অসিত কুমার পালের অনুগল্প :
সন্দেহবাতিক
-------------------
ঘটনাটি বছর কুড়ি আগেকার । সুতপার স্বামীর বদলির চাকরি , তাই সুতপাকেও কয়েক বছর অন্তর নতুন জায়গায় গিয়ে সংসার পাততে হত । সে সময়ে মোবাইল ফোনের ব্যবহার চালু হলেও খুব কম লোক এর নাগাল পেয়েছিল । ফলে সুতপার বাপের বাড়ি বা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের তেমন সুযোগ ছিল না । আবার এক জায়গায় বেশিদিন থাকা হত না বলে খুব বেশি মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগও ছিল না ।
ঘটনার সময় সুতপারা দক্ষিণ বঙ্গের একটি জেলা শহরে ভাড়া থাকত । তাদের বছর দশকের একটি মেয়ে ছিল যে স্থানীয় স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ত । সুতপা বা তার স্বামী অনিমেষ দ্বিতীয় সন্তান নিতে আগ্রহী ছিল না কিন্তু অসাবধানবশতঃ সুতপা গর্ভবতী হয়ে পড়ল । সেটা জানার পরে অনিমেষের সঙ্গে আলোচনা করে সুতপা গর্ভপাতের মাধ্যমে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মরোধ করার সিদ্ধান্ত নিল ।
এক ছুটির দিনে তারা দুজনে স্থানীয় এক নার্সিংহোমএ গিয়ে ডাক্তারকে তাদের বক্তব্য জানাল । ডাক্তারবাবু বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষা করে সুতপার গর্ভপাত করিয়ে দিল । গর্ভপাতের পরে ঘণ্টা দুয়েক বিশ্রামের পরে দুর্বল সুতপা স্বামীর সাথে বাড়ি ফিরে এল । দুর্বলতার কারনেই সুতপা বেশ কয়েকদিন সাংসারিক কাজকর্ম করতে পারল না , তখন অনিমেষ হোটেল থেকে রান্না করা খাবার আনিয়ে নিল এবং সুতপার দেখাশোনা করার জন্য স্থানীয় এক মহিলাকে অনুরোধ করল ।
সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে সুতপা শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠল । কিন্তু সুতপার মধ্যে কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিল । তার মনে হতে থাকল অনিমেষ পাশের বাড়ির এক বিবাহিতা মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে । সুতপা প্রতিনিয়ত তার সন্দেহের কথা তুলে স্বামী অনিমেষের দাম্পত্য কলহে জড়িয়ে পড়তে থাকল । এছাড়াও সুতপা পরিচিতদের ও আত্মীয় স্বজনের কাছে তার সন্দেহের কথা জানিয়ে দিল যা অনিমেষের কাছে বিড়ম্বনার কারন হয়ে দাঁড়াল ।
ক্রমে ক্রমে ব্যাপারটা অনিমেষের কাছে দুঃসহ হয়ে দাঁড়াল । অনিমেষ অফিসে গিয়ে কাজ মনোনিবেশ করতে পারছিল না । অফিসের এক কলিগের কাছে সুতপা তার সন্দেহের কথা জানিয়ে দেওয়ায় কথাটা অন্যান্য কলিগদের কানেও উঠেছিল , তারা অনিমেষের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে লাগল । পরিস্থিতি চরমে উঠল যখন অনিমেষ জানতে পারল সুতপা অনিমেষের বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ জানাতে থানায় যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে । অনিমেষ সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ফিরে সুতপাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে থানায় যাওয়া থেকে বিরত করল ।
এরপরে অনিমেষ তার বয়স্ক কলিগদের সাথে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করল । তাদের পরামর্শেই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে অনিমেষ তার সমস্যার কথা জানাল । ডাক্তার বাবু জানালেন গর্ভপাতের ফলে কোন কোন মহিলার ক্ষেত্রে ওই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে , কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান ঘটতে পারে ।
ডাক্তারবাবুর পরামর্শেই অনিমেষ সুতপার একটি শারীরিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে তাকে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে নিয়ে গেল । ডাক্তার বাবু রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার , অবসর জীবনে বাড়ির বৈঠকখানায় বসে ডাক্তারি করেন । খুব বেশি ওষুধপত্র প্রেসক্রাইব করেন না , ক্লিনিকাল টেস্ট করতেও বলেন না , অবশ্য রোগীও বিশেষ হয় না । ডাক্তারবাবু সুতপার সাথে একান্তে দীর্ঘ আলোচনা করলেন , তারপরে নামমাত্র ওষুধ প্রেসক্রাইব করে দু সপ্তাহ পরে আবার যেতে বললেন ।
যাই হোক, ডাক্তার বাবুর কাউন্সিলিংয়ের জেরেই হোক বা ওষুধের প্রভাবেই হোক সুতপার সন্দেহবাতিক মনোভাব ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল । অনিমেষও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল । এর পরে সুতপা আর কখনো অনিমেষের পরকীয়া সম্পর্ক বিষয়ে কোন অভিযোগ তোলেনি ।
No comments:
Post a Comment