চান্স। পহলে জিসনে ফোন পিক আপ কিয়ে থে, বড়া মজা আয়ে উনকা বাত শুনকে। ইসিলিয়ে ম্যায় বারবার উনকা মুহ সে হিন্দি বাত শুননা চাহতে থে। নম্বর দেখে বুঝলাম ইন্ডিয়া থেকে ফোন এসেছে ।
-আপ যব ফোন কিয়ে থে তব ইধার আধি রাত থি। লেকিন ইয়ে বড়ি মজা আয়ি মুঝসে ভি” শুনে অপরপ্রান্তের মানুষটি তখন হা হা হা করে হাসতে শুরু করেছেন। 
এইরকমও মানুষ আছেন যাঁরা শুধু জীবনে একটু আনন্দ উপভোগ করার জন্য টাকা পয়সার হিসাব নিকাশ দেখেন না। 
আমার ঘুমের ব্যাঘাত? কি যে বলেন, ভাগ্যিস ক্রশ কানেকশন হয়েছিল। পরের দিন তো ছুটির দিন ছিল।

ভিখারি-- রতন চন্দ রত্নেশ

ভিখারি 
রতন চন্দ রত্নেশ 

"আরে পুত্রবধূ, শুনছো... দরজায় ভিক্ষুক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। তোমার যদি কিছু খাওয়ার অবশিষ্ট থাকে, তাহলে গরিবকে দিয়ে দাও।" বললেন হলঘরে বসা শাশুড়ি।
"মা, কিছু নেই। ওকে এগিয়ে যেতে বলো।" ঘরের ভিতর থেকে পুত্রবধূর গলা ভেসে এলো।
শাশুড়ি অবাক হলেন। তিনি নিজেই রাতের অবশিষ্ট খাবার সবার সামনে ফ্রিজে রেখেছিলেন।
"বৌমা, রাতের জন্য যে খাবার রেখেছিল তার কিছু দাও।"
একথা শুনে রেগে উঠলো বৌমা।
“তুমিও যা তা বল মা। যা ফ্রিজে রয়েছে  আমরা কি এই ভিখারিদের জন্য রাখি? যদি তাদের দিতেই হতো, তাহলে এত দামি ফ্রিজ কিনব কেন?
শাশুড়ি চুপ করে থাকলেন, কিন্তু ভিক্ষুকের করুণ অবস্থা দেখে তাকে খালি হাতে পাঠাতে রাজি হচ্ছেন না।
ইতস্তত করে শাশুড়ি পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বললেন,  যদি খাবার না দাও তবে রমেশের পুরোনো জামা-কাপড়ই দাও। দেখ বেচারা কত ছেঁড়া জামা পরে আছে।
পুত্রবধূ ফুঁপিয়ে ওঠে, “মা, তুমি নম্র জগতের কিছুই জানো না। পাঁচ-দশ দিন থাকার পর সে গ্রামে ফিরবে। আপনি কি শহরে বাস করতে জানেন? ছেঁড়া কাপড়ের বদলে দু-একটি স্টিলের বাসন পাওয়া যায়। তুমি বুঝছ."
এতক্ষণ যে ভিখারিও তার কথা শুনছিল সেও বুঝতে পেরেছিল। সে চুপচাপ এগিয়ে গেল।

বাসনা -- কাকলি রায়

                                বাসনা   
                            কাকলি রায় 
 

                                 । ১ ।

চারিদিকে একেবারে ছিছি পড়ে গেল।

একযুগ ঘর করার পর সুরমা স্বামী ছেড়ে, সংসার ছেড়ে প্রাক্তন প্রেমিকের কাছে চলে গেছে। স্বামী মনোময়ের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে গেছে সে – ‘আমায় খুঁজো না, আমি স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ছি। এত বছর যার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম তার কাছেই যাচ্ছি।’

চিঠি পড়ে মনোময়ের মনের অবস্থা কী হল, তা বোঝা শক্ত। দুঃখ-অপমান-রাগ-বঞ্চনা কোন্‌ অনুভূতিটা তার আগে হল বলা কঠিন। চিঠিটা সে নিজের বুক পকেটে রাখল। বাড়িতে যেই বুড়ি পিসিমা তখন সুরমাকে ডাকছিলেন, তাঁকে গিয়ে সে বলল,

- সুরমা চলে গেছে।

- চলে গেছে মানে ! কোথায় গেছে ?

