Friday, 4 February 2022

ইচ্ছাপূরণ--সন্ধ্যা রায়

ইচ্ছাপূরণ
সন্ধ্যা রায়

আঁখি ও প্রভাত, প্রভাতের মায়ের আলোচনা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত ছিল l প্রভাত বলে, জানো আঁখি, মা ত ক্রমশই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কোন কথা বলে না, দিন দিন কেমন যেন শান্ত হয়ে যাচ্ছে। 
আঁখি বলে, প্রভাত চিন্তা করো না, ভাল ডাক্তার দেখাও ভালো হয়ে উঠবেন উনি-- 
আঁখির কথায় সান্ত্বনা পায় প্রভাত । আঁখির মনেও কিন্তু ভয় হয়। তবু তাকে সান্ত্বনা তো দিতে হবে। 
হঠাৎ প্রভাতের মনে পড়ল তাকে ঘরে যেতে হবে। না হলে আবার মা চিন্তা করবে। মায়ের কথা মনে হতেই সে ঘরের দিকে রওনা হল। ঘরের অনেক কাজই প্রভাতকে করতে হয় । মা পারে না, তাই বাবাও রান্নার অনেক কাজই করে। প্রভাত  বাজার ঘাট ওষুধ আনা এই সব করতে থাকে। বাবার অফিসে যাওয়া আছে তাই কলেজ  বন্ধ করে প্রভাত ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকে । আঁখির সাথে গল্প করতে খুব ইচ্ছে হয় কিন্তু সময়ের অভাব । আঁখি এসে কিছু কাজ করে দেয়। লোকে কি বলবে এই ভয় পায়, তবুও সে কিছু না কিছু কাজ করে দিয়ে যায়। প্রায়ই টিউশনির নাম করে আঁখি বের হবে আর এখানে দেরি করে রান্না সেরে তারপর ঘরে যায় । এক সপ্তাহ না যেতেই প্রভাতের মার শরীর এত খারাপ হল যে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলল, বায়োপসির জন্য পাঠাতে হবে মনে হচ্ছে ক্যান্সার । তারপর তাড়াতাড়ি অপারেশন করতে হবে। ডাক্তার পয়সার কথাও বলে দিয়েছে, প্রায় চার লাখের কাছাকাছি খরচা পড়বে। প্রভাতের বাবার জমি বিক্রি করে পয়সা দেয়ার বন্দোবস্ত হল। রিপোর্টে ধরা পরল ক্যান্সার, তাড়াতাড়ি অপারেশনও করা হল । এরপর শুরু হল কেমো দেওয়া। 
অসহ্য যন্ত্রণা এই কেমো নেবার। প্রভাত  রোজ হাসপাতালে নিয়ে যায় ওর মাকে। প্রভাতের বাবা এই সময় অফিসটা বন্ধ করতে পারে না, একেই পয়সার টানাটানি তার ওপর ছুটি নিয়ে বসতে পারে না। তাই কলেজ কামাই দিয়ে মায়ের সেবা করে যাচ্ছে প্রভাত। প্রভাতের বাবা অফিস থেকে এসে স্ত্রীর কাছে ঠায় বসে থাকেন, অনেক কষ্ট এত টাকা পয়সা দিয়ে যদি বউটা বেঁচে যায় তবে রক্ষা । কেমো নিতে নিতে কেমন কালো হয়ে গেল প্রভাতের মা। আর খুব রোগা হয়ে গেল । প্রভাত মার দিকে তাকাতে পারে না । একটা কিডনি প্রায় শেষ করে ফেলেছে এই ক্যান্সার নামক মারণ ব্যাধি। প্রভাতের মা হঠাৎ প্রভাতকে বলল, তুই কি কোন মেয়েকে ভালোবাসিস ? প্রভাত হঠাৎ শুনে থতমত খেয়ে গেল, মার শরীরের এই অবস্থা, মা বলে কি? নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে প্রভাত সোজাসুজি বলে দিলো - হ্যাঁ বাসি । তোমার শরীর ভালো হোক তারপর আঁখিকে একদিন বলবো। আমি আঁখিকে ভালোবাসি, ওকে তা বলিনি । 
প্রভাতের মা ধীরে ধীরে বলল, বাবা, বেশি সময় পাবি না, আমি আর বেশি সময় দিতে পারবো না । তাড়াতাড়ি আঁখিকে বলে দে । আমি যাওয়ার আগে তোর বিয়েটা দেখে যেতে চাই-- আমি যাওয়ার আগে নিশ্চিন্ত হতে চাই । না হলে তোকে আর তোর বাবাকে যে দেখার কেউ নেই। 
প্রভাত কাঁদতে লাগল--এমনি বল না মা, আমার শুনতে খুব কষ্ট হয় মা । মায়ের চোখ থেকেও জলের ধারা নেমে আসে, আমি কার ওপর তোদেরকে রেখে যাব বলতো ? প্রভাত আর দেরী করলো না, পরদিন আঁখি ওদের বাড়িতে আসতেই তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলল। বাবা অফিসে গেছে, তোমাকে একটা কথা বলি আঁখি। আমি এত বুঝিয়ে বলতে পারবো না, তুমি কি কাউকে ভালোবাসো ? 
আঁখি মাথা নাড়লো প্রভাত বললো কিন্তু আমি ভালোবাসি তোমাকে। মার আর বেশিদিন সময় নেই মা বলছে। মা মৃত্যুর আগে আমার বিয়ে দেখে যেতে চায়--তুমি কি রাজি ?
আঁখি, হ্যাঁ, বলে সরে গেলো। প্রভাত আঁখিদের বাড়িতে গেল। সব বুঝিয়ে বললো। আঁখির বাড়ি থেকেও কেউ মানা করেনি, ওরাও সবাই রাজি। বিয়ের দিন ঠিক হল, পরশু। প্রভাতের বাবা সাধ্যমত সব জোগাড় করল। প্রভাতের মার শরীর খারাপ তাই বিয়েতে কোন ধুমধাম হবে না, প্রভাত জানালো। তবুও আঁখি দের  ঘর থেকে সেটা মেনে নিয়ে বিয়ের যতটুকু পারা যায় ততটুকু ব্যবস্থা করল আঁখির বাবা ও মা। প্রভাতের বাবাও যতটুকু না করলে নয় ততটুকু করল বিয়ের ব্যবস্থা। 
প্রভাতের মার শেষ ইচ্ছে মত, সব বিধি মেনে বিয়ে শেষ হল। এদিকে ওর মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। তাই মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল । পরদিন খবর এলো, প্রভাতের মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। প্রভাতের বাবা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে, শুধু বলল, আমরা প্রভাতের মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছি।
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...