বাসনা
কাকলি রায়
। ১ ।
চারিদিকে একেবারে ছিছি পড়ে গেল।
একযুগ ঘর করার পর সুরমা স্বামী ছেড়ে, সংসার ছেড়ে প্রাক্তন প্রেমিকের কাছে চলে গেছে। স্বামী মনোময়ের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে গেছে সে – ‘আমায় খুঁজো না, আমি স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ছি। এত বছর যার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম তার কাছেই যাচ্ছি।’
চিঠি পড়ে মনোময়ের মনের অবস্থা কী হল, তা বোঝা শক্ত। দুঃখ-অপমান-রাগ-বঞ্চনা কোন্ অনুভূতিটা তার আগে হল বলা কঠিন। চিঠিটা সে নিজের বুক পকেটে রাখল। বাড়িতে যেই বুড়ি পিসিমা তখন সুরমাকে ডাকছিলেন, তাঁকে গিয়ে সে বলল,
- সুরমা চলে গেছে।
- চলে গেছে মানে ! কোথায় গেছে ?
- এই সংসার ছেড়ে চিরকালের মত চলে গেছে।
- ওমা ! সে কি কথা !
বলেই পিসিমা চুপ করে গেলেন মনোময়ের শক্ত মুখ আর ঘোলাটে চোখ দেখে।
। ২ ।
সুরমা নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে তার আজীবনের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ তাপসের বুকে মাথা রেখে। প্রথম স্বামীর ঘর ছেড়েছে সে। চরম ঝুঁকি নিয়েছে জীবনের। চারিদিক থেকে ছিছিকার চলেছে তার নামে। কিন্তু তাপসের প্রতি আছে তার অসীম, অগাধ বিশ্বাস আর জীবন-পণ করা ভালোবাসা। চারপাশের লোক যতই খারাপ বলুক তাকে সে জানে, সে ভুল করেনি। যদিও ভেতরে ভেতরে সে ভয় পেয়েছিল মনোময়কে নিয়ে। যদি পুলিশ সঙ্গে করে ঝামেলা করত এখানে এসে ! তবে বারো বছর একসঙ্গে থেকে এইটুকু সে বুঝেছিল - মনোময়ের অসম্ভব আত্মসম্মানজ্ঞান, অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যাওয়া স্ত্রীকে সে কখনই গ্রহণ করতে পারবে না। তবুও বুকটা দুরুদুরু করত তার প্রথম প্রথম।
। ৩ ।
বছর দুয়েক বাদে সুরমা আর তাপসের ঘর আলো করে জন্ম নিল ফুটফুটে এক ছেলে - ঈপ্সিত। বাবা-মায়ের চোখের মণি হয়ে উঠল সে।
ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল ঈপ্সিত। চেহারায়-কথায়-গানে-মেধায় সে হয়ে উঠল একম্ ও অদ্বিতীয়ম্। তার সুদর্শন চেহারা আর আবেগী গলার গান তুরুপের তাস হয়ে মেয়েদের মন জয় করে নিল।
যত দিন যেতে লাগল, গান-গান করে মেতে উঠল ঈপ্সিত। পড়াশোনা শিকেয় তুলে পাড়ায় পাড়ায় ফাংশন করে বেড়াতে লাগল। গানকেই সে পেশা হিসেবে বেছে নেবে স্থির করে নিল।
হঠাৎ একদিন তেইশ বছরের ঈপ্সিত আঠারো-উনিশ বছরের সুচেতনাকে নিয়ে হাজির হল বাড়িতে। সুচেতনা সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। তারা পরস্পরকে ভালোবাসে ও বিয়ে করতে চায়। সুরমা ও তাপস বাধ্য হল তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে।
। ৪ ।
দশ বছর অতিক্রান্ত। সুচেতনা শ্বশুরবাড়ি থেকে পড়াশোনা করে ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে বড় কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছে। ঈপ্সিত এখনও শুধু গানই গায়।
রবিবারের সকাল। সুরমা নিজের ঘরের টুকিটাকি কাজে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ উদ্ভ্রান্তের মত ঘরে ঢুকে ঈপ্সিত তার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিল, তাতে লেখা – ‘আমায় খুঁজো না, আমি স্বেচ্ছায় এই সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমার মত দাম্ভিক, স্বার্থপর মানুষের সঙ্গে জীবন কাটান আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি আমার জীবন সঙ্গী খুঁজে নিয়েছি। ইতি – সুচেতনা।’
মুহূর্তের মধ্যে সুরমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল। ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখল - তার মুখটা লাল, সমস্ত শরীরটা কাঁপছে। সুরমা নিজের ছেলের দু’চোখে তার প্রথম স্বামী মনোময়ের কান্না দেখতে পেল।
--------------------------------------
*নাম - কাকলি রায়
ঠিকানা - ৮জি, এম. বি. সরণি (মূর এভিনিউ)
কলকাতা - ৭০০০৪০
মোবাইল - ৯৯০৩৮৭৯৭৪৪
No comments:
Post a Comment