- এই সংসার ছেড়ে চিরকালের মত চলে গেছে।

- ওমা ! সে কি কথা !

বলেই পিসিমা চুপ করে গেলেন মনোময়ের শক্ত মুখ আর ঘোলাটে চোখ দেখে।              

                               । ২ ।

সুরমা নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে তার আজীবনের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ তাপসের বুকে মাথা রেখে। প্রথম স্বামীর ঘর ছেড়েছে সে। চরম ঝুঁকি নিয়েছে জীবনের। চারিদিক থেকে ছিছিকার চলেছে তার নামে। কিন্তু তাপসের প্রতি আছে তার অসীম, অগাধ বিশ্বাস আর জীবন-পণ করা ভালোবাসা। চারপাশের লোক যতই খারাপ বলুক তাকে সে জানে, সে ভুল করেনি। যদিও ভেতরে ভেতরে সে ভয় পেয়েছিল মনোময়কে নিয়ে। যদি পুলিশ সঙ্গে করে ঝামেলা করত এখানে এসে ! তবে বারো বছর একসঙ্গে থেকে এইটুকু সে বুঝেছিল - মনোময়ের অসম্ভব আত্মসম্মানজ্ঞান, অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যাওয়া স্ত্রীকে সে কখনই গ্রহণ করতে পারবে না। তবুও বুকটা দুরুদুরু করত তার প্রথম প্রথম।

 

                                । ৩ ।

বছর দুয়েক বাদে সুরমা আর তাপসের ঘর আলো করে জন্ম নিল ফুটফুটে এক ছেলে - ঈপ্সিত। বাবা-মায়ের চোখের মণি হয়ে উঠল সে।

ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল ঈপ্সিত। চেহারায়-কথায়-গানে-মেধায় সে হয়ে উঠল একম্‌ ও অদ্বিতীয়ম্‌। তার সুদর্শন চেহারা আর আবেগী গলার গান তুরুপের তাস হয়ে মেয়েদের মন জয় করে নিল।

যত দিন যেতে লাগল, গান-গান করে মেতে উঠল ঈপ্সিত। পড়াশোনা শিকেয় তুলে পাড়ায় পাড়ায় ফাংশন করে বেড়াতে লাগল। গানকেই সে পেশা হিসেবে বেছে নেবে স্থির করে নিল।

হঠাৎ একদিন তেইশ বছরের ঈপ্সিত আঠারো-উনিশ বছরের সুচেতনাকে নিয়ে হাজির হল বাড়িতে। সুচেতনা সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। তারা পরস্পরকে ভালোবাসে ও বিয়ে করতে চায়। সুরমা ও তাপস বাধ্য হল তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে।                             

                               । ৪ ।

দশ বছর অতিক্রান্ত। সুচেতনা শ্বশুরবাড়ি থেকে পড়াশোনা করে ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে বড় কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছে। ঈপ্সিত এখনও শুধু গানই গায়।

রবিবারের সকাল। সুরমা নিজের ঘরের টুকিটাকি কাজে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ উদ্ভ্রান্তের মত ঘরে ঢুকে ঈপ্সিত তার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিল, তাতে লেখা – ‘আমায় খুঁজো না, আমি স্বেচ্ছায় এই সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমার মত দাম্ভিক, স্বার্থপর মানুষের সঙ্গে জীবন কাটান আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি আমার জীবন সঙ্গী খুঁজে নিয়েছি। ইতি – সুচেতনা।’

মুহূর্তের মধ্যে সুরমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল। ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখল - তার মুখটা লাল, সমস্ত শরীরটা কাঁপছে। সুরমা নিজের ছেলের দু’চোখে তার প্রথম স্বামী মনোময়ের কান্না দেখতে পেল।

 

                      --------------------------------------



*নাম    -    কাকলি রায়

ঠিকানা  -   ৮জি, এম. বি. সরণি (মূর এভিনিউ)

