Friday, 4 February 2022

অন্ধকারের আড়াল--তাপসকিরণ রায়

অন্ধকারের আড়াল 
 তাপসকিরণ রায়

আবছায়া, ছায়া, অন্ধকার কিংবা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তারপর একটা সময় আসে অন্ধকার সরে গিয়ে সাদা একটা রং উঠে আসে। ধূসর সাদা বিস্তৃত একটা ময়দান চোখের সামনে ধরা পড়ে। আসলে আমরা চোখ বুজে যদি দেখতে চেষ্টা করি এ ব্যাপারটা স্পষ্ট অনুভব করতে পারব। সমস্ত রঙ দৃশ্যপটের শেষে দিগন্ত বিস্তৃত এক সাদা মাঠ পড়ে থাকে !  
রমাকান্ত আজকাল বয়সের ভারটা সহজেই অনুভব করতে পারেন। গত বছর থেকে তিনি সময় কাটাতে সামান্য সাহিত্য চর্চার সঙ্গে সঙ্গে মুভি দেখছেন। কিছু কিছু আর্ট ফিল্ম  তার বেশ ভালো লাগে। তবে ভৌতিক বা প্যারানরমাল পিকচারগুলো তাকে আরো বেশি আকর্ষিত করে। 
ঘরে তার স্ত্রী আছেন।  কেন জানেন না রমাকান্ত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বনিবনার অভাব ঘটে চলছে। কথায় কথায় তর্ক অবিশ্বাস জাতীয় মনোভাব তাকে বেশ পীড়া দিচ্ছে। জীবনের মূল্যবোধ তিনি যেন ক্রমশ হারিয়ে ফেলছেন।  তবে তিনি এটাও জানেন, তাঁর স্ত্রী এ  জন্য দোষী নন।  বরং এই বয়সের বোঝাপড়াটাই হতে পারে এমনি কিংবা এটা হতে পারে যে তার ভাগ্যটা এমনি !  
কিছুদিন যাবত রমাকান্তর মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত চলছিল। কিছুই করার নেই। মনের সঙ্গে সঙ্গে কিছুদিন যাবত শরীরটাও তার খারাপ চলছিল। বুকের বাঁ দিকে মাঝে মাঝে হঠাৎ করে একটা ব্যথা অনুভব করেন তিনি। ইদানিং তিনি ভূতের গল্প লেখায় ও পড়ায় সময় পাস করেন। নাওয়া-খাওয়া আর রাতে তিন-চার ঘণ্টা ঘুম তারপর বাকি সময়ের বেশীর ভাগটা  তিনি নিজের ল্যাপটপে কিংবা টিভি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। গত সাতদিন ধরে তিনি ভূতের মুভি দেখে যাচ্ছেন।  আর কিছু না হোক সময়কে কিল করতে ভূতের মুভির  জুড়ি নেই। 
সে দিন দিনভর রমাকান্ত ভূতের মুভি দেখলেন।  স্ত্রী তার নিজের কাজটুকু সেরে বাকি সময়টুকু প্রায় বিছানায় শুয়ে কাটান। যেখানে ভূতের ভয়, ছবিটা দেখ ছিলেন রমাকান্ত। সত্যিই সুন্দর বানিয়েছে ছবিটা। ছবির তিনটি কাহিনী যেমন সুন্দর তেমনি এর মধ্যে বাস্তব অভিনয়ের ছোঁয়া অনুভব করা যায়। পারিপার্শ্বিক দৃশ্যাবলির অবস্থান ভিডিওকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। 
তখন রাত গভীর, দেখতে দেখতে রমাকান্তর মনে ভয়ের উদ্বেগ হচ্ছিল। মাঝ রাতের একখণ্ড স্তব্ধতার মধ্যে মুভির বার্তালাপ ও আনুষঙ্গিক শব্দ সংযোজন ঘরের পরিবেশকে বেশ ভয় ছমছম ভাব এনে দিয়েছিল। মুভিটা তিনি তৃতীয় বার দেখছিলেন।  তিনি বুঝতে পারছিলেন না--বর্তমান ভৌতিক পরিবেশের জন্যেই তার শরীরটা এমন খারাপ খারাপ লাগছে কি না !  ইতিমধ্যে আরো একবার তার বুকের মধ্যেটা চিলিক দিয়ে উঠল।
তার চোখের সামনে প্রথম কাহিনীর শেষ দৃশ্য চলছিল। গতকাল ভূতের বাড়িতে রাত কাটালো যে লোকটা, তার সঙ্গে দস্তুর মত চা খেয়ে গল্প করে গল্পের নায়ক যখন সেই পোড়ো বাড়িতে গিয়ে ঢুকলো তখন দেখলো যার সঙ্গে একটু আগে চা খেয়ে গল্প করে কাটালো তারই মৃত দেহ মেঝেতে পড়ে আছে। মৃতের বিস্ফারিত ভীত ঠিকরে বেরিয়ে আসা দুটি চোখ দেখে নায়ক জ্ঞান হারিয়ে সেখানেই লুটিয়ে পড়ল। 
