Thursday, 3 February 2022

“পটাইবাবুর নিরুদ্দেশ যাত্রা"--নারায়ণ রায়

“"পটাইবাবুর নিরুদ্দেশ যাত্রা"”
(একটি রম্য রচনামূলক ছোট গল্প) 
--নারায়ণ রায়

পটাইবাবু গত কদিন ধরে নিখোঁজ, কিম্বা নিরুদ্দেশ বলা যেতে পারে। সাতদিন অপেক্ষার পর অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্বেও, নিতান্তই বন্ধুদের পরামর্শে তার পুত্র অনাদীচরণ স্থানীয় কোতোয়ালিতে গিয়ে একটা নিখোঁজ ডায়েরী করে এলেন। আসলে সবাই তাকে বোঝালো যে, ডেথ সার্টিফিকেটের ন্যায় নিখোঁজ ডায়েরীর কপিও ভবিষ্যতে অনেক সময়ে, বিভিন্ন বৈষয়িক কাজে ভীষণ ভাবে প্রয়োজনে লাগতে পারে।

তবে এতকিছু ঘটার পরেও পাড়ার লোকজন কিন্তু কেউই সেভাবে জানতে পারলো না যে, পটাইবাবুর বাড়িতে এতবড় একটা অঘটন ঘটে গেছে। সেদিন পটাইবাবুর সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু লাটাইবাবু, অনাদীচরণকে তার পিতৃদেবের এই আকস্মিক অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাওয়ায় উত্তর পেলেন, পটাইবাবু তীর্থ দশর্নে গেছেন। 

এ কথা শ্রবণ করে লাটাইবাবু যার পর নাই বিস্মিত হলেন। যে পটাইবাবু পাড়ার মন্দিরে কদাপি পঞ্চাশ পয়সাও প্রণামী দেননা, তাঁর এহেন ঈশ্বর ভক্তির কারণ কি, সেটি অনেক চেষ্টা করেও লাটাইবাবুর বোধগম্য হ’ল না । এদিকে অনাদীচরণ যথারীতি তার ঘরে, মিউজিক সিস্টেমে ‘ধানী-পটকা’ ব্যান্ডের ‘শশ্মানে অশান্তি’ নামের অ্যালবামটি তারস্বরে চালিয়ে দিয়ে দুবাহু এবং পদযুগল আন্দোলিত করে অবিরাম নৃত্য করে চলেছেন। পটাইবাবুর একমাত্র কন্যা রটন্তীও যথারীতি জিনস্ আর টপ পরিধান করে, অধর এবং মুখমন্ডল রঞ্জিত করে, নিয়ম মত অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিদিন তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে সিটি সেন্টার, আইনক্স কিম্বা সাউথ সিটিতে হাজিরা দানের কতর্ব্য পালন করে চলেছেন। পটাইবাবুর স্ত্রী পুটিরানী মনে মনে ভাবছেন, যাক ক’দিনের জন্য অনন্ত কিপ্টে বুড়োটার হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেছে, দুবেলা কাঁচা পেপের তরকারি খেয়ে খেয়ে মুখটা একেবারে হেদিয়ে গেছে, এবং মনের আনন্দে রসুই কক্ষে দুইবেলা পাঁঠার মাংস, লুচি ও পলান্ন রন্ধনে ব্যস্ত রয়েছেন।

এমতাবস্থায় নিরুদ্দেশের নবম দিবস সকাল ন’টা নাগাদ পটাইবাবু, বড়ই প্রফুল্ল চিত্তে ঘন্টুরানীকে সঙ্গে নিয়ে হাওড়া স্টেশনে অবতরণ ক’রলেন। এমন আনন্দদায়ক সকাল তিনি তাঁর জীবদ্দশায় পূর্বে কখনো দেখেছেন বলে স্মরণ করতে পারলেন না। স্বল্প বয়সে শরীর এবং মনে বারংবার পুলক জাগলেও, প্রেম নামক বস্তুটির সঙ্গে কদাপি পরিচিত হ’বার সুযোগ পান নি। কিন্তু এই বৃদ্ধ বয়সে একজন পরনারীর সঙ্গে স্ত্রীর চক্ষু ফাঁকি দিয়ে সমুদ্র দশর্নের যে এইরূপ আনন্দ, তাহা আবিস্কার ক’রে যুদ্ধ জয়ের আনন্দে ঘন্টুরানীকে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে, ঘন্টুরানীর কাঁধে হাত রেখে সকালের কলকাতা দশর্ন করতে করতে গৃহাভিমুখে রওনা দিলেন। অবশেষে রাসবিহারীর মোড়ে পৌছে যথারীতি ট্যাক্সিটি ছেড়ে দিলেন। অবাঙ্গালী ট্যাক্সি চালক যখন বললেন, “বাবু আপ পঁচাস রূপাইয়া য্যাদা দে দিয়া”, চিরকালের কিপ্টে বলে পরিচিত পটাইবাবু তার উত্তরে মহানন্দে বললেন, “ইয়ে তুমহারা বকশিস হায়।”