            কলকাতা - ৭০০০৪০

মোবাইল - ৯৯০৩৮৭৯৭৪৪

অসিত কুমার পালের অনুগল্প : সন্দেহবাতিক

অসিত কুমার পালের অনুগল্প :

সন্দেহবাতিক 
-------------------

 ঘটনাটি বছর কুড়ি আগেকার । সুতপার স্বামীর বদলির চাকরি , তাই সুতপাকেও কয়েক বছর অন্তর নতুন জায়গায় গিয়ে সংসার পাততে হত । সে সময়ে মোবাইল ফোনের ব্যবহার চালু হলেও খুব কম লোক এর নাগাল পেয়েছিল । ফলে সুতপার বাপের বাড়ি বা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের তেমন সুযোগ ছিল না । আবার এক জায়গায় বেশিদিন থাকা হত না বলে খুব বেশি মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগও ছিল না । 

ঘটনার সময় সুতপারা দক্ষিণ বঙ্গের একটি জেলা শহরে ভাড়া থাকত । তাদের বছর দশকের একটি মেয়ে ছিল যে স্থানীয় স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ত । সুতপা বা তার স্বামী অনিমেষ দ্বিতীয় সন্তান নিতে আগ্রহী ছিল না কিন্তু অসাবধানবশতঃ সুতপা গর্ভবতী হয়ে পড়ল । সেটা জানার পরে অনিমেষের সঙ্গে আলোচনা করে সুতপা গর্ভপাতের মাধ্যমে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মরোধ করার সিদ্ধান্ত নিল ।

এক ছুটির দিনে তারা দুজনে স্থানীয় এক নার্সিংহোমএ গিয়ে ডাক্তারকে তাদের বক্তব্য জানাল । ডাক্তারবাবু বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করে সুতপার গর্ভপাত করিয়ে দিল । গর্ভপাতের পরে ঘণ্টা দুয়েক বিশ্রামের পরে দুর্বল সুতপা স্বামীর সাথে বাড়ি ফিরে এল । দুর্বলতার কারনেই সুতপা বেশ কয়েকদিন সাংসারিক কাজকর্ম করতে পারল না , তখন অনিমেষ হোটেল থেকে রান্না করা খাবার আনিয়ে নিল এবং সুতপার দেখাশোনা করার জন্য স্থানীয় এক মহিলাকে অনুরোধ করল ।

 সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে সুতপা শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠল । কিন্তু সুতপার মধ্যে কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিল । তার মনে হতে থাকল অনিমেষ পাশের বাড়ির এক বিবাহিতা মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে । সুতপা প্রতিনিয়ত তার সন্দেহের কথা তুলে স্বামী অনিমেষের দাম্পত্য কলহে জড়িয়ে পড়তে থাকল । এছাড়াও সুতপা পরিচিতদের ও আত্মীয় স্বজনের কাছে তার সন্দেহের কথা জানিয়ে দিল যা অনিমেষের কাছে বিড়ম্বনার কারন হয়ে দাঁড়াল ।

 ক্রমে ক্রমে ব্যাপারটা অনিমেষের কাছে দুঃসহ হয়ে দাঁড়াল । অনিমেষ অফিসে গিয়ে কাজ মনোনিবেশ করতে পারছিল না । অফিসের এক কলিগের কাছে সুতপা তার সন্দেহের কথা জানিয়ে দেওয়ায় কথাটা অন্যান্য কলিগদের কানেও উঠেছিল , তারা অনিমেষের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে লাগল । পরিস্থিতি চরমে উঠল যখন অনিমেষ জানতে পারল সুতপা অনিমেষের বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ জানাতে থানায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে । অনিমেষ সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ফিরে সুতপাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে  থানায় যাওয়া থেকে বিরত করল ।

এরপরে অনিমেষ তার বয়স্ক কলিগদের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করল । তাদের পরামর্শেই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে অনিমেষ তার সমস্যার কথা জানাল । ডাক্তার বাবু জানালেন গর্ভপাতের ফলে কোন কোন মহিলার ক্ষেত্রে ওই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে , কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে  সমস্যার সমাধান ঘটতে পারে ।