ঠিক এমনি সময় রমাকান্ত বুকের ভেতর একটা ঝাঁকুনি খেলেন। ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে গিয়ে তিনি দেখলেন হঠাৎ তাঁর ঘরের লাইট নিভে গেলো। চারদিক অন্ধকার, এ কি তাঁর ল্যাপটপও অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেলো কেন ? বুকের যন্ত্রণা নিয়েই রমাকান্ত ল্যাপটপের বোতামে টোকা মারতে লাগলেন। না কিছুতেই খুলছে না। অন্ধকারে তার পাশের চেয়ারটা উল্টে পড়ল মনে হল। এবার মনে হল তিনিই যেন চেয়ার থেকে ঘরের মেঝেতে পড়ে গেলেন। পরমুহূর্তে তিনি দেখলেন, না তিনি তো বারবার ল্যাপটপের কি বোটমে টোকা দিয়ে যাচ্ছেন। 
চারদিকের অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে যাচ্ছে। একেবারে এক্সট্রিম অন্ধকার। তারপর হঠাৎ একি হল ! ল্যাপটপের ঘন সাদা আলোয় ঘরের চারদিকটা ভেসে যাচ্ছিল। তাতে কোন ছবি নেই। 
ভয়ে রমাকান্তর গলাটা ফেটে যাচ্ছে, স্ত্রীর নাম ধরে বারবার তিনি ডেকে উঠছেন।  না কোন সাড়া নেই।  কি হল, স্ত্রী কি তাঁর ঘুমিয়ে পড়েছেন ! এমনিতে স্ত্রী তার বেশি ভীতু। কিন্তু এ অবস্থায় তার ভয় পাওয়ার কথা নয়।  অগত্যা ল্যাপটপের সামনের চেয়ারে জড়োসড়ো হয়ে রমাকান্ত বসে থাকলেন। 
কলোর মধ্যে সাদা কিছু জিকজ্যাক লাইন বারবার ল্যাপটপকে কাঁপিয়ে মারছিল।  কোনো ছবি নেই তাতে। 
রমাকান্ত বিরক্তিভরে ধুস, বলে ল্যাপটপ বন্ধ করতে গেলেন।  বন্ধ হচ্ছে না কিছুতেই।  এবার ঝাঁ ঝাঁ ঝাঁ  শব্দ করে ল্যাপটপটা থেমে গেল।  আর একি ! রমাকান্ত আশ্চর্য চকিত হয়ে উঠলেন।  তিনি দেখলেন ল্যাপটপে তাকে দেখা যাচ্ছে ! চেয়ারে বসা অবস্থায় রমাকান্তর দেহটা এলিয়ে পড়ে আছে ল্যাপটপের কীবোর্ডের ওপরে। চমকে উঠলেন তিনি, বুকে হাত দিলেন, না, তিনি তো চাঙ্গা আছেন।  এবার উঠে দাঁড়ালেন তিনি।  ল্যাপটপে আদিগন্ত সাদা রঙ ছড়িয়ে আছে--স্ক্রিনের উপরে নিজের পড়ে থাকা ছবিটা আবার তিনি দেখতে পেলেন। হতবাক হলেন তিনি।  কয়েক পা পিছিয়ে তিনি ল্যাপটপ পার করে  দূরে অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার  চারপাশ অন্ধকার, কিন্তু ল্যাপটপের পর্দায়  তখনো স্পষ্ট নিজের পড়ে থাকা দেহটা ভেসে আছে। ধুস,  অন্ধকারের মধ্যেই তিনি স্ত্রীর বিছানার কাছে এগিয়ে গেলেন, স্ত্রীকে তিনি ডেকে উঠলেন, এই এই  এই--রমাকান্ত তার স্ত্রীর শরীরটা ধরে চিৎকার দিয়ে ডাকতে লাগলেন। 
তখন চারদিক নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ভরে আছে। তার মানে হল,  তার স্ত্রীর দেহটা নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। তবে কি তার স্ত্রী আর বেঁচে নেই?স্ত্রীকে ডেকে ডেকে পরিশ্রান্ত হয়ে গেলেন রমাকান্ত তারপর তিনি এসে নিজের চেয়ারটায় গিয়ে আবার বসলেন। তাঁর শরীরটা ঝুঁকে পড়লো ল্যাপটপের কীবোর্ডের ওপর। রমাকান্তর মনে হতে লাগল দিগন্তের চরাচর ব্যাপ্তিতে স্তব্ধ ধূসর সাদাটে একটা রং তার মধ্যে যেন তাঁর ল্যাপটপটা ডুবে যাচ্ছে। 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...