ঘন্টুরানীর বাড়ি এসে গেছে, তাঁকে বিদায় দেবার কালে পটাইবাবুর সম্প্রতি ইংরাজী সিনেমাতে দেখা দৃশ্যের ন্যায় ঘন্টুরানীকে দুহাত বাড়িয়ে হাগ করবেন ভেবে, দুহাত বাড়াতেই ঘন্টুরানী টা টা বাই বাই বলে সুরুৎ ক’রে ছিটকে গিয়ে গলির মধ্যে সেঁধিয়ে গেলেন। অগত্যা পটাইবাবু তার গৃহের উদ্দেশ্যে একটি বেহালা গামী বাসে উঠে বসলেন। পাড়ায় পৌছতেই একটা ব্যাপারে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন যে, নয়দিন আগে এই পাড়াকে যে অবস্থায় তিনি দেখে গিয়েছিলেন, বতর্মানে তার বিশেষ কোন উনিশ বিশ হয়নি। 

তাঁর গৃহের নিকট পৌছতেই বুঝতে পারলেন যে তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং কন্যা বেশ আনন্দেই আছেন। বাইরে থেকেই একতলার ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলেন যে তাঁর কন্যা রটন্তী, মুখে আপেলের খোসা এবং শশা বাটার প্রলেপ লাগিয়ে চক্ষু বুজে ত্বক চর্চায় ব্যস্ত। পুত্রের ঘর থেকে নিগর্ত ‘ধানি পটকা’ ব্যান্ডের ‘শ্মশানে অশান্তি’ অ্যালবামের উচ্চ নাদ শ্রবণ করে তিনি যার পর নাই পুলকিত হলেন। মনে মনে ভাবলেন, যাক--তাহলে তিনি যে এই কদিন ঘন্টুরানীকে সঙ্গে নিয়ে পুরী ভ্রমনে গিয়েছিলেন, সেটা নিশ্চয় বাড়ীর লোকেরা কেউ টেরটি পায় নি।

তখন পটাইবাবু মনের আনন্দে গুন গুন করে “মন চলো নিজ নিকেতনে..” গানটি গাইতে গাইতে আস্তে আস্তে পিছনের দরজা দিয়ে এক পা এক পা করে গৃহে প্রবেশ করলেন এবং দেখে অবাক হয়ে গেলেন যে … সমগ্র গৃহে একমাত্র তাঁর অর্ধাঙ্গিনী পুটিবালাই অধোবদনে ফোঁস ফোঁসকরে চোখর জল ফেলে ক্রন্দনরত অবস্থায় কাজ করে চলেছেন। এই দৃশ্য দশর্ন করে পটাইবাবুর নিজেকে বড়ই অপরাধী বলে মনে হ’ল। তাঁর এইরূপ সতী লক্ষ্মী স্ত্রীর প্রতি তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, তাঁর নরকেও স্থান হওয়া উচিৎ নয়। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম তিনি আবিষ্কার করলেন পুটিরানী তাকে কতোটা ভালোবাসেন, আর এতদিন তার এই সতী লক্ষ্মী অর্ধাঙ্গিনীকে ভূল বোঝার জন্য মনে মনে তিনি নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলেন। হঠাৎ পুত্রের ঘরে অ্যালবাম থেমে গেল, চারিদিক নিস্তব্ধ, ইংরাজিতে যাকে বলে ‘পিন ড্রপ সাইলেন্স’, সেই মুহূর্তে সমগ্র গৃহে এক শোকের পরিবেশ, পুটিরানী তখনও নীরবে অশ্রুবষর্ণ করে চলেছেন।

ঠিক সেই সময়ে তাঁর পুত্র অনাদীচরণ তার জঠর জ্বালা নিবারনের জন্য রসুই কক্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছিলেন, এমন সময়ে তার পিতৃদেবকে অঙ্গনে দন্ডায়মান দেখে ভূত দশর্নের ন্যায় চমকিত হলেন এবং সোচ্চারে বলে উঠলেন “বাবা তুমি….. ?” পুটিবালার কর্ণে এই কথা যাইবা মাত্র, গৃহে যেন একটি তিনশো ডেসিবেলের বোমা বিস্ফোরিত হ’ল। -- “ওরে, মুখ পোড়া মিনসে….তুই ফিরে এসেছিস?” সজোরে এই কথা বলে হাতের নিকটে থাকা রুটি বেলার বেলনটাকে ধাইইইই করে ছুড়ে মারলেন পটাইবাবুকে লক্ষ্য করে। পটাইবাবু কোনক্রমে নিজের মাথাটি সরিয়ে নিয়ে সে যাত্রায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়ে ভাবলেন, আহা স্বামীর বিরহে বেচারী পুটিরানীর মাথাটাই বুঝি গেছে, আর মুখে বললেন, “এ কি করো গিন্নী? এখনই তো তুমি বিধবা হয়ে যাচ্ছিলে ?” পুটিরানী ততোধিক উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আমি তো সেটাই চাই রে মুখপোড়া, আমি ভাবলাম তুই ঘন্টুকে নিয়ে পুরীতেই ঘর বেঁধে থেকে যাবি, আর আমারও হাড়ে বাতাস লাগবে। নেহাত পাঁঠার মাংস রান্নার জন্য পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে চোখদুটো জলে ঝাপসা হয়ে গেছিল, তাই বেলনটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হ’ল, তা না হলে আজ তোকে আমি খুনই করে ফেলতাম।

1 comment:

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি"--বহ্নি শিখা

২রা ফেব্রুয়ারি এবং আমি" বহ্নি শিখা  খুব মানসিক চাপের ভিতর দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলাম।ভালো লাগছিলো না মোটেই। আজকাল  মাঝেই মাঝে...