 ডাক্তারবাবুর পরামর্শেই অনিমেষ সুতপার একটি শারীরিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে তাকে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে নিয়ে গেল । ডাক্তার বাবু রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার , অবসর জীবনে বাড়ির  বৈঠকখানায় বসে ডাক্তারি করেন । খুব বেশি ওষুধপত্র প্রেসক্রাইব করেন না , ক্লিনিকাল টেস্ট করতেও বলেন না , অবশ্য রোগীও বিশেষ হয় না । ডাক্তারবাবু সুতপার সাথে একান্তে দীর্ঘ আলোচনা করলেন , তারপরে  নামমাত্র ওষুধ প্রেসক্রাইব করে দু সপ্তাহ পরে আবার যেতে বললেন ।

 যাই হোক, ডাক্তার বাবুর কাউন্সিলিংয়ের জেরেই হোক বা ওষুধের প্রভাবেই হোক সুতপার সন্দেহবাতিক মনোভাব ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল । অনিমেষও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল । এর পরে সুতপা আর কখনো অনিমেষের পরকীয়া সম্পর্ক বিষয়ে কোন অভিযোগ তোলেনি ।

মাধবীলতা-- শিখা মালিক

মাধবীলতা
শিখা মালিক

মাধবী  অনেকক্ষণ ভাবলেশ হীন হয়ে বসে আছে,খবর টা শুভ্রই তাকে দিয়েছে- সকালে মাধবীর ফোন টা বেজে উঠলো সে তখন ওয়াশরুমে,শুভ্র সচরাচর ওর ফোন ধরে না অতীন ফোন করছে অতীনের সাথে শুভ্রর আলাপ মাধবী ই করিয়ে দিয়েছে ।মাধবীর দেরি হচ্ছে আর এদিকে ফোন বার বার বাজছে বাধ্য হয়ে শুভ্র ফোন ধরলো হাই বলতেই ওদিক থেকে কান্না ভেজা গলায় অতীন বললে -"শুভ্র আঙ্কেল  মাকে বলে দেবেন বাবা নেই" চমকে যায় শুভ্র 'কি বলছো কি হয়েছে ???'অতীন বলে - 'আজ সকালে  হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন ,' ফোনটা কেটে গেল মাধবী যখন অবিনাশের ঘর ছেড়ে আসে তখন ছেলে রামকৃষ্ণমিশনে ক্লাস নাইনে পড়ে ।ছেলের সাথে  যোগাযোগ  রাখতো মাধবী,
নিত্য দিনের অবজ্ঞা  সর্ব সম্মুখে অপমান শিক্ষিত  অবিনাশের স্বভাব,যা দিনে দিনে অসহ্য হয়ে উঠেছিল মাধবীর কাছে ছেলের কাছে লুকালেও ছেলে বুঝতো তার মা মানসিক অবসাদে ভুগছে। এক মন খারাপের বিকেল গঙ্গার ধারে বসেছিল মাধবী কতক্ষণ  কেঁদেছে মনে নেই মাটির দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়েছিল হঠাৎ  খেয়াল হয় পাশে কেউ দাঁড়িয়ে মুখের দিকে তাকাতেই পঞ্চাশ ঊর্দ্ধ  শুভ্র বলে ম্যাম  আপনি মানসিক বিপর্যস্ত সন্ধ্যা  হয়ে আসছে এবার উঠুন আমি আপনাকে এগিয়ে  দেব,সেদিন আলাপ  তারপর থেকে প্রায়ই দেখা হোত কখন যে আপনি থেকে সম্বোধন টা তুমি তে এসে গেছে ওরা নিজেরাই জানেনা।
সেদিন শুভ্র বললে মাধবী  একটা কথা বলবো?মাধবী  জলের দিকে তাকিয়েই বললো - বলো
শুভ্র বললে আজ থাক অন্য কোন  দিন বলবো।
অবিনাশ অনেক পরিপাটি থাকতে পচ্ছন্দ করে অনেকটা বদ মেজাজী ,ভালোবাসে মাধবীর  শরীর টা ।মাধবী পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই আর অবিনাশ ষাট ছোঁবে আর ক মাস পর, ভীষণ  ব্যস্ত  সে রবিবার  কিছু অতিথি  নিমন্ত্রিত ছিল ওদের ফ্ল্যাটে, সকাল থেকে না খাওয়া  মাধবী  সব সামলাচ্ছিল একা হাতে দুপুর গড়িয়ে যায় মাথা ধরে আসছে তার  ,অবিনাশ হঠাৎ  অতিথিদের  সামনে  তাকে  অপমান করে কারণটা কিছুই  না অবিনাশের ফোন বেডরুমে বাজছিল  মাধবী সেটা নিয়ে পৌঁছে  দিতে যাচ্ছিল অন্য রুমে থাকা অবিনাশের কাছে মাথাটা ঘুরে গেল কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়েছে কিন্তু  ফোন টা হাত থেকে পড়ে গেছে ।
অতিথিরা চলে গেছে  অভুক্ত মাধবী বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে ,
হাঁটছিল  অন্যমনস্ক  হয়ে  গাড়ির হর্ন  খেয়াল করেনি  ড্রাইভারের সতর্কতায় জোরে ধাক্কা লাগেনি  ,একটা জটলা দেখে শুভ্র এগিয়ে গিয়ে দেখে মাধবী।
হাত পা একটু  ছড়ে গেছে  ,শুভ্র সেদিন আর ওকে বাড়ি ফিরতে দেয়নি বন্ধুত্বের  অধিকার খাটিয়ে নিজের  বাড়িতে আনে ।
একা থাকা মানুষের  ফ্ল্যাট আবার গোছানো থাকে- মাধবীর  ছেলেকে  ফোন করে শুভ্র খবর দেয় ।
অবিনাশ একাই থাকে  মাধবীকে আনতে যায়নি ছেলের নিষেধ  ছিল । আজ অবিনাশের খবর শোনার পর থেকে  সে কথা বলেনি একটুও ।নীরব মাধবী প্রশ্ন করে নিজের মনকে কোথাও  কি অবিনাশের জন্য  ভালোবাসা ছিল?
শুভ্র হাত বাড়ায় বলে 'ওঠো মাধবী গঙ্গায় নোয়াটা  দিয়ে আসবে।' ভাবলেশহীন মাধবী হাত টা বাড়িয়ে শুভ্রর হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় ।

জ্বালা - প্রেরণা বড়াল

জ্বালা
প্রেরণা বড়াল 

অনিমা তিন বোনের মধ্যে মেজ। বাবা দ্বিতীয় বার বিয়ে করে নূতন মায়ের সাথে আলাদা করে ঘর বাঁধায় ওদের সংসার খুব কষ্ট করেই চলত।মায়ের কাজের উপর খাওয়া না খাওয়া নির্ভর করত। কোন  কোন দিন খিদের জ্বালা নিয়েই কেটে যেত। শৈশব খুব কষ্টের হলেও বর্তমানে ওরা একটু সুখের স্পর্শ পেয়েছে। এখন ওরা সবাই কাজ করে।বড় বোনের বিয়ে দিয়েছে। ওদেরই মত খেটে খাওয়া ঘর তবে ঘরে শান্তি আছে।না খেয়ে থাকতে হয়না। আজকাল ওর মনও সোনালি স্বপ্ন দেখে।মেঘে ভর করে হাওয়ার সাথে উড়ে বেড়ায় নানান দেশে।
সবাই বলে তিন বোনের মধ্যে নাকি ও খুব সুন্দর। হয়ত সেই জন্যই মাকে বেগ পেতে হয়নি ওর বিয়ের জন্য। ওর বর সেলাইয়ের কাজ করে।ঘরে শ্বশুর শাশুড়ি দাদাশ্বশুর দাদিশাশুড়ি মিলে ওরা ছয় জন। ভালই কেটে যাচ্ছিল দিন।এক এক করে ওর কোলে দুই ছেলে এল সুজন আর সৃজন।কিন্ত কার যে নজর সংসারে লাগল ওর শ্বশুর বিছানা নিল। কিছুদিনের মধ্যেই ওর দাদিশাশুড়িও বিছানা নিল একেতো সংসারের বৃদ্ধি উপরে চিকিৎসার খরচ একার কামাইতে আর সংসার চলছিল না।অগত্যা অনিমাকে ঘর থেকে বেরোতে হল কাজ করার জন্য। পেয়েও গেল এক মাস্টার মশাইয়ের ঘরে রান্নার কাজ। তিনি একাই থাকেন। তাই কাজের চাপ কম টাকাও ভাল। কিন্ত ভাল আর ভাল রইল না।ওখান থেকেই একদিন ও ধর্ষিতা হয়ে বাড়ী ফিরে।
স্বামীকে বলে ওদের সমাজকে বলে কি করে ওর মুখের ভিতর গামছা ভরে দিয়ে হাত বেঁধে রেখে অনাচার করেছে।ও বিচার চায়।কিন্ত হায় গরিবদের বুঝি ন্যায় পেতে নেই। সত্যিটা সবাই মন থেকে মানলে ও বিচারে দোষ উল্টে ওর উপর পড়ল।প্রমাণ কি,সাক্ষ্য কই! টাকার লোভে ও নাকি মিথ্যাচার করছে।
               ঘরের কাজে আর মন লাগে না অনিমার। বুড়ো বুড়ি বাচ্চাদের দেখাশোনা রান্নাবান্না কিছুই ঠিক মত করতে পারছেনা ও।অসহনীয়,ওর নিজেকে যে অপবিত্র মনে হয়।ওর কোন মান সম্মান নেই? ঘেন্না করে ও নিজের শরীরকে। বাঁচার ইচ্ছা নাই ওর। হঠাৎ মাথায় এল।এই সুযোগ। বাচ্চারা বাইরে খেলছে।স্বামী ও বাইরেই কোথাও গিয়েছে ওর রুমটা একদম খালি।ঝটপট দরজাটা বন্ধ করে মনের আগুন শান্ত করতে,শরীরে কেরোসিন তেল ঢেলে মাচিস ঠুকে দিল। নিমেষেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। অনিমা হাসে শরীরের জ্বালাটা বাড়তেই মনের জ্বালা কমছে। কিন্ত কতক্ষণ। অসহ্য যন্ত্রণা।কয়েক সেকেন্ডেই হার মানে ও। বাঁচার তীব্র ইচ্ছা হয়। ও না থাকলে ছেলেদের কি হবে।বুড়ো বুড়ি ওর স্বামীকে কে দেখবে।ওনারা তো ওকে খুব ভালবাসে।প্রাণপণ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বাঁচাও বাঁচাও। কিন্ত একটা গোঁগান আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। আপ্রাণ চেষ্টা করে দরজাটা খোলার। কিন্ত কোন লাভ হয় না। দু এক পা বাড়াতে না বাড়াতেই পড়ে যায় মাটিতে। ততক্ষণে আশেপাশের রাখা জামাকাপড় বিছানাপত্রে আগুন লেগে আরো ভয়াবহ রূপ ধারন করে আর ধীরে ধীরে অনিমার ভিতর বাইরের জ্বালা চিরতরে শান্ত করে দেয়। ভীষণ ভাবে জ্বলে ওঠে বাইরের
আগুন। 

             সমাপ্ত

*পরিচিতি : প্রেরণা বড়াল 

একটু লিখি একটু ভাবি
নামটি প্রেরণা।
একটু বাজাই একটু গাই
এই টুকু থাক জানা
গৃহ বধূর খাতায় আছে
নামটি লেখা ভাই 
এদিক ওদিক অত কথা
জেনে আর কাজ নাই। 
প্রেরণা নাম প্রেরণা দেয়
তাইতে আমার  প্রিয়
চলার পথে একটু সহায়
তোমরা সবাই হইয়ো।
জন্ম জাত নাম ঠিকানা 
কিসের প্রয়োজন 
গুণে জানুন কর্মে জান
তাই এ আয়োজন 
চাই না আমায় নামে জানুক
জানুন আমার কাজে
তাহাই হবে শ্রেষ্ঠ জানা
এই পৃথিবীর মাঝে।
লোটাস লিলি একই সাথে
জলে করে বাস।
লোটাস পেল মায়ের চরণ
লিলি পেল আশ।
তাইত লিলি প্রেরণাকে 
অতি যত্ন করে
রাখে নিজের কলমেতে
অনেক আপন করে
চাই  গো সবাই  সুখে থাকি
এই পৃথিবীর বুকে 
হিংসা ভুলে ভালবাসুক 
মানুষে মানুষকে।

হঠাৎ কেমন একটা দিন--শমিত কর্মকার

হঠাৎ কেমন একটা দিন 
-----------------------------
শমিত কর্মকার।

ভিড়ের মধ্যে থেকে একটাই আওয়াজ ভেসে আসছে আমার মা কে বাঁচান আমার মা কে বাঁচান। অরিন্দম অফিস যাওয়ার জন্য বাস থেকে নেমে হাঁটছিল। তার চোখে পড়ল কিছুটা দূরেই বহু মানুষের ভিড়। আর কিছু সময় পরপর একটা আওয়াজ ভেসে আসছে মাকে বাঁচাও। অরিন্দমের মনটা যেন কেমন কেঁপে উঠল। এমনতো এর আগে রাস্তায় অনেক ঘটনা ঘটেছে তাহলে আজ মনটা কেন এতো উতলা হয়ে উঠেছে। 
     ভিড় ঠেলে অরিন্দম সামনের দিকে এগিয়ে গেল। একটা কথা কানে এলো  আমার বর কাজে বেরিয়েছেন আর আমি আমার মাকে নিয়ে বেরিয়ে ছিলাম। আর এই যাওয়ার পথে মার একি হলো! আপনারা আমার মা কে বাঁচান। অরিন্দমের বুকটা যেন আবার কেঁপে উঠল। আমার কেন আজ এমন হচ্ছে। এবার ভিড় ঠেলে যখন একেবারে সামনে অরিন্দম তখন সব দেখে স্থির হয়ে গেল। এ যে তার বউ আর মা! মা রাস্তায় পরে আছে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আর কিছু মানুষ চোখে মুখে জল দিচ্ছে ।বউ দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে। এবার অরিন্দম পড়িমরি করে ছুটে গেল সামনে। কোনক্রমে মাকে রাস্তা থেকে তুলে হাসপাতালে দিকে রওনা দিল । 
       ------++------

এক আলাপে জীবন আলাদা
----------------------------
শমিত কর্মকার

কোন কিছুই  ভালো লাগে না, কোন কিছুতেই মন বসে না দেবনীলার। চাকরিটা চলে যাওয়ায় আরও যে কেমন হয়ে গেছে। তার ওপর সময়টা কেমন যেখানে প্রায় বহু মানুষ কর্মহীন। নানা রকম চিন্তা করতে করতে দেবনীলার ফোন টা বেজে উঠলো। হ্যালো, দেবনীলা বলছিস আমি নিবেদিতা । শোননা আমি না একটা পার্টির আয়োজন করেছি পার্কস্ট্রিট এ সব পুরনো বন্ধুদের নিয়ে। কোন উপলক্ষে নয় শুধু সবাই  মিলে খাবো, তোকে আসতেই হবে। শনিবার সন্ধ্যায়, তোর বাড়ি  ভবানীপুর থেকে পার্কস্ট্রিট। আসবি তো, অনেক ক্ষণ দেবনীলা এটা ওটা বলল শেষে নিবেদিতা বলল আমি কিছু শুনছি না তুই আসবি।
     শনিবার সন্ধ্যায়  পার্কস্ট্রিট এ এলো। অনেক বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে দেবনীলা, অনেক দিন একঘেয়ে কাটিয়ে সান্ধ্যকালীন এই আড্ডা তার বেশ লাগলো। হোটেলের এই পার্টিতে  এসে অনেকের সাথে পরিচয় হলো। 
ঠিক  নয়টায় দেবনীলা যখন বেরচ্ছে তখন তার সাথে একজন ছেলেও বরলো,আপনি কোথায় যাবেন?ভবানীপুর, আপনি? টালিগঞ্জ। তা আপনি কি করেন?  আপাতত কিছু না। চাকরি করতাম। কিসের উপর?  অপারেশন রিসার্চ এর উপর। আপনি কি আর চাকরি করতে চান? কেন না, পাচ্ছি কোথায়। আমি দীপঙ্কর এই আমার কার্ড কালকে ফোন করবেন!
        ----------

*শমিত কর্মকার। 
কাঁচরাপাড়া। 
মোবাইল:7980219698.

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...